
সাদাপাথরের স্বচ্ছ পানিতে পাহাড়ের ছায়া, রাতারগুলের সবুজ জলাবন, শ্রীমঙ্গলের চায়ের সুবাস—সবই আমাদের মুগ্ধ করেছে। কিন্তু ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফেরার সময় মনে হলো, প্রকৃতি আমাদের যতটা আনন্দ দিয়েছে, পর্যটন ব্যবস্থাপনার অনিয়ম তার চেয়েও বেশি বিষাদ এনে দিয়েছে। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরে আসতে যাচ্ছি, নাকি প্রতিটি ধাপে নতুন করে হয়রানির শিকার হতে যাচ্ছি?
গত ২৫ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও সিলেটের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল কয়েকটি দিনের জন্য ব্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া। কিন্তু এই ভ্রমণ দেশের পর্যটনব্যবস্থার কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রাত ১০টা ৩০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। ট্রেনে পর্যটকদের বেশ ভিড় ছিল। ট্রেনে ওঠার পরই লক্ষ করি, আমাদের কামরায় কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল কিশোর আমাদের সঙ্গে যাত্রা করছিল। কিছু সময় পর তাদের আচরণ—বিশেষ করে নারী ও কিশোরী যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কয়েকজন নারী যাত্রীর মুখে স্পষ্ট ভয় ও অসহায়ত্বের ছাপ দেখা যায়। কিন্তু ট্রেনের কর্মী কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কাউকেই কার্যকর হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়নি। চলন্ত ট্রেনে নারী যাত্রীরা যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তবে তা যাত্রী সুরক্ষার সার্বিক ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তোলে।
শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে স্টেশন থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য স্থানীয় পরিবহনে উঠতে গিয়েই অনিয়মের মুখোমুখি হতে হয়। শ্রীমঙ্গল থেকে মৌলভীবাজার যাওয়ার পথে সিএনজিচালকেরা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ভাড়া দাবি করেন। শুধু তা-ই নয়, চালকের অসচেতনতায় আমাদের ভুল রাস্তায় কানাইকাটিতে এনে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে নামিয়ে দেওয়া হয়।
শ্রীমঙ্গল ভ্রমণের সময় আমরা বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) পরিদর্শনে যাই। সেখানে এক কর্মচারীর সঙ্গে পরিচয়ের পর ভালো মানের চা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি আমাদের অপর এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান।
প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক বিক্রয়কেন্দ্র থেকে চা কেনার পর ওই দ্বিতীয় ব্যক্তি আমাদের নিজ বাসায় নিয়ে যান এবং একটি ড্রাম থেকে চা বের করে জানান—বাইরে ১ হাজার টাকা হলেও তিনি ৫৫০ টাকায় দিতে পারবেন।
আলাপকালে জানা যায়, তিনি প্রতিষ্ঠানের একজন ‘মেশিন অপারেটর’ এবং পাশাপাশি এভাবে বিক্রি করেন। একজন সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মচারী কীভাবে বাসায় চায়ের মজুত রেখে পর্যটকদের কাছে তা ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করেন, তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বড় প্রশ্ন তোলে।
এই চা ব্যক্তিগত কেনা নাকি প্রতিষ্ঠানের কোনো উৎস থেকে পাওয়া এবং এই লেনদেনের কোনো অনুমোদন আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের আস্থা ভেঙে এভাবে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি।
সৌন্দর্য বাঁচাতে হলে পর্যটন খাতকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সৌন্দর্য অনন্য। কিন্তু পরিবহনভাড়ায় অনিয়ম, প্রাতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত অর্থের চাপ, ভাড়ার অস্পষ্টতা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো এবং নিরাপত্তার ঘাটতি এ অভিজ্ঞতাকে তিক্ত করে তোলে।
সিলেটের সাদাপাথরের অপূর্ব সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ! কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট। ঘাট থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের নৌপথের জন্য একটি নৌকার ভাড়া ৮০০ টাকা। যাত্রী একজন হোক বা একাধিক, ভাড়া অপরিবর্তিত। এই ভাড়া কীভাবে নির্ধারিত হয় এবং পর্যটকদের জন্য কোনো লিখিত মূল্যতালিকা কেন নেই, তা অস্পষ্ট।
এ ছাড়া সাদাপাথরের প্রবল স্রোতের মধ্যেও পর্যটকদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত পর্যটক পুলিশ বা সহায়তা কেন্দ্র চোখে পড়েনি। বাসে ফেরার পথেও দেখা গেল দূরত্বভেদে ভাড়ার কোনো তারতম্য নেই; ২ কিলোমিটার গেলেও ৭৫ টাকা, ২৪ কিলোমিটার গেলেও একই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
রাতারগুলের পথে সিএনজিচালকদের স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ভাড়া হাঁকানো থেকে শুরু করে নৌকার ভাড়ায় চরম অস্বচ্ছতা দেখা গেছে। নৌকার জন্য ১ হাজার ৮০০ টাকা নেওয়া হয় (যার মধ্যে ৪০০ টাকা বন বিভাগের ফি বলা হলেও কোনো রসিদ বা স্পষ্ট প্রদর্শন ছিল না)।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, ১ হাজার ৮০০ টাকা ভাড়ার নৌকার মাঝি ছিল আনুমানিক ১২ বছরের এক কিশোর। রাতারগুলের ভেতরে আরও অনেক নৌকায় ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাঝির দায়িত্বে দেখা গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে শিশুদের ব্যবহার শুধু আইনবহির্ভূত নয়, চরম উদ্বেগজনকও বটে। এ ছাড়া ১ হাজার ৮০০ টাকার বিনিময়ে মাত্র ৩৪ মিনিট ঘুরিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়, যা পর্যটকদের আগে থেকে জানানো হয়নি। পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের দায়িত্বরত কর্মীর সঙ্গে কথা বললে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে নৌকা চালানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো সমাধান দেননি। ফেরার পথে রাস্তায় সিএনজি থামিয়ে অবৈধ চাঁদা আদায়ের অভিজ্ঞতাও যোগ হয়।
সৌন্দর্য বাঁচাতে হলে পর্যটন খাতকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সৌন্দর্য অনন্য। কিন্তু পরিবহনভাড়ায় অনিয়ম, প্রাতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত অর্থের চাপ, ভাড়ার অস্পষ্টতা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো এবং নিরাপত্তার ঘাটতি এ অভিজ্ঞতাকে তিক্ত করে তোলে।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি—দৃশ্যমান স্থানে পরিবহন ও নৌকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানো; সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব কর্মচারীদের অনিয়মতান্ত্রিক ব্যক্তিগত লেনদেন প্রতিরোধে তদন্ত ও তদারকি বাড়ানো; পর্যটকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ কেন্দ্র বা হেল্পলাইন চালুর ব্যবস্থা করা; ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় পর্যাপ্ত পর্যটক পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা; শিশুশ্রম ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো কঠোরভাবে বন্ধ করা।
প্রকৃতির কাছে মানুষ যায় প্রশান্তি ও স্বস্তি পেতে; প্রতিটি ধাপে দর-কষাকষি আর হয়রানি পোহাতে নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আমাদের পর্যটন খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
মো. মনির হোসেন
সংগঠক, নওগাঁ