ফার্নান্দো ক্যাসাল
ফার্নান্দো ক্যাসাল

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ফার্নান্দো ক্যাসাল

বাংলাদেশের সামনে বিশাল সুযোগ এসেছে, কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না

ফার্নান্দো ক্যাসাল বের্তোয়া নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পলিটিকস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি রাজনৈতিক দল, দলীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি গবেষণার কাজে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ২০২৬ সালের ১৬ জুন প্রথম আলো তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহুল আহমদ

প্রশ্ন

আপনি ‘দলীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ (পার্টি সিস্টেম ইনস্টিটিউশনালাইজেশন) নিয়ে কাজ করেন এবং একে স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে থাকেন। দলীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বলতে আসলে আপনি কী বোঝান?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: ধারণাটি সংক্ষেপে বলতে গেলে একটি দলীয় ব্যবস্থা তখনই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলা যাবে, যখন দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল এবং অনুমানযোগ্য হবে। এর মানে হলো নির্বাচনের রাতে আপনি আগে থেকেই ধারণা করতে পারবেন যে ঠিক কারা এবং কার সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্যে যদি লেবার পার্টি জেতে, তারা একক দল হিসেবে সরকার গঠন করে, কনজারভেটিভরা জিতলেও তা-ই করে।

এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াটি একদম নিশ্চিত ও অনুমানযোগ্য। আবার সুইডেনের দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে কিছু নির্দিষ্ট জোট বা ব্লক রয়েছে, যেমন সমাজতন্ত্রীরা কমিউনিস্ট ও গ্রিনদের সঙ্গে জোট করে, অথবা কনজারভেটিভরা করবে অন্যদের সঙ্গে।

যখন একটি দলীয় ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না, তখন সেটি হয়ে পড়ে অননুমেয় বা অনিশ্চিত। সরকার কীভাবে গঠিত হবে তা আপনি আগে থেকে জানতে পারবেন না। এই নিশ্চিত বা অনুমানযোগ্য পরিবেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি রাজনৈতিক আচরণকে স্থিতিশীল করে। যদি দলগুলোর সামনে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ থাকে এবং তারা জানে যে আগামী নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে তাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার বা দুর্নীতি করার প্রবণতা কমে যায়।

কিন্তু ব্যবস্থাটি যদি নড়বড়ে হয় এবং কোনো দল যদি মনে করে যে আগামী চার বছর পর তাদের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না, তখন তাদের মধ্যে চুরি করার এবং কেবল নিজেদের বন্ধুদের সুবিধা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়। এই অস্থিতিশীলতা একসময় জনগণকে অতিষ্ঠ করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত তারা একজন ক্যারিশমাটিক নেতার সন্ধান করতে শুরু করে, যা একনায়কতন্ত্রের পথ সুগম করে।

প্রশ্ন

আপনি ইউরোপীয় উদারপন্থী গণতন্ত্রের উদাহরণ দিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই পরপর দুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি, আন্দোলন ছাড়া ক্ষমতাসীনদের সরানো যায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস খুবই ভঙ্গুর। সরকার সব সময়ই বিরোধী দলকে নির্মূল করার চেষ্টা করে। এই বাস্তবতায় আপনার এই ধারণা আদৌ খাটবে?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: এশিয়াতেও কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া দলীয় ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন জাপান, তাইওয়ান, এমনকি ভারত বা ইন্দোনেশিয়া। সুতরাং এটি সম্ভব। বাংলাদেশের সমস্যাটা শুধু প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাব নয়, বরং দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের মূল চেতনা বা ধারণার অভাব। তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া কিন্তু গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো ক্ষমতার পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম। আপনার সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিরোধী দলের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং কাজ করার অধিকারকে সম্মান জানাতে হবে।

আপনি তখনই একটি প্রকৃত দলীয় ব্যবস্থা পাবেন, যখন সেখানে এমন একটি গণতন্ত্র থাকবে, যেখানে অন্তত দুটি দল অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। তা না হলে আপনি হয়তো সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ১৯৯৪ সালের আগের মেক্সিকোর মতো ‘অতি-প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ দেখতে পাবেন। সেখানে সব সময় একটি দলই জিতত কিন্তু একে কোনোভাবেই গণতন্ত্র বলা যায় না। কারণ, সেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না।

ফার্নান্দো ক্যাসাল
প্রশ্ন

আপনি যে ব্যবস্থার কথা বলছেন, তা কি কোনো ‘সামাজিক চুক্তি’র মতো, নাকি এটি রাষ্ট্র নিজেই পরিচালনা করে?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: না, এই ব্যবস্থা বলতে আসলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং যোগাযোগকে বোঝায়, ঠিক যেমনটা মানবদেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গের মধ্যে ঘটে থাকে। একনায়কতন্ত্র বা একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী ব্যবস্থায় এই গণতান্ত্রিক যোগাযোগগুলো থাকে না। কারণ, সেখানে একটি দল বাকিদের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়। গণতন্ত্রকে হতে হবে ‘একমাত্র নিয়ম’, যার মধ্যে শুধু নির্বাচনই নয় বরং আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমে বিরোধী দলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও অন্তর্ভুক্ত। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ অনেক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন

