
৩ থেকে ৯ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সম্পাদক ও সংবাদকর্মী মিলিয়ে বাংলাদেশের ২৬ জন গণমাধ্যম প্রতিনিধি ভারত সফর করেছিলেন। ওই সফরের সময় ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার পাশাপাশি কয়েকজন বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন রাহীদ এজাজ
দুই দেশের সম্পর্কের দেড় বছরের ‘কঠিন সময়’ পেরিয়ে ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে আগ্রহী দিল্লি। ধীরে ধীরে দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়াগুলো সচল করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কেন্দ্রে মানুষকে রাখার ওপর জোর দিচ্ছে ভারত। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিক্রমায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে নিরাপত্তা। কেননা, ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে ‘নিরাপত্তার’ বিষয়টিতে দিল্লির অগ্রাধিকার বজায় থাকছে।
ভারতের কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা ‘টানাপোড়েন’ শেষে বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শেষে ‘এক মুহূর্ত নষ্ট’ না করে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে ভারতের মনোযোগের কথা বলছেন। আর ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে দুই নিকট প্রতিবেশীর একে অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এগিয়ে চলার বিকল্প নেই। মানুষকে কেন্দ্রে রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যখন ভারতের মনোযোগ, গত বছর বাংলাদেশের পোশাক, পাট রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধের মতো বিষয়গুলোর দ্রুত সুরাহা জরুরি। একই সঙ্গে মানুষে মানুষে যোগাযোগ নিবিড় করতে ভিসা প্রক্রিয়াও দ্রুত সহজ করা উচিত।
► দিল্লির কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্ক যে বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল, এটা আর গোপন নয়।
► বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সব সময় আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকে। ভবিষ্যতেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না।
দিল্লির কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্ক যে বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল, এটা আর গোপন নয়। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিতে দিল্লি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠিয়ে সম্পর্কের বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। হাইকমিশনার হিসেবে পেশাদার কূটনীতিবিদের পরিবর্তে রাজনীতিবিদ হওয়ার কারণে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্ককে তিনি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখবেন। মানুষ ও রাজনীতির ব্যাপকতর পরিসর থেকে তিনি সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিতে নজর দেবেন।
সম্প্রতি দিল্লি ও মুম্বাই সফর করে সরকারি ও বেসরকারি নানা স্তরে মতবিনিময় শেষে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন মনোভাব পাওয়া গেছে। ৩ থেকে ৯ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সম্পাদক ও সংবাদকর্মী মিলিয়ে বাংলাদেশের ২৬ জন গণমাধ্যম প্রতিনিধি ভারত সফর করেছিলেন। ওই সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি, ভারতের সাবেক জাতীয় উপনিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঢাকায় দেশটির সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনের পাশাপাশি কয়েকজন বিশ্লেষকের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে।
নজর সরবে না নিরাপত্তা থেকে
গত ৫ মে এক আলাপচারিতায় দিল্লিভিত্তিক কৌশলগত ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের সমন্বয়ক পঙ্কজ সরন বলেন, ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারতের লক্ষ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী নীতিতে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আঞ্চলিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং সংযুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থিতিশীলতার স্বার্থে নিরাপত্তা জোরদার করা।
পঙ্কজ সরনের মতে, গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করার আগ্রহ গোপন রাখেনি। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিরলাকে পাঠিয়েছেন। শপথ অনুষ্ঠানের পর নরেন্দ্র মোদির লেখা চিঠি তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছেন ওম বিরলা।
ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে ভারতের নতুন অধ্যায় শুরুর আরেকটি পদক্ষেপ সাবেক রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ সরন বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মোদির আস্থাভাজন দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন ‘সম্মানিত, অভিজ্ঞ এবং পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদের’ নিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেন।
পঙ্কজ সরন মনে করেন, তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নরেন্দ্র মোদি এই বার্তাই দিচ্ছেন যে কোনো সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে নেওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক পরিসরে দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যকর এমন কাউকে পাঠানো হচ্ছে, যিনি বাংলাদেশের সমাজ এবং ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সম্পর্কে তুলনামূলক ভালো ধারণা রাখেন এবং যার ভিত্তিতে তিনি তাঁর মত দিল্লিকে জানাতে সক্ষম হবেন। ফলে একাত্তরের পর প্রথমবারের মতো একজন রাজনীতিবিদকে ঢাকায় হাইকমিশনার নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকে নরেন্দ্র মোদির দুই দেশের রাজনৈতিক পরিসরে সেতুবন্ধ জোরদারের বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
প্রশ্ন চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে দিল্লির মনোযোগের পর্বে বিষয়টি দুই দেশের প্রেক্ষাপটেই সীমিত থাকছে না। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে যখন তিক্ততার মাত্রা বেড়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন আর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ দশকের মধ্যে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটা সবচেয়ে ভালো। আর এর শুরুটা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকে।
আর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে চীনের যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। উল্টো ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছে চীন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ সবকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও দেশটি সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছে। আর একই সময়ে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ শাসনামলের স্থবির সম্পর্কে গতি এনেছে। সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের সম্পর্কে নির্বাচনের পর ছন্দপতন ঘটেনি। সমানতালে তা এগিয়ে চলেছে।
