
গত শনিবার চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়ে বিকেল চারটার দিকে ঘণ্টাখানেক সময়ের হালকা বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যাওয়ার এই চিত্র নগরের দীর্ঘদিনের ড্রেনেজ–সংকটকে আবারও সামনে এনে দেয়। বৃষ্টির পানি নামার আগেই রাস্তার বিভিন্ন অংশে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। ফলে মুহূর্তেই ব্যস্ত এই সড়কটি পরিণত হয় স্থবির এক জলরাস্তায়।
পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহন চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়, যেগুলো সরাতে স্থানীয় লোকজনকে ঠেলে সাহায্য করতে দেখা যায়। রিকশাচালকদের যাত্রী নিয়ে হাঁটুসমান পানির মধ্যে হেঁটে রিকশা টানতে দেখা যায়, যা শুধু শ্রমের চিত্রই নয়, বরং জীবিকার তাগিদে সংগ্রামের প্রতিফলন। অন্যদিকে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে একে অপরকে ধরে পানি পার হচ্ছেন, কেউ জুতা হাতে নিয়ে, কেউ আবার পোশাক ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্বিধায় দাঁড়িয়ে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নগরের কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ওপর। অফিসগামী মানুষ নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন, অনেকে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। গণপরিবহনের স্বল্পতা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও শোনা যায়, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও কষ্টকর। স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পানির মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে দেখা যায়, যা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর।
জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের পানির সঙ্গে ড্রেনের নোংরা পানি মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক স্থানে রাস্তার গর্ত ঢেকে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়। এতে চলাচল শুধু ধীর নয়, বিপজ্জনকও হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও কার্যকর ও টেকসই সমাধানের অভাব লক্ষণীয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ–ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের অসচেতনতা—যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক ফেলে ড্রেন বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা, যা পানিনিষ্কাশনকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে দীর্ঘ সময়।
নগরবাসীর প্রশ্ন, সামান্য বৃষ্টিতেই যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে সামনে আসা ভারী বৃষ্টির চাপ কীভাবে সামলানো হবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। এই দায়ভার কার—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
পুনরাবৃত্ত এই দুর্ভোগ কেবল একটি দিনের চিত্র নয়, বরং নগরের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতার প্রতিফলন। সমাধানের প্রতিশ্রুতি বারবার শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়—এটাই নগরবাসীর প্রধান হতাশা।
আকিবুল ইসলাম জিসাদ আলোকচিত্রী