আপনি আপনার কাজে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘পাবলিক ফান্ডিং’-এর কথা উল্লেখ করেছেন। দলীয় ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর থেকে এশিয়ার সব গণতান্ত্রিক দেশে দলীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কারণ ও ফলাফল নিয়ে আমরা একটি গবেষণা শেষ করছি। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে পাবলিক ফান্ডিং বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও দলীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মধ্যকার সম্পর্কটি খতিয়ে দেখেছি। আমরা দেখেছি যে কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের উপস্থিতি থাকলেই দলীয় ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় না। এটি নির্ভর করে অর্থায়নের পরিমাণ এবং এই অর্থায়ন ব্যবস্থার উদারনৈতিক কাঠামোর ওপর।

উচ্চমাত্রার অর্থায়ন রাজনৈতিক দলগুলোকে সামাজিকভাবে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে পারে, তবে এর জন্য একটি যথাযথ তদারকি বা জবাবদিহির কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ কোনো ‘ধনী ও দুর্নীতিবাজ’ দলকে টাকা দেওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান হতে পারে কিন্তু তারা যদি দেখে যে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এই অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে, তবে তাদের মনে একটা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হবে। অর্থাৎ আপনার তহবিলের পাশাপাশি তদারকির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

প্রশ্ন

কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এই তদারকি করা উচিত বলে মনে করেন?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: নির্বাচন কমিশন, কোর্ট অব অডিটরস কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন এই কাজ করতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান অনেক সময় ভালো কাজ করে। কারণ, তাদের কাছে এমন কিছু ক্ষমতা থাকে, যা নির্বাচন কমিশনের থাকে না। অবশ্য যুক্তরাজ্যের মতো কিছু জায়গায় নির্বাচন কমিশনই এই কাজ বেশ ভালোভাবে সামাল দেয়।

ফার্নান্দো ক্যাসাল
প্রশ্ন

নব্বইয়ের দশক থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের মধ্যে একধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গণ-আন্দোলন থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আপনার মতে, বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিবর্তন কেন ঘটছে এবং এর প্রভাব কী হবে?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: রাজনৈতিক দলগুলোর এই সংকট নিয়ে সত্তর দশকের শেষ ভাগ থেকেই আলোচনা চলছে। অধিকাংশ সময়ই দলগুলো তাদের মূল দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সুসংহত গণতন্ত্রের দেশগুলোতে আমরা ‘কার্টেলিজেশন’ দেখতে পাই—মানে যেখানে দলগুলো রাষ্ট্রের ভেতরে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে এবং ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করা বা আদর্শিক প্রতিযোগিতার চেয়ে কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেয়। ভোটাররা যখন বামপন্থী আর ডানপন্থীদের মধ্যে কোনো তফাত খুঁজে পায় না, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে আর এর ফলেই জনতুষ্টিবাদী ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী দলগুলোর উত্থান ঘটে।

তবে এ কথাও সত্য যে রাজনৈতিক দল ছাড়া আপনি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কল্পনাও করতে পারবেন না। টুভালুর মতো অত্যন্ত ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোই কেবল দল ছাড়া চলতে পারে। বড় দেশে জনগণের নানামুখী স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষাকে এক সুতায় বাঁধতে রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। এই সামাজিক বা গণ-আন্দোলনগুলোকে শেষ পর্যন্ত দেশ পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক দলেই রূপান্তরিত হতে হবে। এর একমাত্র সমাধান হলো এমন রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা, যা কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। যাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে, শুধু এক্স বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকবে না।

প্রশ্ন

আপনি এক লেখায় বলেছেন, জনতুষ্টিবাদ সব সময় খারাপ নয়। স্থবির হয়ে পড়া গণতন্ত্রে এটা সুযোগও তৈরি করতে পারে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কি?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: জনতুষ্টিবাদীরা এমন সব সমস্যা চিহ্নিত করতে খুব পারদর্শী, প্রথাগত দলগুলো যা উটপাখির মতো চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যায়। যেমন ধরুন অভিবাসন সমস্যা। ইউরোপের অনেক দেশেই অভিবাসন একটি বড় সমস্যা। এটি নিয়ে কথা বলা দরকার। সবাইকে নিয়ে নেওয়া অথবা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান—এর মাঝামাঝি কোনো সমাধান আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। প্রথাগত দলগুলো যেহেতু এটি নিয়ে কথা বলেনি, জনতুষ্টিবাদীরা সেই সুযোগ লুফে নিয়েছে। তবে এই জনতুষ্টিবাদীরা যা সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করে, তা মোটেও সঠিক সমাধান নয়।

