নির্বাচনী প্রচার এখন তুঙ্গে; প্রার্থীদের প্রচারণার মাইক এখন ঘুরছে অলিগলিতে। শনিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরে
নির্বাচনী প্রচার এখন তুঙ্গে; প্রার্থীদের প্রচারণার মাইক এখন ঘুরছে অলিগলিতে। শনিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরে

ভোটের মাইকে ‘ঝালাপালা’ কান, শব্দদূষণ বাড়িয়েছে দ্বিগুণ

গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা। বাইরের কাজ শেষ করে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী সাইদ খান সাগর। কিন্তু তাঁর শান্তি কেড়ে নেয় নির্বাচনী প্রচারণার মাইকের তীব্র শব্দ। অতিষ্ঠ হয়ে জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন ৯৯৯-এ কল দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে মাইক বন্ধের ব্যবস্থা নেয়।

সাইদ খান সাগর প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনী শব্দদূষণ স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। রাত ৮টার পর মাইকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও সেটি মানছে না কেউ।

‘আমি বাধ্য হয়ে ৯৯৯-এ সহযোগিতা চেয়েছি। পরে পুলিশ এসে সেটি বন্ধ করে দেয়,’ বলেন সাগর।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় শব্দদূষণ নাগরিক দুর্ভোগের বড় উৎস। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবিরাম মাইকিং, প্রচারগাড়ি থেকে আসা উচ্চ শব্দের গান ও স্লোগান সেই দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলেছে। শব্দদূষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না আবাসিক এলাকা, বাজার, সরকারঘোষিত নীরব এলাকা ও হাসপাতালও।

অথচ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ২০২৫-এ বলা আছে, প্রচারণায় মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। প্রচারণায় ব্যবহৃত শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের মাত্রা ৬০ ডেসিবল অতিক্রম করতে পারবে না।

নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় বলা আছে, প্রচারণায় মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। প্রচারণায় ব্যবহৃত শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের মাত্রা ৬০ ডেসিবল অতিক্রম করতে পারবে না।

এ ছাড়া শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২৫-এ সরকারঘোষিত নীরব এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। বিধিমালায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, মেট্রোপলিটন পুলিশ ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে নিজেদের এখতিয়ারভুক্ত এলাকাকে বা এলাকার কোনো নির্দিষ্ট অংশকে নীরব এলাকা ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও অফিস এলাকার ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরেক প্রজ্ঞাপনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণা করে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের গুলশান-১-এর বাসিন্দা শাহ রাফায়েত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গুলশান সরকারঘোষিত নীরব এলাকা। কিন্তু এখানে প্রতি ৫ মিনিট পরপর হয় দাঁড়িপাল্লা, নয় ধানের শীষের উচ্চ শব্দের প্রচারণা চলছে।

মাইকের আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে।
-ওবায়দুল্লাহ মিয়া, দোকানি, ঢাকা মেডিকেল এলাকা

কখনো অটোরিকশায়, কখনো রিকশায় মাইক বেঁধে শব্দদূষণ ঘটিয়ে চলেছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনের প্রচারণায় প্রার্থীরা আচরণবিধি না মেনে চলা একটি বাজে উদাহরণ তৈরি করছেন বলে মন্তব্য করেন রাফায়েত।

‘শুধু গুলশানে না, আমার অফিস নিকেতনে। সেখানেও একই অবস্থা,’ বলেন তিনি।

মাত্রা ৬০ ডেসিবেল, পাওয়া যাচ্ছে ১২০

কারওয়ান বাজারে নির্বাচনী প্রচারে উচ্চস্বরে বাজছে মাইক। সম্প্রতি তোলা

নির্বাচন আচরণবিধিতে প্রচারণায় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবলের মধ্যে রাখার কথা বলা হলেও বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস) তাদের গবেষণায় শব্দদূষণের মাত্রা পেয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবল।

ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আমিনবাজার, উত্তরা, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, খিলগাঁও, ধানমন্ডি, শান্তিনগর, মালিবাগ, পুরান ঢাকা এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা গড়ে ১২০ ডেসিবেল পেয়েছে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজ।

