আবার একটা ভয়ের ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই। আমরা নির্ভয়ে ফেসবুকে লিখতে চাই, আমরা “ব্যাক স্পেস” ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটা ভয়ের ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
আজ রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ–সম্পর্কিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এ কথা বলেন। বেলা তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আজকে আমরা সংসদে সবার কাছে অনেকের সংগ্রামের কথা শুনি, তাঁরা অনেক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আজকে সংসদে এসেছেন। আসলে আমাদের প্রজন্মের জন্য আপনারা যে কাজগুলো করছেন, যে দায়িত্বটা নিয়েছেন, এই দায়িত্বের ফলভোগী বা সুবিধাভোগী কিন্তু আমরা আমাদের এই প্রজন্ম।’
হাসনাত বলেন, ‘আমরা খুব আশাহত হই যখন এই সংসদ এত রক্ত, এত লড়াই, এত ত্যাগের পরে গঠিত হয়েছে, কিন্তু এই সংসদ আবার আগের সেই “ভিসিয়াস সাইকেলে” (দুষ্টচক্র) ফিরে যাচ্ছে। বিরোধী মত দমনের নামে মামলার যেই সাইকেল, আমরা সেখানে আবার চলে গিয়েছি। ক্যাম্পাসগুলো আবার অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে।’
বিরোধী দল ও মত দমন করা হচ্ছে অভিযোগ করে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘বিরোধী দল ও মত দমনের জন্য মামলা করা হচ্ছে। এমনকি ফেসবুকে প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে, সমালোচনা করলে তুলে আনা হচ্ছে। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে বিভিন্ন স্যাটায়ার বা মকারিকে (উপহাস) প্রমোট করছেন, সেখানে এই সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৯টি এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মতপ্রকাশের জন্য বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে।’
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চেয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আগেও ছিল, আওয়ামী লীগের সময় ছিল—তবে সেটা ছিল কেবল “সহমত” প্রকাশের স্বাধীনতা। আমরা এই পার্লামেন্টের কাছে কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বরং ‘দ্বিমত” প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই। আমরা নির্ভয়ে ফেসবুকে লিখতে চাই, আমরা “ব্যাক স্পেস” ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটা ভয়ের ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
হাসনাত বলেন, ‘আমরা দেখলাম সিলেক্টিভ একধরনের বিরোধিতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের সমাজের যারা পলিটিক্যালি এলিট শ্রেণির নারী, তাদের নিয়ে সমালোচনা করা হলে সেটাকে নারীবিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়; কিন্তু গার্মেন্টকর্মী বা গ্রামগঞ্জের মায়েরা যারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রাতদিন পরিশ্রম করছে, তাদের যখন গালি দেওয়া হয়, সেটাকে আমরা আমলে নিই না। মাননীয় স্পিকার, এ ধরনের সিলেক্টিভ জায়গাগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
ক্যাম্পাসগুলোতে আবার অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি ২০২২ সালে যখন ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছি, তখন সেখানে “গেস্টরুম” ও “গণরুম” কালচার ছিল। ক্ষমতাসীন দল শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে তাদের ক্ষমতাকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি করার জন্য বাধ্যতামূলক রাজনীতি করাত। আজকে সেখানে আবার সেই কালচার চালু করার প্রয়াস শুরু হয়েছে। আমরা দেখেছি ক্ষমতাসীনেরা তাদের সন্তানদের বিদেশে রেখে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে আর মধ্যবিত্ত বা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সন্তানদের ব্যবহার করে তাদের ক্যারিয়ার নষ্ট করে নিজেদের গদি শক্ত করে। আমরা এই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই।’
হাসনাত আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল নেতা তৈরির হাতিয়ার হবে না, এগুলো হবে গবেষণা ও পাঠচর্চার কেন্দ্র, যেখান থেকে আমরা জাতিকে বুদ্ধিজীবী ও গবেষক উপহার দিতে পারব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল নেতা উৎপাদনের সার্কেলে পরিণত হয়েছে। এই ছত্রিশে জুলাই তরুণ প্রজন্মকে কী দিয়েছে? ১৭ বছর ধরে যারা নির্যাতিত হয়েছে, তাদের আমরা কিছুই দিতে পারিনি। আমরা একটা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছিলাম।’
জুলাই ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের এই সম্মুখসারির নেতা বলেন, আজকে মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে এটাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বলা হচ্ছে পুনর্বিবেচনা করা হবে। যদি নিয়ত সঠিক থাকত (ওয়েল ইনটেনশন থাকত), তবে এই অর্ডিন্যান্স গ্রহণ করে পরেও সংশোধন করা যেত।’
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকারি ও বিরোধী দল একটি আপেক্ষিক বিষয়। আপনারা একসময় এ পাশে ছিলেন, এখন ও পাশে গিয়েছেন। আমি সবাইকে আহ্বান জানাব প্রজন্মের ভাষাকে অনুধাবন করার জন্য। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সন্তান যে প্রজন্মের, আমরাও সেই একই প্রজন্মের। কেবল বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি নয়; বরং মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। এই সংসদে এসি রুমে বসে, এসি গাড়িতে চলে বা ঢাকার ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের মধ্যে থেকে জনগণের সমস্যা বোঝা যায় না। লোডশেডিং বা বড় সমস্যাগুলো এখানে পাওয়া যাবে না।’
বিভাজনের রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা যদি আবার বিভাজনের রাজনীতিতে ফিরে যাই, তবে কোনো রাজনৈতিক দল নয়; বরং জুলাইয়ে আমরা যাদের পরাজিত করেছি, তারাই লাভবান হবে।’