
কৃষকেরা বলছেন, প্রার্থীরা ভোট চাইলেও আলুচাষিদের সমস্যার কথা শুনছেন না, সমাধানের কথা বলছেন না।
গত বছর আলু চাষ করে বড় লোকসান গুনেছেন মাসুম মিয়া। ১০ একর জমিতে আলু চাষ করে লোকসান হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। এই লোকসানের চাপ পড়েছে পরিবারে। ইতিমধ্যে তিনটি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। ভয়ে এ বছর আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। চাষ করেছেন ৩ একর ৪৮ শতাংশ জমিতে। এবারও যদি ঠিকঠাক দাম না পান, পথে বসে যাবেন এই কৃষক।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মাসুম মিয়াসহ পাঁচজন আলুচাষির সঙ্গে কথা হয় তালতলা বাজারে। বাজারটি রংপুর–সুন্দরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে। এলাকাটি রংপুর–৪ আসনের (পীরগাছা–কাউনিয়া) মধ্যে। এখানে এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন দলের সদস্যসচিব ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী আখতার হোসেন, বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক এবং জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান। এই আসনে অন্য দলের প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই তিনজনের মধ্যেই।
এখানকার কৃষকেরা বলছেন, প্রার্থীরা ভোট চাইলেও আলুচাষিদের সমস্যার কথা শুনছেন না, সমাধানের কথা বলছেন না।
ছোট কল্যাণী, স্বচাষ, বড়দরগা, কালুক পষুয়া, বড় হাজরা, নব্দিগঞ্জ গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ শুধু আলু চাষ। কেউ নিজের জমিতে আলু চাষ করেছেন, কেউ জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। এলাকার মানুষ বলছেন, ৯৫ শতাংশ মানুষই আলু চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
পীরগাছার ছোট কল্যাণী গ্রামের ছলিম উদ্দীন বললেন, ‘ওমার ভোটের দরকার। খালি ভোট চায়। আলু নিয়্যা কথা কয় না। হামার দুঃখের কথা কায় শোনে।’ ছলিম উদ্দীন গত বছর দেড় লাখ টাকা লোকসান দিয়েছেন। একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। মাঠের আলু উঠতে আরও ৩০ থেকে ৪০ দিন বাকি। আশা ও আশঙ্কায় তাঁর দিন কাটছে।
ছোট কল্যাণী, স্বচাষ, বড়দরগা, কালুক পষুয়া, বড় হাজরা, নব্দিগঞ্জ গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ শুধু আলু চাষ। কেউ নিজের জমিতে আলু চাষ করেছেন, কেউ জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। এলাকার মানুষ বলছেন, ৯৫ শতাংশ মানুষই আলু চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
রংপুর এখন আলু চাষের জন্য খ্যাতি অর্জন করতে চলেছে। পরপর গত তিন বছর ৬৪ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে রংপুর জেলায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর জেলা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় কৃষিজমি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫১৪ হেক্টর। এর মধ্যে আলু চাষ হয় ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ জমিতে। তবে এ বছর আলুর আবাদ কম হচ্ছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে। এ বছর হচ্ছে ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ ১১ হাজার ৭৮০ হেক্টর কম জমিতে এ বছর চাষ করছেন কৃষকেরা।
এলাকায় আলু সংরক্ষণের ভালো ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি যেসব হিমাগার আছে, তাতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতাপ। আলুর মান যথাযথ না হওয়ায় রপ্তানিও কম হয়। আলু দিয়ে খাদ্য তৈরির উদ্যোগেরও ঘাটতি আছে। ঋণ করে আলু চাষ করে লোকসান দিয়ে বেশ কয়েকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।মো. রাশেদুল ইসলাম, কীটনাশক ব্যবসায়ী
আলু চাষে আগ্রহ কমছে
কেন আলু চাষের জমি কমছে, তার উত্তর কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে কৃষকেরা বলেছেন, বেশি দামে আলুবীজ, সার ও কীটনাশক কিনতে হচ্ছে। সেচের খরচ আছে। আছে মজুরি। এ ছাড়া মাঠ থেকে আলু তুলে হিমাগারে পাঠাতে এবং হিমাগারে আলু রাখতে খরচ অনেক।
কৃষি কর্মকর্তারা বলেছেন, রংপুরে গত বছর এক কেজি আলু উৎপাদনে গড় খরচ পড়েছিল ১৭ টাকা ৮০ পয়সা। আর কৃষকেরা আলু বিক্রি করেন গড়ে ৮ টাকা কেজি দামে।
তবে কৃষকেরা বলছেন, ৬৫ কেজি আলুর বস্তায় হিমাগার ভাড়া দিতে হয়েছে ৩৮০ টাকা। আলুর বড় দরপতন হলে অনেকে হিমাগার থেকে আলু তুলে এনে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ছোট কল্যাণী গ্রামের মাহবুব আলমের ভাষ্য, তিনি ৪০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। বাজারে আলুর দাম কমে যাওয়ায় তিনি আর সেই আলু হিমাগার থেকে আনেননি।
বড়দরগা বাজারে কথা হয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হোসেন আলী গাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আলু এই এলাকার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। বড় বড় অবকাঠামো সব গড়ে উঠেছে আলুর কারণে। মানুষের ঘরবাড়ি পাকা হয়েছে আলুর কারণে। তারপরও মানুষ এখন আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
বড়দরগা বাজারে কীটনাশকের ব্যবসা করেন মো. রাশেদুল ইসলাম। পাশাপাশি নিজের জমিতে আলু চাষও করেন। আলু চাষ করেন তাঁর বাবা আলমগীর মিয়াও। রাশেদুল ইসলাম বলেন, এলাকায় আলু সংরক্ষণের ভালো ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি যেসব হিমাগার আছে, তাতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতাপ। আলুর মান যথাযথ না হওয়ায় রপ্তানিও কম হয়। আলু দিয়ে খাদ্য তৈরির উদ্যোগেরও ঘাটতি আছে। ঋণ করে আলু চাষ করে লোকসান দিয়ে বেশ কয়েকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।
আলু এই এলাকার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। বড় বড় অবকাঠামো সব গড়ে উঠেছে আলুর কারণে। মানুষের ঘরবাড়ি পাকা হয়েছে আলুর কারণে। তারপরও মানুষ এখন আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হোসেন আলী গাজী
কৃষকেরা মনে করেন, এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে পারে সরকার। আলমগীর মিয়া বললেন, যাঁরা নির্বাচন করছেন, কৃষকের কাছে ভোট চাইছেন, তাঁরা কৃষকের কথা বলছেন না। পাশে থাকা একজন বলেন, সরকার যদি জেলায় জেলায় বড় হিমাগার তৈরি করে, তবে কৃষক কম খরচে আলু রাখতে পারবে। অন্যজন বলেন, বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম ও মানের ওপর সরকারির নজরদারি বাড়াতে হবে।
এত সমস্যার পরও স্বচাষ গ্রামের মাঠে আলুগাছে ইউরিয়া দিতে দেখা গেল সুমন কুমার শর্মাকে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাই সুজন কুমার শর্মা। সুমন বলেন, ‘লোকসান হলেও আমাকে এই কাজই করতে হবে। কৃষকের কৃষি ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই।’