নির্বাচনী প্রচারণায় কেমন শব্দদূষণ হচ্ছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করছে ক্যাপস। ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে রাজধানীর আমাদের আবাসিক এলাকা ও সড়কের মোড়গুলোয় শব্দের মাত্রা ৮০ থেকে ৯০-এর মধ্যে পাওয়া যেত। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে সেটি এখন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবল পর্যন্ত চলে গেছে।’

ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আমিনবাজার, উত্তরা, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, খিলগাঁও, ধানমন্ডি, শান্তিনগর, মালিবাগ, পুরান ঢাকা এলাকায় শব্দদূষণের এ চিত্র পেয়েছে ক্যাপস।

কামরুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশন একদিকে প্রচারণায় শব্দের মাত্রা ঠিক করে দিয়েছে ৬০ ডেসিবল। অন্যদিকে আবার মাইক ব্যবহারে অনুমতি দিয়েছে। মাইক বাজলে সেটি কমপক্ষে ১০০ ডেসিবলের ওপর শব্দ তৈরি করে। এটা একধরনের স্ববিরোধিতা।

পোস্টার নিষিদ্ধের মতো নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক ব্যবহারও নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেন।

হাসপাতালেরও রেহাই নেই

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও শাহবাগের বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক বিএসএমএমইউ এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছে প্রথম আলো।

মানুষকে কষ্ট দিয়ে এসব প্রচারণার কোনো মানে হয় না।
-আবুল কালাম, বার্ন ইনস্টিটিউটের রোগীর স্বজন

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে ভ্যানে ডাব বিক্রি করেন মো. রবিউল। এ এলাকাটি ঢাকা-৮ আসনের অন্তর্ভুক্ত। এখানে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

এ মেডিক্যাল এলাকায় মাইক ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে রবিউল বলেন, কিছুক্ষণ আগে (বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১০ মিনিট) শাপলা কলির প্রচারণা চালিয়ে গেছে মাইকসহ গাড়ি। ধানের শীষের গাড়িও মাইক নিয়ে প্রচারণা চালায় এখানে।

রবিউল আরও বলেন, ‘এখানে যে রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে, এটা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা দেখি না।’ তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করে পাশের ওবায়দুল্লাহ মিয়া নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, ‘মাইকের আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনের সড়ক দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় মাইকের ব্যবহার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন রোগী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি থাকা রোগীর জন্য ওষুধ কিনতে এসেছিলেন আবুল কালাম। শীতের সময় আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়ে যাওয়া বাবাকে নিয়ে নওগাঁ থেকে এই হাসপাতালে আসেন তিনি। আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইকের গাড়ি গেলে জানালা বন্ধ করে দিই, যাতে উচ্চ শব্দে বাবা কষ্ট না পান।’

‘মানুষকে কষ্ট দিয়ে এসব প্রচারণার কোনো মানে হয় না,’ বলেন আবুল কালাম।

এক প্রার্থীর মাইক নিয়ে প্রচারে নামার অপেক্ষায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে অটোরিকশাগুলো। ছবিটি চট্টগ্রাম নগরীর, তবে এই চিত্র এখন সারা দেশের

রাত ৮টার পর মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও লাউডস্পিকার নিষিদ্ধ থাকার কথা নির্বাচন আচরণ বিধিমালায় আছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৮টার পরও ঢাকা-১২ আসনের কারওয়ান বাজারে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব নির্বাচনী ক্যাম্প থেকে সাউন্ড সিস্টেমে উচ্চ শব্দে প্রচার চালানো হচ্ছিল। উচ্চ শব্দে মাইক বাজছিল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলনের নির্বাচনী ক্যাম্পও থেকে।

জানতে চাইলে এসব বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা তাহজীব হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠপর্যায় থেকে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসলে আমরা ব্যবস্থা নিই। তবে এখন পর্যন্ত শব্দদূষণ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি।’

শব্দদূষণ-সংক্রান্ত বিধিমালা মানা হচ্ছে না কি না, সেটা পর্যবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, জানতে চাইলে তাহজীব হাসান বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই।’