
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ২০টির বিষয়ে এখনো একমত হতে পারেনি জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। আজ বুধবার কমিটির বৈঠক শেষে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, এই ২০টি বিষয়ের মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা মানার প্রশ্নই আসে না। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাবেও আপত্তি আছে বিরোধী দলের।
তবে বিশেষ কমিটির সভাপতি সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেছেন, তাঁরা গণভোট অধ্যাদেশ রহিত করার প্রস্তাব করেননি, রাখার প্রস্তাবও করেননি। তাঁরা বলেছেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যেহেতু বিরোধী দল উত্থাপন করেছে, সংবিধানের আলোকে এগুলো আলোচনা করতে হবে। কারণ, সংবিধান সবার ঊর্ধ্বে, সংসদ সংবিধান মোতাবেক চলবে।
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির মুলতবি বৈঠকে এগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত হয়নি। ২০টি বিষয় নিয়ে ২৯ মার্চ আবার আলোচনা হবে। যেসব বিষয়ে কমিটিতে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো বিল আকারে সংসদে তোলা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এগুলো যাচাই–বাছাই করছে সংসদের বিশেষ কমিটি। আজ ছিল কমিটির দ্বিতীয় দিনের মুলতবি বৈঠক। এখন পর্যন্ত ১১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটি একমত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু হুবহু রাখা হবে, কিছু সংশোধিত আকারে রাখা হবে আর কিছু বাদ যাবে। তবে কতটি রাখা হবে আর কতটি বাদ যাবে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
বৈঠক শেষে জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে মোট ২০টির বিষয়ে ব্যাখ্যা দরকার। এ জন্য ২৯ মার্চ রাত সাড়ে আটটায় আবার বৈঠক হবে। কোন অধ্যাদেশগুলো বাতিল হবে, কোনগুলো গ্রহণ করা হবে সবকিছু নির্ভর করে সংসদের ওপর—এমন মন্তব্য করে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে আমরা এটা উপস্থাপন করব। অন্যথায় এটা বিল আকারে আনার জন্য আইন রয়েছে, সেই আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেব।’
গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যেগুলো মানুষের জন্য কল্যাণকর, সেগুলোতে তাঁরা একমত হয়েছেন। ১৮-২০টি বিষয়ে তাঁরা একমত হননি। তিনি বলেন, ‘গণভোট বিল আনছেন ওনারা এটা রহিতকরণের জন্য। আমরা এতে একমত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ তিনি বলেন, গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই চেতনাই থাকে না। এ বিষয়ে তাঁরা তীব্র বিরোধিতা করেছেন, এটা নিয়ে পরে আলোচনা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি দল বলছে, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করতে হবে। কারণ, এটা এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। বিরোধী দল সুস্পষ্ট করে বলেছে, এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে কি না, এটা আদালত বলবেন। অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করলে জনগণ মেনে নেবে না।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, গণভোটে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের রায় ঘোষণা করেছে। যারা জনগণের ভোটকে অস্বীকার করবে, তারা জনকল্যাণকামী সরকার হবে না, তারা হবে গণবিরোধী সরকার। গণভোটের রায় অবশ্যই মানতে হবে, বাস্তবায়ন করতে হবে।
আরও যেসব বিষয়ে আপত্তি
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিষয়েও বিরোধী দল একমত হয়নি উল্লেখ করে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান একটা পদ্ধতিতে নিয়োগ হয়ে আসছে। দুদক অধ্যাদেশের অনেক বিষয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন যে সংশোধনী প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেখানে অনুসন্ধান কমিটি থাকবে না। সরকার যাকে ইচ্ছা নিয়োগ দেবে। এ বিষয়ে তাঁরা দ্বিমত পোষণ করেছেন। পুলিশ কমিশনের ক্ষেত্রে আইজিপি নিয়োগে একটি পদ্ধতির কথা বলা আছে। কিন্তু এটা বাদ দিয়ে যেভাবে সংশোধনী আনতে চাইছে, তাতে সরকার যাকে ইচ্ছা তাকেই নিয়োগ করতে পারবে। এ জন্য তাঁরা এটারও বিরোধিতা করেছেন।
কমিটির সভাপতি যা বললেন
বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, গণভোটের বিষয়ে বৈঠকে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। আগামী বৈঠকে বা সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, গণভোটের বিষয়ে তাঁদের অবস্থান হলো এটা সংসদের বিষয়। এ বিষয়ে বিশেষ কমিটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে তা সংসদে পাঠানো হবে।
কমিটির সভাপতি জানান, দুদক, পুলিশ কমিশন, বিচারক নিয়োগ ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিষয়ে পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বা বিএনপি কোনো সংশোধনের প্রস্তাব আনেনি। সংশোধন করতে হলে এটা বিল আকারে আসতে হবে। এটা ইচ্ছা করলেই তাঁরা সংশোধন করতে পারেন না।
তিন ভাগে উপস্থাপন
গতকালের বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে তিনটি ভাগ আছে। একটা ভাগ হচ্ছে অধ্যাদেশগুলো যেভাবে উত্থাপিত বা প্রণীত হয়েছিল, সেভাবে পাস করা। পাস করতে গেলে নিয়ম হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সে বিলগুলো আবার আনবে এবং সেভাবে পাস করবে। আর কিছু কিছু বিষয়ে কিছু সংশোধনীসহ বিল থাকতে হবে, সেগুলো সংশোধনীসহ পাস হবে। আর কিছু কিছু বিষয়ে একমত না হলে সেগুলো এই সেশনে ল্যাপস (বাদ) হয়ে যাবে। পরে যদি প্রয়োজন হয়, সেটা বিল আকারে পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করা যাবে।
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, প্রায় সব অধ্যাদেশ নিয়েই কাজ করা হয়েছে। কয়েকটা আছে, যেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। ২৯ মার্চ সব কটি অধ্যাদেশের ওপর পর্যালোচনা শেষ হবে এবং কমিটি প্রতিবেদন দেবে।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংসদ সদস্য ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, নওশাদ জমির, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম।