ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে
ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে

মতামত

ট্রাম্পকে বুড়ো আঙুল দেখালেন নেতানিয়াহু, যুদ্ধ কি আবার শুরু হলো?

তেহরানের একটি প্রতিশোধমূলক হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের সেই অনুরোধ বা হুঁশিয়ারি স্পষ্টতই উপেক্ষা করে সোমবার মধ্য ও পশ্চিম ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এই উসকানিমূলক পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে।

গত এপ্রিল মাসে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এরপর দুই চিরশত্রুর মধ্যে এটাই প্রথম সরাসরি বড় ধরনের কোনো পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা। মূলত এর আগে ইসরায়েল লেবাননের বৈরুতে যে হামলা চালিয়েছিল, তার জবাবেই ইরান এই পাল্টা আক্রমণ চালায়।

রোববার রাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেছিলেন এবং তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিশোধ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই ফোনালাপের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় সোমবার এই হামলা চালাল ইসরায়েল। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগেই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘সব সিদ্ধান্ত আমিই নিই। তিনি (নেতানিয়াহু) কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নন।’

ইরানের রাষ্ট্রীয়  সংবাদমাধ্যম তেহরান, ইসফাহান, কারাজ ও তাবরিজের বিভিন্ন এলাকায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে। ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরায়েল আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে এ হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি হামলার পর ইরান তাদের প্রধান বিমানবন্দর—তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।

এই হামলার বিষয়ে এবং ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করে এটি করেছে কি না, তা নিয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

পাল্টাপাল্টি হামলার পর পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা গেছে। সৌদি আরব তাদের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি (যেখানে মার্কিন সেনা রয়েছে) এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার সাইরেন বাজিয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইয়েমেন থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। ইরানকে সমর্থন জানিয়ে গত মার্চে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়ানো ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এর আগেও ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।

এর আগে দক্ষিণ বৈরুতের একটি লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলি বোমা হামলার জবাবে উত্তর ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তেহরান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, ইরানের সব ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে অথবা সেগুলো ফাঁকা জায়গায় পড়েছে।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় ঘোষণা করে, ‘ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় একটি মিলিট্যান্ট কমান্ড সেন্টারে আঘাত হেনেছে ইসরায়েলি বাহিনী।’ লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলায় ২ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েল আগেই সতর্ক করেছিল যে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে হামলা চালালে তারা এই অঞ্চলে আঘাত হানবে। পরে হিজবুল্লাহ নিশ্চিত করে যে তারা রোববার ভোরে ইসরায়েলি সেনা ব্যারাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বৈরুত হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই হামলার জন্য মার্কিন প্রশাসনই ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছিল। সেই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, এখন থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি সব স্থাপনা তাদের জন্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’।

বৈরুতে বোমাবর্ষণ এবং ইরানের পাল্টা জবাবের পর ট্রাম্প ফক্স নিউজের একজন সাংবাদিককে বলেন, তিনি চান, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বন্ধ করুক এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসুক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, লেবাননে ইসরায়েলের এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়নি এবং ‘আমি এতে একেবারেই সন্তুষ্ট নই।’

যুক্তরাষ্ট্রের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর অবিলম্বে পাল্টা কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের ধারণা ছিল, তিনি নেতানিয়াহুকে শান্ত রাখতে পেরেছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ‘আপাতত বিবিকে (নেতানিয়াহু) থামিয়ে রাখতে পেরেছিলেন।’ তবে তিনি ফোনালাপের বিস্তারিত আর কিছু জানাননি এবং নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকেও এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় আকাশে আলোর রেখা। ৭ জুন ২০২৬

ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর ঠিক আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছিলেন যে যুদ্ধ কীভাবে চালানো হবে, তা তিনিই নেতানিয়াহুকে ডিক্টেট করছেন। টেলিফোনে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তাঁর (নেতানিয়াহু) সামনে কোনো বিকল্প থাকবে না।’ তিনি আবারও দাবি করেন, সব সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহু নন, বরং তিনিই নেন।

লেবাননের এই সংঘাত মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান আলোচনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের সাফ কথা, যেকোনো বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তবে রোববার ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি জোর দিচ্ছেন না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, চুক্তিটি খুব কাছাকাছি রয়েছে, যা এত দিন অধরাই মনে হচ্ছিল।

শুক্রবার রেকর্ড করা ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, তারা এটি দেখতে চায়, তবে আমি জোর দিচ্ছি না।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি, অন্যথায় আমি তাদের (ইরান) একেবারে ধ্বংস করে দেব।’

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনার প্রভাবে সোমবার অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫০ ডলার বেড়ে ৯৬ দশমিক ৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে তেল আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এশিয়ার শেয়ার বাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

রোববারের হামলার আগে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম বৃহত্তম শহর টাইয়ারের অধিকাংশ বাসিন্দাকে বাধ্যতামূলকভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ জারি করেছিল। শহরটিতে আশপাশের গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে শহরটি থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়।

চলতি বছরের ২ মার্চ লেবাননে এই লড়াই শুরু হয়, যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায় এবং এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে পুরোদমে আক্রমণ শুরু করে। ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬১৩ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর হামলায় লেবাননের ভেতরে অন্তত ৩০ জন ইসরায়েলি সেনা এবং ৩ জন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

  • মার্ক সনোকোনোকো গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
    গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব