নির্বাচনে জাতীয় পার্টির যে কারণে ভরাডুবি

এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির (জাপা) পুরোপুরি ভরাডুবি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। এমনকি গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এর মধ্যে দলটির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও বিপর্যস্ত হয়েছে দলটি। এটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ জাতীয় পার্টির রাজনীতির শেষ হিসেবে দেখছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর–৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শামসুজ্জামান শামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। অন্যদিকে জি এম কাদের পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট।

জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা–১ আসনে নির্বাচন করে দলের চেয়ারম্যানের চেয়ে কম, ৩৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন। এই আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাজেদুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯৯৭ ভোট।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জাপার হয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে জাপা তাদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত হলেও দলটির ভোটাররা এবার জাতীয় পার্টিকে ভোট দেননি। অথচ দলটি আওয়ামী লীগের ভোট প্রত্যাশা করেছে। এর বাইরে জাতীয় পার্টি গত দুই দশক নেতানির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। দলটির কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা দিন দিন কমে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। এর ফল এবারের নির্বাচনে হাতেনাতে পেয়েছে দলটি।

অবশ্য সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও জাপা মাত্র ১১টি আসন পেয়েছিল, যা দলটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

আওয়ামী লীগের মিত্রের পতন

আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোট ও মিত্র অধিকাংশ দল ছিল ভোটের বাইরে। একমাত্র জাতীয় পার্টিই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দিয়ে ভোটে ছিল। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো হেভিওয়েট নেতারা ভোটের আগে আলাদা দল ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁরা প্রতীক জটিলতায় ভোট করতে পারেননি।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়। দলটির প্রাপ্ত ভোট ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘রাতের ভোট’ বলে পরিচিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আসন পায় ২২টি। তাদের ভোটের হার কমে দাঁড়ায় ৫ শতাংশের কিছু বেশি। এবারও দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জায়গা করে নেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি। তাদের প্রাপ্ত ভোট ৩ শতাংশের মতো ছিল।নির্বাচনে জাতীয় পার্টির যে কারণে ভরাডুবি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, জাতীয় পার্টি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলেছে। এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে। ২০০৬ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গী হয় জাতীয় পার্টি। পরে ২০০৮ সালের ভোটে সমঝোতা করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভোট করে এবং সরকারের অংশ হয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দফা ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো জাপাকে নিষিদ্ধ করতে সরকারকে চাপ দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কিছু দল।

জাতীয় পার্টির অতীত নির্বাচনী ফলাফল

সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে টানা ৯ বছর দেশ শাসন করেন এইচ এম এরশাদ। গণ–আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল। দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ জেলে থেকে রংপুরে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। দলটির প্রার্থীরা ভোট পেয়েছিলেন ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসনসংখ্যা ছিল ৩২। ভোট পেয়েছিল ১৬ শতাংশ। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনেও এরশাদ পাঁচটি আসনে জয়ী হন।

২০০১ সালে জাতীয় পার্টি আসন পায় ১৪টি। ভোটের সংখ্যা ৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হিসেবে ভোট করে দলটি। তারা আসন পায় ২৮টি এবং ভোট পায় ৭ শতাংশ। সেবার এক প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি আসনে ভোট করার নিয়ম চালু হয় এবং এরশাদ ঢাকা ও রংপুরে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়। দলটির প্রাপ্ত ভোট ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘রাতের ভোট’ বলে পরিচিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আসন পায় ২২টি। তাদের ভোটের হার কমে দাঁড়ায় ৫ শতাংশের কিছু বেশি। এবারও দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জায়গা করে নেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি। তাদের প্রাপ্ত ভোট ৩ শতাংশের মতো ছিল।

জাতীয় পার্টির ভাঙা–গড়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়ে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে ‘হেভিওয়েট’ নেতাদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় নতুন জাতীয় পার্টি। এরশাদ জীবিত থাকতেই জাতীয় পার্টি কয়েকবার ভেঙেছে। তবে প্রতিবারই এরশাদের নেতৃত্বে থাকা অংশ মূল জাতীয় পার্টি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল।

২০০১ সালে জাতীয় পার্টি আসন পায় ১৪টি। ভোটের সংখ্যা ৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হিসেবে ভোট করে দলটি। তারা আসন পায় ২৮টি এবং ভোট পায় ৭ শতাংশ। সেবার এক প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি আসনে ভোট করার নিয়ম চালু হয় এবং এরশাদ ঢাকা ও রংপুরে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ২০১৯ সালে মারা যান। এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায়ই জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে বিরোধ ছিল। ছোট ভাই জি এম কাদের ও স্ত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দল চালিয়েছেন এরশাদ। কিন্তু এরশাদের মৃত্যুর পর তা আর নেই। রওশন এরশাদ অসুস্থ হলেও তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির আরেকটি ধারা রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জি এম কাদেরকেই মূল নেতা হিসেবে কাছে টেনেছিল আওয়ামী লীগ। ফলে রওশন অনেকটাই আড়ালে চলে যান।

এখন জি এম কাদেরের দলের মহাসচিব হয়েছেন অপেক্ষাকৃত তরুণ শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এর বাইরে দলে সেভাবে পরিচিত নেতা নেই। দলের সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ১৪ ডিসেম্বর ক্ষমা চেয়ে আবার জাতীয় পার্টিতে ফেরেন তিনি। একই সঙ্গে রংপুর–৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ মণ্ডল আবার দলে ফিরেছেন। এর মাধ্যমে ভঙ্গুর দলকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

এর আগে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ভাগ হয়। এর নাম হয় জাতীয় পার্টি (জেপি)। এরশাদের একসময়ের মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে আরেক নতুন পার্টি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) হয়। এই দলটির প্রধান আন্দালিভ রহমান পার্থ বিএনপি জোটের হয়ে এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয় এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ছিল। লাঙ্গল প্রতীক ও এরশাদের প্রতি দুর্বলতা বিবেচনায় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে জি এম কাদেরের জাপা কিছুটা অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, এমনটাই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু জাপা পর্যুদস্ত হয়ে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে।