
হবিগঞ্জে হামলার পর আজ সিলেটেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাড়িবহরে হামলার কথা উল্লেখ করে দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, তাঁদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে একটি ভয়াবহ ও বীভৎস পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
হবিগঞ্জে গত মঙ্গলবারের হামলায় চোখে আঘাত পাওয়া জাতীয় ছাত্রশক্তির স্থানীয় নেতা আলিফ চৌধুরী ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁকে দেখে এসে হাসপাতালের বাইরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন এনসিপির নেতারা।
দেশে গণতন্ত্রকে প্রস্ফুটিত করতে হলে বিরোধী দলের ওপর হামলা-মামলা করা যাবে না উল্লেখ করে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ‘হবিগঞ্জে হামলার প্রতিবাদে কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের গুন্ডারা হামলা করেছেন। একটা ভয়াবহ বীভৎস পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।’
ক্ষমতাসীন বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে বিরোধী দলের ওপর হামলা—নিপীড়ন করত, এখন বিএনপি সরকার হামলার মধ্য দিয়ে সেই পথে অগ্রসর হচ্ছে। ফ্যাসিবাদী জমানায় যেমন করে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন করা হতো, তাদের কর্মসূচি বানচাল করা হতো, একই ধরনের পথে বিএনপি সরকার অগ্রসর হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে আখতার বলেন, ‘আলিফ চৌধুরী এক চোখ হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর চোখে রড দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। আরেক চোখেও আবছা-আবছা দেখছেন। সেই চোখটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন আখতার হোসেন। এগুলো হলো-১. হামলায় এক চোখ হারানো ও আরেক চোখও হারাতে বসা আলিফ চৌধুরীর চিকিৎসার ব্যয় সরকারকে বহন করতে হবে, আলিফ ও তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ২. হবিগঞ্জে হামলাকারী ছাত্রদল-যুবদল ও বিএনপির চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের অবশ্যই গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; এবং ৩. এনসিপিসহ গণতান্ত্রিক বিরোধী দলকে কথা বলতে দিতে হবে ও এনসিপির জুলাই পদযাত্রাসহ সব ধরনের কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিলেও বিএনপি নির্বাচনে জয়ের পর কোনোভাবেই আর গণভোট মানছে না বলে অভিযোগ করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, গণভোট মানলে পুলিশ বাহিনীকে তারা দলীয়ভাবে ব্যবহার করতে পারত না, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন করতে পারত না, আমরা হয়তো আলিফের চোখ অন্ধত্বের দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে পারতাম।
‘এটা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি’
হবিগঞ্জে হামলার পর আজ সিলেটের গোলাপগঞ্জেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলার ঘটনা উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, এই হামলা করা হয়েছে হত্যার উদ্দেশ্যে। এসব হামলার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি, হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বিএনপিও কারও বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি।
‘আমরা শঙ্কা করছি, এটা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হচ্ছে, যেহেতু তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এটা দেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি,’ বলেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আলিফ চৌধুরীর চোখে রড ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো বর্বরোচিত হামলার সাক্ষী আমরা হলাম বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর। দুঃখজনক বিষয়, আলিফ আর কখনোই ভালো করে এই পৃথিবীকে স্বাভাবিক মানুষের মতো দেখতে পাবে না। তাঁর একটি চোখ স্থায়ীভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে, আরেকটি চোখেও সে সম্পূর্ণ রূপে দেখতে পাচ্ছে না।’
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব আবদুল আহাদ বলেন, আলিফ চৌধুরীর বাম চোখে রড দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। আক্রমণে চোখের কাঠামোগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর চোখের কাঠামোটা রক্তপিণ্ডের মতো দলা পেকে নষ্ট হয়ে গেছে। বাঁ চোখে সে আর কখনোই কিছু দেখবে না। ডান চোখেও সে ঝাপসা দেখছে।
আলিফের চিকিৎসা নিয়ে সকালে চক্ষুবিজ্ঞানের চিকিৎসকেরা বোর্ড সভা করেছেন উল্লেখ করে চিকিৎসক আহাদ বলেন, সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকালে অস্ত্রোপচার হয়। তাঁর দৃষ্টিশক্তি আর কখনোই আসবে না। উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া একটা ছেলে, যার বাবা অসুস্থতার কারণে হাঁটতে পারেন না, মা প্রতিবন্ধী। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, একজন বড় ভাই আছে। ভাইও খুব বেশি বুদ্ধিসম্পন্ন নন। পড়াশোনার পাশাপাশি আউটসোর্সিং-ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে সংসারের পুরো দায়ভার সে বহন করত। এই অবস্থা আমাদের লজ্জা দেয়। তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই আক্রমণটা করা হয়েছিল। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ।