
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। বিএনপির ইশতেহারের নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
গণ-অভ্যুত্থানের আগে দেশ এক দীর্ঘ স্বৈরশাসনের মধ্য দিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও দুঃশাসন সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করল। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনে বিজয়ী হলে বিএনপি কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে? তা মোকাবিলায় ইশতেহারে কোন বিষয়গুলোকে জোর দেওয়া হয়েছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: পতিত অলিগার্কিক ও ফ্যাসিবাদী সরকার জবাবদিহিবিহীন, কর্তৃত্ববাদী, পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর, দুর্নীতির জরাব্যাধিতে আক্রান্ত ঘুণে ধরা এক রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতি রেখে পালিয়ে গেছে। চ্যালেঞ্জ পাহাড়সম। এ কারণে এবারের বিএনপির ইশতেহারের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কার করে সুশাসন সুদৃঢ় করা, বৈষম্য দূর করা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং ধর্মীয়-নৃগোষ্ঠীগত সম্প্রীতি বজায় রেখে ক্রীড়া, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি অর্জন। ইশতেহার বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও বর্তমান সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি বাস্তবায়নযোগ্য অগ্রসর, জবাবদিহিমূলক, কল্যাণমুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপরেখা উপস্থাপন করেছে।
এ ধরনের ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে সব সময়ই দিয়ে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এবারের বিএনপির ইশতেহারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী? আর এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য? বাস্তবায়নের পথ বা কৌশল কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বিএনপির ইশতেহারে নীতি বাস্তবায়নের কৌশল, সময়সীমা ও নির্দেশক উল্লেখ করা আছে। ইশতেহার থেকে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি। সংবিধান, সংসদ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও পুলিশ সংস্কার এবং দুর্নীতি দমনে সুস্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছে। এই প্রক্ষেপণ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্জনের বিস্তারিত কৌশলও উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য কমিয়ে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী বাড়ানোর মাধ্যমে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ মডেল দেওয়া হয়েছে। শুধু দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশলই নয়, টার্গেটও ঠিক করা হয়েছে।
এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজন দক্ষ মানবশক্তি। সে জন্য শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, যুব উন্নয়নের ইনডিকেটরসহ টার্গেটেড কর্মসূচি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতের বাস্তবায়নযোগ্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ বিএনপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দেশব্যাপী কোটি মানুষের কর্মসংস্থান। আর এই লক্ষ্য অর্জনের নীতি, কৌশল ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি ইশতেহারে উল্লেখ করা আছে।
দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব ও স্বল্প আয় দেশের বড় জনগোষ্ঠীকে কঠিন জীবনযাপনে বাধ্য করছে। এই জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বিএনপির মূল প্রতিশ্রুতিগুলো কী? মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর কৌশলই–বা কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বর্তমান জনগণ যে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে, তা মাথায় রেখে ইশতেহারে কিছু বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা হাজির করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরাতে কৃষক, খামারি, মৎস্যজীবীদের সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মাফ এবং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় এক বছরের ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি পরিশোধের অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে দক্ষতা বাড়িয়ে বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। শ্রমিকদের বহুদিনের দাবি দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মজুরি, বন্ধ শিল্প চালু ও সব ক্ষেত্রে ছয় মাসের ছুটিসহ বিভিন্ন বাস্তবায়নযোগ্য শ্রমিককল্যাণ প্রস্তাব ইশতেহারে আছে। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করণে বর্তমানের ভাতা বৃদ্ধিসহ ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ ও নগরে বস্তিবাসীর উন্নয়নে কয়েকটি কস্টেড সিগনেচার পরিকল্পনা জানিয়েছে। বিএনপির এই কর্মসূচির কেন্দ্রে আছে নারী। একই সঙ্গে শিশু, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী মানুষও দলটির ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে।
মূল্যস্ফীতি অভিঘাত থেকে অধিকাংশ জনগণের বাঁচার জন্য কার্যকর প্রস্তাব করেছে। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে যে মধ্যস্বত্বভোগী আছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়েরই ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হবে। সুদের হার যৌক্তিক করলে বিনিয়োগ বাড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা হলে উৎপাদনের খরচ কমে জিনিসপত্রের দাম কমবে। ব্যাংক খাতে অরাজকতা বন্ধ করলে সুদের হার কমবে। উৎপাদন ব্যয় কমাতে উৎপাদনের উপকরণ সহজলভ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন রেগুলেটরি বডির সক্ষমতা বাড়িয়ে অলিগার্কিক অবস্থার সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের বহুবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দাম কমবে, জনজীবনে স্বস্তি আসবে।
একই সঙ্গে চলমান আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে উত্তরাঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত করা, সুনীল অর্থনীতি, দেশব্যাপী নদী-খাল-হাওর-বাঁওড়-বিল সংরক্ষণ, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করেছে। বলা যায়, সর্বজনের প্রতিটি বিষয়ে ও খাতের কথা চিন্তা করে আশার ফুলঝুরি না সাজিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ইশতেহার পেশ করেছে।
এই যে এত প্রতিশ্রুতি, এগুলো বাস্তবায়নে তো প্রচুর অর্থ লাগবে। এর সংস্থান হবে কীভাবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: দেশের মানুষের কাছেও এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ইশতেহারে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। মধ্য মেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ সবার হিসাব বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে যে লক্ষ্যমাত্রাগুলো বাস্তবসম্মত। কোনো কর না বাড়িয়ে দ্রুত ২ শতাংশ কর কোথা থেকে আসবে, নির্দিষ্ট করা আছে। বহুদিন যাবৎ চলমান মূল্যস্ফীতির পীড়ন ও জনগণের দুঃখ-কষ্ট বিবেচনায় রেখে ব্যয় শৃঙ্খলায় কৃচ্ছ্রসাধন না করে অপচয় অবসানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে পরীক্ষিত কৌশল তথা বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-করচক্র সক্রিয় করার রাস্তা বেছে নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড—এসব কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে এর আগেও নানা কার্ড চালু হয়েছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনা ও দুর্নীতির কারণে এর পুরো সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠী পায়নি। বিএনপির ঘোষিত কার্ডের ক্ষেত্রেও যে এমন হবে না, তার নিশ্চয়তা কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বিক্ষিপ্ত ও ছড়ানো–ছিটানো। এক শর বেশি কর্মসূচি আছে। যাঁর পাওয়ার কথা, তিনি পাচ্ছেন না, যাঁর পাওয়ার কথা নয়, তিনি রাজনৈতিক কারণে তালিকাভুক্ত। বর্তমানে প্রচলিত এনআইডি ডেটাবেজ নির্বাচন কমিশনের অধীন হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। একধরনের ইন্টার-অপারেবিলিটি আছে। কিন্তু এই ডেটাবেজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়ী গোপনীয়তা সুরক্ষিত নয়। এখানে ভোটার হওয়ার বয়সের নিচে যারা আছে, তাদের কোনো তথ্য নেই। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন জন্ম, মৃত্যু ইত্যাদির ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক বিষয়ে একটি ডেটাবেজ রয়েছে। সমন্বয় সাধনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘নাগরিক নিবন্ধন ও গুরুত্বপূর্ণ জনসংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যানব্যবস্থা’ নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ নানা ধরনের ত্রুটি নির্দিষ্ট করে তা থেকে উত্তরণে বিএনপি ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার হিসেবে সমন্বিত জাতীয় ডেটা সেন্টারের প্রস্তাব পেশ করেছে। ফলে জনগণকে নির্দিষ্ট প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।
আপনাকে ধন্যবাদ।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আপনাদেরও ধন্যবাদ।