
বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আজ মঙ্গলবার শপথ নেবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। ‘অনেকগুলো হয়-এর পরে’ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ হলে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
অবশ্য নবনির্বাচিতদের দুটি শপথের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিতরা আজ দুটি শপথ নেবেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। সে হিসেবে নির্বাচিতরা প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে এই পরিষদ গঠন এবং সংবিধান সংস্কার কার্যক্রম ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আজ বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে শুরুতেই হোঁচট খাবে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম। এতে নতুন রাজনৈতিক সংকটও তৈরি হতে পারে।
বিএনপি মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই। বিদ্যমান সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বিভিন্ন পদের শপথের বিষয়ে বলা আছে। সেখানে সংসদ সদস্যদের শপথের কথা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয় নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনারেরও এ ধরনের শপথ পড়ানোর এখতিয়ার নেই।
গতকাল সোমবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ বিষয়ে কথা বলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করা। সাংবিধানিকভাবে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার ‘অ্যাভেইলেবল’ না থাকলে বা অপারগ হলে বা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধি না থাকলে দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। সে হিসেবে মঙ্গলবার (আজ) সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ হবে। এটা সিইসির সাংবিধানিক এখতিয়ার আছে।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘এর বাইরে...সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এটা যদি কনস্টিটিউশনে (সংবিধান) ধারণ হয়, সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধন) হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ফরম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন, সেটা নির্ধারিত হয়—এতগুলো হয়-এর পরে, তারপরে হলে হতে পারে।’
গতকাল বিকেলে সংসদ সচিবালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আজ সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপির দিক থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা না হলেও জামায়াত ও এনসিপি জানিয়েছে, তাদের সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সেই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট হয়েছে। মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছেন। জামায়াত সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবে।
গতকাল সন্ধ্যায় যমুনায় জুলাই সনদে সই করার পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আগামীকাল (আজ) শপথ গ্রহণ করবেন। আমরা একই সঙ্গে দুটো শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছি। আমাদের ওপর দেশের মানুষ যে আস্থা রেখেছে, আমরা তা বাস্তবায়ন করব।’
এদিকে গতকাল রাত নয়টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া লিখেছেন, ‘“সংবিধান সংস্কার পরিষদ” সদস্য শপথ আগামীকাল (আজ) নির্ধারিত সময়েই হতে হবে। “সংবিধানে নেই” মর্মে যদি “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” সদস্য হিসেবে শপথ না নিতে চান, তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথেরও কোনো মানে নেই। ২০২৬ সালে নির্বাচন কোন সংবিধানে ছিল জনাব সালাহউদ্দিন আহমদ?’
পরে এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদেরও মত নিয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ’ জারি করেন। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও রাখা হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী ও সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে অনেক কিছুই নেই। যেভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেটিও বর্তমান সংবিধানে নেই। তিনি মনে করেন, গত ১৫-১৬ বছরের স্বৈরশাসনের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে এসে এখন এসব বিতর্ক তৈরি করা অহেতুক। গণভোটে হ্যাঁ–এর পক্ষে মানুষ ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিএনপি বিশালত্ব ও সমঝোতার মনোভাব দেখিয়ে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে তাদের পদক্ষেপ নেবে, এটাই নাগরিক হিসেবে তিনি আশা করেন।
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু এবার নিয়মিত সংসদ নয়, সংবিধান সংস্কারে কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ—এমনটি বলা হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে।
দলগুলোর সঙ্গে সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এ ধরনের একটি পরিষদ গঠনের বিষয়টি এসেছিল। তখন, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান-সম্পর্কিত যেসব সংস্কার প্রস্তাব জুলাই সনদে আছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে। নিয়মিত সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ আছে। এভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে পরে এটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কিন্তু যদি আগামী সংসদকে সংবিধান সংস্কারের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকবে না। তবে ওই আলোচনায় বিএনপি এ ধরনের পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই—এমন মত দিয়েছিল।
এ ছাড়া সনদ বাস্তবায়নে অধ্যাদেশ নয়, একটি আদেশ জারির প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপি এর বিপক্ষে ছিল। তারা বলেছিল, এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।