প্রতিক্রিয়া

প্রসঙ্গ যখন ডিম ও মূল্যবৃদ্ধি

ছবি: এএফপি

‘তোমার ছেলে পরীক্ষায় ডিম পেয়েছে’—১৬০ টাকা ডজন ডিমের যুগে কোনো মা আর ছেলের ব্যাপারে এমন কথা বলবে না ছেলের বাপের কাছে, বললে সর্বোচ্চ ঘোড়ার ডিম পেয়েছে বলবে, কারণ সমাজে ঘোড়ার ডিমের দাম এখনো বাড়েনি। বিজ্ঞজনেরা বলেন, মুরগির সব ডিম এক ঝুড়িতে নিও না, এখন তো আর এটা বলবে না, কারণ এখন তো ঝুড়িগুলো ‘শূন্য গোয়াল’ হয়ে গেছে। যাদের মুরগি আছে, পেট কাটবেন না, এরা ‘সোনার ডিম’ দিচ্ছে এখন! একটি মুরগির ডিম উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ২৫০ থেকে ২৭০টি। তবে কোনো কোনো মুরগি ৩০০টির বেশি ডিম পাড়ে। এ সবগুলো এখন সোনার ডিম!

ডিমের দাম এত বাড়ার তেমন কোনো কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। পোলট্রি ফিডের দাম বেড়েছে বুঝলাম, তাই বলে ডিমের দাম এত বেশি বেড়ে যাওয়া কি অস্বাভাবিক নয়? বলা হয় ডিম শুধু একবারই ভাঙে। ডিমের দাম তার খোলস ভেঙে ইতিহাস গড়েছে। অন্তত প্রতিদিন যেন এটি নতুন রেকর্ড না গড়ে। তাতে আমাদের ডিম-ভীতি বেড়ে যাবে। কথিত আছে, হলিউডের কিংবদন্তিতুল্য পরিচালক আলফ্রেড হিচকক ডিম ভয় পেতেন। ডিমের মতো ‘নিরীহ’ খাদ্যবস্তু ভয় পাওয়ার কারণ জানাতে গিয়ে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘সাদা ওই বস্তু যাতে কোনো ছিদ্র নেই… ডিমের কুসুমের চেয়ে বিরক্তিকর কোনো জিনিস কোনো দিন দেখেছেন?’ ৮১ বছরের জীবনে একটাও ডিম খাননি আলফ্রেড হিচকক। আমাদের সবাইকে এখন কি আলফ্রেড হিচককের মতো ডিম খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে?

চিরায়ত একটি বিতর্ক—ডিম না মুরগি আগে? এর উত্তর কারও জানা নাই। ডিমের আগে যদি মুরগি আসে, তবে সে মুরগি ফুটল কোন ডিম থেকে, আর মুরগির আগে যদি ডিম আসে, তবে সে ডিম পাড়ল কোন মুরগি? ডিম-মুরগি নিয়ে এই প্যাঁচ কখনো শেষ হওয়ার নয়। তবে যে বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে, একটা মুরগি হলো একটা ডিম থেকে আরেকটা ডিম তৈরি করার প্রক্রিয়া মাত্র।

বলা হয় সব মানুষ ডিমের মতো। বাইরে একই রকম, কিন্তু প্রস্ফুটিত হলে সম্পূর্ণ অন্য রকম। খোলস পাল্টানো মানুষের স্বভাব হলেও, সমাজ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সমাজকে ইতিবাচকভাবে পাল্টাতে হবে। ডিম না ভাঙলে তো আর মজাদার অমলেট বানানো যাবে না। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, ‘আজকের ডিম আগামী কালের মুরগির চেয়ে ভালো।’

মানুষ সব সময় ডিম খাবে, কারণ ডিমে অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা মানসিক বিকাশে সহায়ক। এ ছাড়া ডিমে ভিটামিন এ, ফ্লুয়েড, তিন প্রকার ভিটামিন বি, ফসফরাস ও সিলেনিয়াম থাকে। ডিমে কোনো কার্বন কিংবা চিনি থাকে না।

পচা ডিমও ফেলনা নয়, প্রতিবাদের উপকরণ হিসেবে কখনও কখনও পচা ডিম কাজে লাগে। এমনকি মানুষ ডিম খাওয়া ছেড়ে দিলেও ডিম ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নাই। বহুবিধ ব্যবহার বাড়তে পারে। প্রাচীনকালে রোমের মানুষ ভাগ্য জানতে ডিমের শরণাপন্ন হতেন। এ যুগেও যে অদৃষ্টবাদী সব মানুষ ডিমের দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তা কিন্তু নয়। এখনো কোনো কোনো দেশে পানিতে ডিম ছেড়ে ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করে মানুষ। অনেকে আবার ডিমের খোসা বা কুসুম দিয়েও নিজের জীবন থেকে আপদ-বালাই দূরে রাখার চেষ্টা করেন।

ডিম ব্যবসায়ীদের মনে রাখতে হবে, ইউটিউবে ডিম কীভাবে ভাঙতে হয়, কীভাবে ডিমের কুসুম ফাটতে হয়- এসব দেখিয়েও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন অনেকে। ডিম জনপ্রিয়, তাই ডিমবিষয়ক ভিডিওগুলোও খুব জনপ্রিয়। এ ছাড়াও ডিম চীনে রপ্তানির কথা ভাবা যায়। কথিত আছে, পৃথিবীতে যত ডিম খাওয়া হয় তার ৪০ শতাংশ চীনের মানুষ খান।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও পরমাণুবিজ্ঞানী এপিজে আবুল কালাম আজাদের একটি কথা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। যদি একটি ডিম বাইরের কোনো শক্তির কারণে ভেঙে যায় তবে জীবন শেষ। তবে যদি ডিমটি ভেতরের শক্তির কারণে ভেঙে যায় তবে জীবনের শুরু হয়। ভেতরের শক্তির কারণে অধিক ডিম ভাঙবে, এ কামনা আমাদের। বিদ্রোহ বা বাইরের অন্য কোনো শক্তির কারণে যেন দেশের সব ডিম ভেঙে না যায়।

  • ব্যারিস্টার খন্দকার এম এস কাউসার আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
    Kawsarbar@gmail.com