সমস্যা চিহ্নিত করতে পারদর্শী হলেও সাধারণত জনতুষ্টিবাদীরা কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। তবে আপনার দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে জনতুষ্টিবাদীদের সরকারে আসা জনগণের জন্য একটি সুযোগ হতে পারে। এর ফলে মানুষ বুঝতে পারে যে তারা আসলে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারছে না। আসল বিপদ তখনই ঘটে, যখন তারা নিরঙ্কুশ বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায় (যেমন হাঙ্গেরিতে হয়েছে) এবং পুরো ব্যবস্থাকে একটি অনুদার গণতন্ত্রে রূপান্তর করে ফেলে।

প্রশ্ন

আপনি নিশ্চয়ই জানেন, বাংলাদেশে দীর্ঘ একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আপনি রাজনৈতিক দলের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কাজ করেছেন, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য অনেক সময়ই পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বোঝাপড়া করতে হয়। কমিউনিস্ট-পরবর্তী দেশগুলোতে অনেক কমিউনিস্ট দল পরবর্তী সময়ে সোশ্যালিস্ট বা ডেমোক্রেটিক পার্টিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ হত্যা বা নির্যাতনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের রাজনীতিতে গ্রহণ করা হয়। আপনার বিচার করা উচিত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের, যেমন শীর্ষ নেতা বা স্বৈরাচারের পরিবার, যারা সরাসরি লাভবান হয়েছে, পুরো দলের নয়।

তবে গণতন্ত্রে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে, যাকে বলে ‘মিলিট্যান্ট ডেমোক্রেসি’। কোনো দল যদি গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন মানতে অস্বীকৃতি জানায়, সহিংসতা বেছে নেয় কিংবা বিরোধী দলকে অনবরত হুমকি দিতে থাকে, তবে তাদের নিষিদ্ধ করাটাই স্বাভাবিক। ইউরোপে সাধারণত রাজনীতিতে সহিংসতার পথ না ধরলে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা যায় না। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা এটাই বলে যে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি একেবারে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে কার্যকর হওয়া উচিত।

প্রশ্ন

তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পতিত দল ও তার নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগ আছে।

ফার্নান্দো ক্যাসাল: কোনো দল যদি এ ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী বলে অভিযুক্ত হয়, তবে অবশ্যই তার বিচার হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জার্মানিতে নাৎসি পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং অনেক দেশে কমিউনিস্ট দলগুলোকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নীতিগতভাবে আমি দল নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে, তবে কোনো দল যদি নাৎসি বা নির্দিষ্ট কিছু কমিউনিস্ট শাসনের মতো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তবে তাকে নিষিদ্ধ করাই যায়।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে। কোনো দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর তারা যদি নতুন নামে নিজেদের পুনর্গঠিত করে, যেখানে আগের অপরাধের জন্য দায়ী নেতারা থাকবেন না এবং যারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মেনে চলবে, তাদেরই অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই এখানে যে যতক্ষণ আপনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, ততক্ষণ আপনার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।

প্রশ্ন

বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তরকালে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহলের কোন বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া উচিত?

ফার্নান্দো ক্যাসাল: স্পেনের রাজনৈতিক উত্তরণের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বলব, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং একটি জাতীয় সমঝোতায় পৌঁছানো এখন সবচেয়ে জরুরি। স্পেনে ‘মনক্লোয়া চুক্তি’ হয়েছিল, যেখানে সব দল মিলে অর্থনীতি, পেনশন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য এক টেবিলে বসেছিল। গণতন্ত্রের মূল নির্যাসই হলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলা এবং একটি মধ্যপন্থা বা সমঝোতায় পৌঁছানো।

আমি বর্তমানে বাংলাদেশে একটি সমস্যা দেখতে পাচ্ছি, যেখানে সরকার সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের স্বাক্ষরিত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে চায় না। এটি কেবল ভোটারদের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রতি নাগরিকদের বিশ্বাসকেও পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। এটি আসলে একটি ‘আত্মঘাতী কৌশল’।

আমি আগেও বলেছি, স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম প্রয়োজন। এর মানে হলো, আপনার কাছে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা থাকলেও আপনাকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা এবং আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ সব সময় থাকতে হবে, যেখানে দলগুলো অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশের সামনে একটি বিশাল সুযোগ এসেছে, এটি কোনোভাবেই নষ্ট করা উচিত হবে না।

প্রশ্ন

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ফার্নান্দো ক্যাসাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।