শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বেসরকারিভাবে বেশির ভাগ আসনের ফলাফলও প্রকাশিত হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে প্রচারের আগে–পরে মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মাঠপর্যায়ের সমাবেশ—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন বেশ কয়েকজন প্রার্থী। কারও বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। কারও কর্মকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
প্রাথমিক ফল বিশ্লেষণ বলছে, আলোচনায় থাকা প্রার্থীদের বেশির ভাগই সুবিধা করতে পারেননি। আলোচনায় তুঙ্গে থেকেও হেরেছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ জিতেছেনও।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা এবারের নির্বাচনে অন্যতম আলোচিত নারী প্রার্থী ছিলেন। বিএনপির সাবেক এই নেত্রী আগে থেকেই পরিচিত মুখ। তবে বিএনপি থেকে এই নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া এবং স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুনভাবে আলোচনায় আসেন তিনি।
রুমিন ফারহানার নিজ আসনে নির্বাচনী প্রচারের সময় সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় বেশ কিছুদিন আগে। এ নিয়ে সমালোচনার শিকারও হন তিনি। তবে সব আলোচনা–সমালোচনা ছাপিয়ে ব্যালটে এগিয়ে গেছেন তিনি।
বেসরকারি ফল অনুযায়ী, বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন রুমিন ফারহানা। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়েছেন। ১৫১টি কেন্দ্রে তাঁর মোট প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫।
সব কেন্দ্রে জয় পেয়েছেন কুমিল্লা–৪ (দেবীদ্বার) আসনের ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির এই নেতা বড় জয় পেয়েছেন। বেসরকারি ফল অনুযায়ী, ওই আসনের ১১৬টি ভোটকেন্দ্রের সব কটিতে জয় পেয়েছেন তিনি। ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণ–অধিকার পরিষদের প্রার্থী জসীমউদ্দীন পেয়েছেন ২৬ হাজার ভোট।
পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বার্তা আর সাবলীল প্রচার, এই নির্বাচনে আলোচনায় এনেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারাকে। তবে এর আগে থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট (আধেয়) তৈরি করে জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে তৃতীয় হয়েছেন পেশায় চিকিৎসক তাসনিম জারা। তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর যোগ দেন এনসিপিতে। ঢাকা–৯ আসন থেকে দলটির মনোনয়নও পান। তবে এনসিপির জামায়াত জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর দল থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর তাসনিম জারা নতুনভাবে আলোচনায় আসেন দুই দিনে পাঁচ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। নির্বাচনে প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে তাঁর আসনের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন দেখাতে এই স্বাক্ষর রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে হয়।
তবে আলোচনা যতটা ছিল, ব্যালটে ততটা সুবিধা করতে পারেননি তাসনিম জারা। বেসরকারি ফলাফলে ওই আসনে তৃতীয় হয়েছেন তিনি। ফুটবল প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪টি।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী, কিন্তু তিনি সনাতন ধর্মের অনুসারী—এ পরিচয়ই এবারের নির্বাচন আলোচিত করেছে খুলনা–১ আসনের কৃষ্ণ নন্দীকে। জামায়াতের হিন্দু শাখার সাবেক এই সভাপতি ভোটের মাঠে নানা বক্তব্যে ছিলেন আলোচনায়। তবে ব্যালটে সুবিধা করে উঠতে পারেননি। খুলনার ৬টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হেরেছেন তিনি।
কৃষ্ণ নন্দী ভোট পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩৪৬। এই আসনের জয়ী প্রার্থী বিএনপির আমির এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট। কৃষ্ণ নন্দীর সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান ৫১ হাজার ৬।
এবারের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ঢাকা–৮ আসন থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক পাটোয়ারী নির্বাচনে অংশ নেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিয়ে মন্তব্য এবং নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে আলোচনায় ছিলেন তিনি। কারও মন জয় করেছেন আবার কেউ বেজার হয়েছেন।
তবে সব মিলিয়ে ব্যালটেও চমক দেখিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জয়ী না হলেও একেবারে পিছিয়ে নেই তিনি। বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান পাঁচ হাজারের কিছু বেশি।
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার কার্যলয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১০৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৮টিতে সরাসরি ভোট গ্রহণ হয়। এতে বিএনপির মির্জা আব্বাস ভোট পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৫৫২টি। আর সঙ্গে তিনি ২ হাজার ৮১৪টি পোস্টাল ভোট পেয়েছেন। তাতে মোট ভোট হয় ৫৯ হাজার ৩৬৬।
অন্যদিকে ঢাকা-৮ আসনে পাটোয়ারী ১০৮টি কেন্দ্রে পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট। এর সঙ্গে তিনি পোস্টাল ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৫৫৫টি। তাতে তাঁর পক্ষে মোট ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার ১২৭টি।
নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের আরেক প্রার্থী এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদও। নোয়াখালী–৬ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির এই নেতা নানা কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় ছিলেন।
বেসরকারি ফল অনুযায়ী, আবদুল হান্নান মাসউদ পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহবুবের রহমান শামীম পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট।
বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তীও এই নির্বাচনে আলোচিত ছিলেন। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। মূলত ২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বাসদের প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ওই নির্বাচনে মাটির ব্যাংকের টাকায় নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তিনি আলোচনায় আসেন। তাঁর নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি মানুষের নজর কেড়েছিল। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় মেটানোর জন্য শ্রমজীবীদের কাছ থেকে মাটির ব্যাংকে টাকা সংগ্রহ করেন তিনি।
বরিশালের এই আসনে একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মনীষা। তবে ব্যালটে সেভাবে সুবিধা করতে পারেননি তিনিও। বেসরকারি ফল অনুযায়ী ২১ হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন তিনি।
এই নির্বাচনে অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন ঢাকা–১৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম খালিদুজ্জামান। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তিনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও তিনি নিজের এমন পরিচয় দিয়ে আলোচনায় ছিলেন। এর আগে একাধিকবার নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জানিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।
তবে নির্বাচনে সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, এস এম খালিদুজ্জামান পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩০০ ভোট। অন্যদিকে বিজয়ী প্রার্থী তারেক রহমান ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়েছেন।