ভারতের সাবেক জাতীয় উপনিরাপত্তা উপদেষ্টা পঙ্কজ সরন বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেবে আর এই সমীকরণে ভারতের অবস্থানটা কোথায় থাকবে—ভবিষ্যতে এটা হবে বড় প্রশ্ন।
ভারতের কূটনৈতিক মহলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির একধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতা বজায় রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক আছে। তাই প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে ওই তিন দেশের সম্পর্কের বিবর্তনের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে ভারত।
যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের প্রসঙ্গ না এলেও ৪ মে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীদের মতবিনিময়ের সময় ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের সমীকরণের প্রসঙ্গটি এসেছিল। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি দৃশ্যমান হয়। দুই দেশের সম্পর্কের এই পরিবর্তনকে ভারত কীভাবে দেখে জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, সেটা আমার বলার কথা নয়। এটা বাংলাদেশই ঠিক করবে। আমি শুধু এটুকু বলব, কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপ যেন আমাদের দুই দেশের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে ব্যাহত না করে সে বিষয়টিতে আমার গুরুত্ব থাকবে।’
গঙ্গা চুক্তির জন্য ৪০ বছরের উপাত্ত অপরিহার্য
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সব সময় আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকে। ভবিষ্যতেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না। এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে ঐতিহাসিক চুক্তিটি সইয়ের সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের গড় প্রবাহ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পঙ্কজ সরন বলেন, ১৯৯৬ সালে চুক্তি সইয়ের সময় চার দশকের উপাত্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তিন দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর চুক্তিটি করতে হলে নতুন উপাত্ত বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, ২০২৬ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষে ওই উপাত্ত আর কাজে আসবে না। ফলে গঙ্গা নিয়ে আলোচনা শুরুর সময় ১৯৮৬ সাল থেকে পরবর্তী ৪০ বছরের গড় প্রবাহকে বিবেচনায় নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ, পরিবেশগত কারণে পানি কমেছে আবার পানির ব্যবহারও বেড়েছে। তবে দর-কষাকষির বিষয়টি নির্ভর করবে দুই দেশ ‘নতুন বাস্তবতা’ মেনে নিতে পারে কি না তার ওপর।
ভারতের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপির ক্ষমতাসীন হওয়া তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কি না, জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা জানান। তবে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ফল তিস্তা চুক্তিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে না; কারণ, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় কেন্দ্র থেকে।
অন্যদিকে দুই দেশের অভিন্ন নদী তিস্তায় চীনের বৃহদায়তন প্রকল্প নির্মাণের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘তিস্তায় প্রকল্প করার বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। নতুন সরকার চাইলে আমরা ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য তৈরি আছি।’
বিধিনিষেধ দূর করতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ
দুই দেশের টানাপোড়েনের মধ্যেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আর ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওই পরিমাণ ছিল যথাক্রমে সাড়ে ১২ ও ১৩ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় বণিক সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের মতে, প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করতে পারে। কারণ, সেপা শুধু পণ্যের বাণিজ্যে সীমিত থাকবে না। এটি সেবা খাত, বিনিয়োগ সহায়তা, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং দক্ষতা উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করার পথ করে দেবে।
দিল্লি সফরের সময় বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধিদল সিআইআই প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের সদর দপ্তরে মতবিনিময় করে। এ সময় সিআইআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি (আন্তর্জাতিক ব্যবসা) পঙ্কজ সরন বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পর্বটি শুধু বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যই নয়, বরং তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে সমর্থন করার জন্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পরবর্তী ধাপ গঠনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার খাতগুলো কী কী হতে পারে জানতে চাইলে পঙ্কজ সরন জানান, চিকিৎসা পর্যটন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কৃষি খাতের মূল্য শৃঙ্খল, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং এমএসএমই হতে পারে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তিনি বলেন, ভারতের ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, ফিনটেক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উৎপাদন উৎকর্ষ এবং টেকসই উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহায়তা করতে পারে।
হাত ধরাধরির বিকল্প নেই
মুম্বাইভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গেটওয়ে হাউস ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অন গ্লোবাল রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো অমিত ভান্ডারির মতে, এই মুহূর্তে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যে প্রেক্ষাপট, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের একে অন্যের হাত ধরাধরি করে চলার কোনো বিকল্প নেই। ফলে আগের দেড় বছরের তিক্ততার পর্ব পেরিয়ে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক ইতিবাচক পথেই এগোবে।
৭ মে মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড সেন্টারে বসে আলাপচারিতায় অমিত ভান্ডারি জানালেন, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টিতে ভারত মনোযোগ দিচ্ছে। এই চার দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাকলে পাকিস্তানকে নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ ভারতের আছে, সেটা উত্তরণ করা সম্ভব।
অমিত ভান্ডারি মনে করেন, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের কারণে আগামী দুই বছর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা এগিয়ে যাবে। তবে তিনি এ–ও বলেন, এআইয়ের কারণে ভারতে কর্মসংস্থানের ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। অর্থনীতিতে এর জের থাকবে। এমন একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে আর্থিকভাবে ভারত কতটা সহায়তা দিতে পারে, সেই প্রশ্নটাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
● রাহীদ এজাজ প্রথম আলোর কূটনৈতিক প্রতিবেদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব