দৈনিক প্রথম আলোয় জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে বিশেষ সংখ্যা ‘অভ্যুত্থানের অন্দরে’–এ প্রকাশিত লেখা। ১৬ জুলাই ২০২৬
দৈনিক প্রথম আলোয় জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে বিশেষ সংখ্যা ‘অভ্যুত্থানের অন্দরে’–এ প্রকাশিত লেখা। ১৬ জুলাই ২০২৬

মানস চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া

কাঠগড়ায় ‘প্রগতিশীলতা’: একটি পদ্ধতিগত সমালোচনা

১৬ জুলাই ২০২৬, দৈনিক প্রথম আলোয় ফিরোজ আহমেদ বিরচিত ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ রচনাটি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সমকালীন বাংলাদেশে কাঠগড়ায় টেনেহিঁচড়ে তোলার অসহিষ্ণু প্রক্রিয়াটার দিকে তিনি মনোযোগী আছেন। ধারাবাহিকভাবেই। সে জন্য তিনি সমমনস্ক কিংবা ক্রিটিক্যাল রাজনীতিমনস্কদের আত্মীয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। তিনি ধন্যবাদ পাবেন।

তবে এ বিশেষ রচনা আত্মরক্ষামূলক মনে হয়েছে আমার। আবার আত্মরক্ষামূলক রচনার পুরো হক তাঁর আছে বলেই আমি বিবেচনা করি। আমার বলার বিষয়টা অন্যত্র।
‘প্রগতিশীল’ একটা জেনেরিক, এমনকি সেকেলে বর্গ। এই গড়গড়া ও অচল ধরনের বর্গ শিরোনামে ও বিষয়বস্তুতে তিনি বাছাই করাটা তাই অবশ্যই সুচিন্তিত।

‘প্রগতি’ ধারণার সিস্টেমেটিক সমালোচকদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে পরিপ্রেক্ষিতচ্যুত করে তথা ম্যানিপুলেট করে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেই প্রবন্ধটির রচয়িতা আরও বড় বিপদ ঘটিয়েছেন। হিংসাত্মক রাজনীতি যে সব ধরনের তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’কেই একহাত দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

লেখকের কারণ ও প্রেষণা যা–ই থাকুক না কেন, এটা করে তিনি এই বর্গে ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে পড়ে যেতে পারেন, যাঁরা তাঁদের প্রতি সুবিচার করেননি। এমনকি ক্রুদ্ধ সমকালীন বাংলাদেশের শাসনকর্তা ও সেমি শাসনকর্তাদের সামনে বৃহত্তর এই বর্গের বাসিন্দাদের ইতিমধ্যে নাজুক দশাকে আরও নাজুক বানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। হয়তো শেষোক্তটা লেখকের অনবধানবশত। কিন্তু তাঁর ইনটেন্টে (অভিপ্রায়) কিছু আসে–যায় না, আমি তাঁর কনটেন্টের কনসিকোয়েন্স (বিষয়বস্তুর পরিণতি) বলছি মাত্র।

সংক্ষেপে ও সহজ করে বললে, তোপখানার বাম রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেই, অধিকন্তু, ‘প্রগতিশীল’ বর্গটির আওতায় ন্যূনতম থাকবেন এসব মানুষজন:
—বিবিধ শাসকের লাগাতার ও মৌসুমি ক্রিটিকরা।
—নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে বিবিধ প্রজাদের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে সোচ্চার ব্যক্তিরা।
—বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও বিদেশে বসবাসরতদের মধ্যকার নাগরিক অধিকার নিয়ে চিন্তিত বর্গ।
—বৈশ্বিক মুক্তি আন্দোলনের সমর্থকেরা।
—সাংস্কৃতিকভাবে বহু–পরিচয়ের মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে আগ্রহী মানুষজন।
—শ্রমিকের স্বার্থ নিয়ে নিবেদিতপ্রাণ খুচরা সংগঠকেরা।
—পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন জারি রাখা মানুষজন।
—এমনকি প্রগতিশীলতার সিস্টেমেটিক ক্রিটিক অরক্ষণশীল একাডেমিক-সাংবাদিকেরা। ইত্যাদি।

এটা একটা সাধারণ দৈব বা র‍্যান্ডম তালিকা মাত্র। একে আরও দীর্ঘ করা যায়। তালিকার সাধারণ আটপৌরে পাঠেই যেকোনো পাঠকের কাছে স্পষ্ট হওয়ার কথা যে ‘প্রগতিশীল’বর্গ নেহাত কোনো সহজে নির্ণয়যোগ্য বর্গ নেই বহুকাল আগেই এবং যথার্থই এর সব বর্গকেই ঠেলেঠুলে ‘কাঠগড়ায়’ তোলা হয়েছে গত দুই বছরের বাংলাদেশে।

‘প্রগতি’ ধারণার সিস্টেমেটিক সমালোচকদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে পরিপ্রেক্ষিতচ্যুত করে তথা ম্যানিপুলেট করে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেই প্রবন্ধটির রচয়িতা আরও বড় বিপদ ঘটিয়েছেন। হিংসাত্মক রাজনীতি যে সব ধরনের তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’কেই একহাত দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এ বাস্তবতা পক্ষপাতমূলক উগ্ররা ছাড়া সবাই বুঝতে পারছেন। সাংস্কৃতিকভাবে অপছন্দনীয় যে কাউকেই যে কেবল নিন্দা করছে, তা নয়, পারলে সাবেক শাসকের অনুচর বানানোর চেষ্টা করছে, ‘শাস্তিযোগ্য’ হিসেবে গড়াপেটা করছে।

এ প্রবণতাকে ফিরোজ আহমেদ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু বানাননি। তিনি বানিয়েছেন সেসব বাম রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডকে, যারা বিগত শাসনপ্রণালির অনুচর, সহচর বা সমর্থক থেকে গিয়েছিল।

একটা বেশ অপ্রয়োজনীয় বর্গবিভাজন করে, তারপর সেখানকার ভরকেন্দ্রের জায়গাকে রদবদল করে, সেই অপ্রয়োজনীয় বর্গটার মধ্যকার অহেতু কোপানলে থাকা অংশকে সমুন্নত না রেখে বরং একটা ঢিলেঢালা ইতিমধ্যে মীমাংসিত অংশের ‘কৃতকর্ম’তে মনোযোগ দিয়েছেন লেখক।

এটা তাঁর লাগাতার বৌদ্ধিক চর্চার মধ্যে একটা পিচ্ছিল অসতর্কতা বা স্লিপ হলে বেশ কস্টলি বা গুরুতর পিছলানি। আর তিনি যে সজ্ঞানে এ রকম বর্গীকরণ ও লঘূকরণ করতে পারেন, তা আমি আসলে ভাবতেই পারছি না, যেহেতু রচয়িতার দীর্ঘদিনের মনোযোগী ও সতর্ক পাঠক আমি।

  • মানস চৌধুরী শিক্ষক ও লেখক
    মতামত লেখকের নিজস্ব