ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ সংকটের ( উল্লেখ্য শনিবার ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র) দিকে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন বিশ্বের রাজধানীগুলো, সংবাদকক্ষ এবং নীতিনির্ধারণী মহলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেটি হলো চীন কি ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে? যদি আসে, সেই সাহায্য কেমন হবে?
এর উত্তরটি প্রচলিত সামরিক জোটে ‘দুই পক্ষের একটিতে থাকা’—এই দ্বিমাত্রিক ধারণাকে ভেঙে দেয়। চীন সরাসরি সেনা পাঠাবে বা কোনো যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়াবে—এ সম্ভাবনা কম। কিন্তু এটাকে নিষ্ক্রিয়তা বলে ধরে নেওয়া হলে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রকৃতি ভুলভাবে বোঝা।
ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন বাস্তব, বহুস্তরীয় এবং সামরিক হস্তক্ষেপের তুলনায় বেশ টেকসই। এটি কেবল ভিন্ন একটি কৌশলগত পরিসরে পরিচালিত হয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন নিয়মিতভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। নীতির ওপর দাঁড়িয়ে চীন তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
গত মাসে জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘে চীনের দূত সান লেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কঠোরভাবে বলেন, ‘বলপ্রয়োগ কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি সমস্যাকে আরও জটিল ও দুরূহ করে তুলবে। যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি অননুমেয় অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।’
এটা নিছক কথার কথা নয়। চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ‘ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা সংরক্ষণে’ সমর্থন করে।
জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে চীন তেহরানকে একটি অমূল্য সুবিধা দিচ্ছে। সেটি হলে বিশ্বমঞ্চে ইরানকে বৈধতা প্রদান এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পাল্টা বয়ান তৈরি।
২০২১ সালে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পূর্ণ সদস্য হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার পর চীনের কূটনৈতিক সমীকরণে মৌলিক পরিবর্তন আসে। এর মধ্য দিয়ে ইরান চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়। এর পরপরই তেহরান ব্রিকস জোটেও অন্তর্ভুক্ত হয়।
চীন ইরানকে ‘উদ্ধার’ করবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরটি সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। যদি উদ্ধারের অর্থ সৈন্য ও যুদ্ধজাহাজ বোঝানো হয়, উত্তরটি হবে না। যদি উদ্ধারের অর্থ হয় ইরানকে টিকে থাকতে, প্রতিরোধ করতে এবং দর–কষাকষি করার ক্ষেত্রে ইরান যাতে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে সে জন্য সহায়তা করা, তাহলে উত্তরটি নীরবে, স্থায়ীভাবে এবং কৌশলগতভাবে হবে হ্যাঁ।
এগুলো কোনো সামরিক জোট নয়, কিন্তু এই জোটগুলো এমন কিছু তৈরি করে, যা সামরিক জোটের চেয়েও বেশি স্থায়ী।
গত বছর চীন, রাশিয়া ও ইরানের কূটনীতিকেরা বেইজিংয়ে বৈঠক করেন এবং ব্রিকস ও এসসিওর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনে ‘সমন্বয় জোরদার’ করার বিষয়ে একমত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতার অর্থ হলো—ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়টি মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিগুলোর জন্যও একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
চীন যদিও সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, তবু দৃশ্যমান সামরিক সহযোগিতা থেকে বেইজিং পিছিয়ে থাকেনি। চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়া, চীন ও ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যৌথ নিরাপত্তা মহড়ার জন্য নৌযান মোতায়েন করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এক সহকারী এই মহড়াকে পশ্চিমা আধিপত্য মোকাবিলায় ‘সমুদ্রভিত্তিক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে তোলার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন।
আরও বাস্তব বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার খবর এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মিডল ইস্ট আই গত বছর জানায়, ইরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য চীনে তৈরি ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পেয়েছে। এটি ছিল তেলের বিনিময়ে অস্ত্র চুক্তির অংশ। এর মাধ্যমে তেহরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
সংবাদমাধ্যমের খবরে এটাও এসেছে যে চীন থেকে ইরান জে–২০ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, জে–১০সি বিমান এবং এইচকিউ–৯ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পেতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখানে প্রতীকী একটি ঘটনাও তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি মাসে ইরানের বিমানবাহিনী দিবসে একজন চীনা সামরিক অ্যাটাশে ইরানি বিমানবাহিনীর এক কমান্ডারের হাতে জে–২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের একটি মডেল তুলে দেন। প্রতীকী এ ঘটনাটিকে ব্যাপকভাবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
চীনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সমর্থন মাঠযুদ্ধে দৃশ্যমান না হলেও, ইরানের জাতীয় হিসাব-নিকাশে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও চীন ইরানের প্রধান জ্বালানি অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ ইরানি তেল কিনছে চীনা ক্রেতারা।
যুক্তরাষ্ট্র এটি লক্ষ করেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট শানদং প্রদেশের চীনা তেল পরিশোধনাগারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয় ইরানের অবৈধ তেল রপ্তানি শূন্যে নামানো হবে। ওয়াশিংটনে চীন দূতাবাস এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানায়।
যদিও চীন–ইরান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার মাঝে মাঝে মার্কিন আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে ইরান থেকে তেল কেনা স্থগিত করে। তবে সামগ্রিক চিত্রটি হলো, বহিরাগত চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ‘অক্সিজেন’ সরবরাহ করে যাচ্ছে চীন।
তাহলে এখানে প্রশ্নটি হলো চীন যদি ইরানকে ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক আশ্রয়, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সামরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক ‘অক্সিজেন’ প্রদান করে, তাহলে কেন আরও এগিয়ে যায় না? কেন যুদ্ধজাহাজ পাঠায় না বা হস্তক্ষেপের সরাসরি হুমকি দেয় না?
উত্তরটি খুঁজতে হবে চীনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভেতরে। বেইজিংয়ের সবচেয়ে জরুরি কৌশলগত লক্ষ্য হলো জাতীয় পুনর্মিলন অর্জন করা। এই লক্ষ্য পূরণের আগে, যেকোনো পদক্ষেপ যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যাপক সংঘাত ঘটাতে পারে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করবে চীন।
এ ছাড়া চীন বিশ্বাস করে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ ইরানে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু দেশটির শাসকদের পরিবর্তন ঘটাবে না। এই পরিস্থিতিতে বেইজিং হয়তো ইরানের ক্ষেত্রেও ইউক্রেন সংঘাতের মডেল অনুসরণ করতে পারে। এর অর্থ হলো, ইরানের সঙ্গে চীন সরাসরি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলবে। আক্রমণের শিকার দেশটির সঙ্গে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র সম্পর্ক বজায় রাখবে। জাতিসংঘে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেবে। এমন সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে না।
চীন ইরানকে ‘উদ্ধার’ করবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরটি সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। যদি উদ্ধারের অর্থ সৈন্য ও যুদ্ধজাহাজ বোঝানো হয়, উত্তরটি হবে না। যদি উদ্ধারের অর্থ হয় ইরানকে টিকে থাকতে, প্রতিরোধ করতে এবং দর–কষাকষি করার ক্ষেত্রে ইরান যাতে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে সে জন্য সহায়তা করা, তাহলে উত্তরটি নীরবে, স্থায়ীভাবে এবং কৌশলগতভাবে হবে হ্যাঁ।
নেলসন ওয়ং চীনের সাংহাইয়ে অবস্থিত সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত