প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ফজলে এলাহী আকবর

সেনাপ্রধান ক্ষমতা–রক্তপাত চাননি, চেয়েছিলেন রাজনৈতিক সমাধান

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের নির্ধারক মুহূর্ত, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোভাব, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মাহমুদুল হাসান

প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে নির্ধারক মুহূর্ত কোনটি ছিল বলে মনে করেন?

ফজলে এলাহী আকবর: আমার মতে, নির্ধারক মুহূর্তটি ছিল যখন সরকার জনগণকে প্রতিহত করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে আমি দেখেছি, স্বৈরাচারী সরকার সাধারণত প্রথমে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে; কিন্তু জনগণকে দমন করতে যখন সেনাবাহিনী নামাতে হয়, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই সেনাবাহিনী দিয়ে গণ-আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়েছে।

আমি বিএনপির নেতাদেরও বহুবার বলেছি, যত বড় আন্দোলনই করুন না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘উত্তরপাড়া’ অর্থাৎ সেনানিবাস জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ না করবে, ততক্ষণ বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর আগে ঢাকায় বিএনপি অনেক বড় সমাবেশ ও আন্দোলন করেছে। কিন্তু দিন শেষে পরিস্থিতি আগের জায়গাতেই ফিরে গেছে।

জুলাই আন্দোলনে সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর ভিন্ন চিত্র দেখা গেল। জনগণ সেনাসদস্যদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নেয়নি। তারা সেনাসদস্যদের কাছে গেছে, হাত মিলিয়েছে, সাঁজোয়া যানের ওপর উঠে কথা বলেছে। এই আচরণ সৈনিকদেরও প্রভাবিত করেছে। তাঁরা তো এই সমাজেরই মানুষ। তাঁদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সন্তানেরাও একই পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর এই সরকারের টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে গেছে।

আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও ছিল। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশসহ কিছু বাহিনীকে বিশেষ গুরুত্ব ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী দেখেছে, সেই বাহিনীগুলোকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলে তাদের ভেতর থেকে একটি বাধা তৈরি হয়। নিজের দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো একজন সৈনিকের জন্য সহজ নয়।

বাহিনীর ভেতর থেকে এমন বার্তা এসেছিল যে জনগণের ওপর নির্বিচার গুলি চালানোর নির্দেশ গ্রহণযোগ্য হবে না। সেনাপ্রধানের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ওই উপলব্ধি বড় ভূমিকা রেখেছিল।
‘চলমান পরিস্থিতিতে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার, জেসিও ও অন্য সব পদবির আহ্বান’ ব্যানারে মিরপুর ডিওএইচএসে গণমিছিল। ঢাকা, ২ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে দরবার ডাকেন। ওই দরবারটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: আমার মনে হয়, সেটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। সেনাপ্রধান হয়তো আগে থেকেই বাহিনীর মনোভাব কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন; কিন্তু কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পর অধীনস্থ কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মানসিক অবস্থান কী, তাঁরা জনগণের বিরুদ্ধে কত দূর যেতে প্রস্তুত—এ বিষয়ে সেনাপ্রধানের সামনে পরিষ্কার একটি চিত্র আসে।

একজন কমান্ডার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁকে বুঝতে হয়, তাঁর নির্দেশ অধস্তন সৈনিকেরা পালন করবেন কি না। ৩ আগস্টের বৈঠকে সেই প্রশ্নের একটি পরিষ্কার উত্তর পাওয়া গিয়েছিল বলে আমার ধারণা। বাহিনীর ভেতর থেকে এমন বার্তা এসেছিল যে জনগণের ওপর নির্বিচার গুলি চালানোর নির্দেশ গ্রহণযোগ্য হবে না। সেনাপ্রধানের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ওই উপলব্ধি বড় ভূমিকা রেখেছিল।

প্রশ্ন

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সেনাপ্রধান প্রথম কখন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেন?

ফজলে এলাহী আকবর: জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে আমার আগে কখনো একই কর্মস্থলে চাকরি করা হয়নি। তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় বা ব্যক্তিগত বৈঠকও ছিল না। তাঁর শ্বশুর জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান যখন সেনাপ্রধান ছিলেন, তখন আমি সামরিক অপারেশন পরিদপ্তরে দায়িত্বে ছিলাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তখন অনেক কাজ করেছি; কিন্তু ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ ছিল না।

৪ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি আমাকে ফোন করেন। ফোন পেয়ে আমি কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলাম। আমার সন্তানেরা বিদেশে থাকে। তখনকার পরিস্থিতিতে পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন ছিল। আমি নিজেও ভাবছিলাম, এত রাতে সেনাপ্রধান কেন আমাকে ডাকছেন।

ফোনে তিনি খুব সংক্ষেপে বললেন, ‘আগামীকাল সকাল ১০টায় একটু আসবেন। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।’ এর বেশি কিছু বলেননি। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল। সেনাপ্রধান ডেকেছেন, যা-ই হোক, আমাকে যেতে হবে। ওই রাতে কিংবা পরদিন সকালে আমি দলের কাউকে বিষয়টি জানাইনি। কারণ, তিনি আমাকে কেন ডাকছেন বা কী দায়িত্ব দেবেন, সেটাই তখন জানতাম না। আগে থেকে কাউকে কিছু বলে পরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে চাইনি।

সেনাপ্রধান তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেন। প্রথমত, তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না। দ্বিতীয়ত, তিনি নিজে ক্ষমতা নিতে চান না। তৃতীয়ত, চলমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান চান।
জাতির উদ্দেশে সেনাপ্রধানের ভাষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট
প্রশ্ন

পরদিন (৫ আগস্ট) সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে কী কথা হয়েছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: সকাল ঠিক ১০টায় আমি তাঁর বাসভবনে যাই। দেখা হওয়ার পর প্রথমেই তাঁকে প্রশ্ন করি, এত লোক থাকতে আমাকে কেন ডেকেছেন? তিনি বললেন, তিনি জানেন একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। বিএনপির নেতাদের পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাও আমাকে চেনেন এবং আমার সম্পর্কে তাঁদের একটি গ্রহণযোগ্য ধারণা আছে। এ কারণে তিনি আমাকে একটি দায়িত্ব দিতে চান।

সেনাপ্রধান তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেন। প্রথমত, তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না। দ্বিতীয়ত, তিনি নিজে ক্ষমতা নিতে চান না। তৃতীয়ত, চলমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান চান। তিনি বলেন, দেশের প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করতে চান। তাঁরা যেখানে বসতে চান, প্রয়োজনে তিনি সেখানেও গিয়ে কথা বলতে প্রস্তুত।

সেনাপ্রধান আমাকে প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে এবং তাঁদের আলোচনার জন্য প্রস্তুত করতে বললেন। তাঁর কথার মধ্যে সামরিক শাসন বা নিজে ক্ষমতা গ্রহণের কোনো ইঙ্গিত ছিল না; বরং তিনি বারবার একটি রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলছিলেন।

সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে আমার মনে হয়েছিল, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে যাচ্ছে। পরে রাওয়া (রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) ক্লাবে গিয়ে আমি বলেছিলাম, ইনশা আল্লাহ, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে।
প্রশ্ন

সেই বৈঠক থেকে কি বুঝতে পেরেছিলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন আসন্ন?

ফজলে এলাহী আকবর: সরাসরি আমাকে বলা হয়নি যে সরকার সেদিনই চলে যাবে। তবে কয়েকটি বিষয় মিলিয়ে আমার মনে হয়েছিল, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

৩ আগস্টের সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকের ঘটনা তখন আমাদের জানা ছিল। এর সঙ্গে চলমান আন্দোলন, বাহিনীর মনোভাব এবং সেনাপ্রধানের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার উদ্যোগ মিলিয়ে পরিস্থিতি পরিষ্কার হচ্ছিল।

সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে আমার মনে হয়েছিল, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে যাচ্ছে। পরে রাওয়া (রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) ক্লাবে গিয়ে আমি বলেছিলাম, ইনশা আল্লাহ, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে।

বেলা সোয়া একটা বা দেড়টার দিকে গাড়ির কাছে ফিরে দেখি, ফোনে অনেকগুলো কল এসেছে। সেনা সদর থেকে জানতে চাওয়া হয়, আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, রাজনৈতিক নেতারা প্রস্তুত আছেন কি না। প্রস্তুত থাকলে তাঁদের দ্রুত সেনাপ্রধানের দপ্তরে আসতে বলতে বলা হয়।
প্রশ্ন

সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে প্রথম কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়?

ফজলে এলাহী আকবর: সেখান থেকে বেরিয়ে আমি প্রথমে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে যাই। এরপর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে (বিএনপির মহাসচিব) ফোন করে সেনাপ্রধানের বার্তাটি জানাই। তিনি বললেন, এটি অত্যন্ত স্বাগত জানানোর মতো একটি উদ্যোগ। আমি তাঁকে বললাম, ‘সেনাপ্রধান আমাকে আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন; কিন্তু সবার ফোন নম্বর আমার কাছে নেই। আপনি এই দায়িত্বটা নিলে ভালো হয়।’

ফখরুল সাহেব বললেন, ‘না, দায়িত্বটি আপনাকে দেওয়া হয়েছে। আপনাকেই করতে হবে। আমি করলে বিষয়টি অন্য রকম মনে হতে পারে।’ এরপর তিনি আমাকে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার ফোন নম্বর দেন।

আমি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, জোনায়েদ সাকিসহ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওই পরিস্থিতিতে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা খুব কঠিন ছিল। অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন, কেউ ফোন বন্ধ রেখেছিলেন। বিশেষ করে জামায়াতের আমির ও মান্না সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বেশ সময় লেগেছিল। পরে আমি তাঁদের কাছে সেনাপ্রধানের বার্তা পৌঁছে দিই।

প্রশ্ন

তখন কি রাজনৈতিক নেতাদের সরাসরি সেনা সদরে যেতে বলেছিলেন?

ফজলে এলাহী আকবর: প্রথম দফায় তাঁদের শুধু জানিয়েছিলাম, সেনাপ্রধান রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চান। তখনো তাঁদের সেনা সদরে যেতে বলা হয়নি।

এরপর আমি রাওয়া ক্লাবে যাই। নিরাপত্তার কথা ভেবে ফোনটি গাড়িতে রেখে গিয়েছিলাম। কারণ, ফোন সঙ্গে থাকলে অবস্থান শনাক্ত করা হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। রাওয়া ক্লাবের সামনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমাবেশ ও মিছিল হচ্ছিল। আমিও সেখানে যোগ দিই। আমরা সরকার পতনের দাবিতে স্লোগান দিয়েছিলাম।

বেলা সোয়া একটা বা দেড়টার দিকে গাড়ির কাছে ফিরে দেখি, ফোনে অনেকগুলো কল এসেছে। সেনা সদর থেকে জানতে চাওয়া হয়, আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, রাজনৈতিক নেতারা প্রস্তুত আছেন কি না। প্রস্তুত থাকলে তাঁদের দ্রুত সেনাপ্রধানের দপ্তরে আসতে বলতে বলা হয়।

এরপর আমি আবার সবাইকে ফোন করে বলি, আপনারা দ্রুত সেনা সদরের দিকে রওনা হন। পথে কোথাও বাধা পেলে অবস্থান জানাবেন। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সেখান থেকে আপনাদের নিয়ে আসবে।

সেনাপ্রধান রাজনৈতিক সমাধান চান এবং নেতাদের সঙ্গে বসতে চান—এই বার্তা স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছিল। কারও মধ্যে অনাগ্রহ দেখিনি। সবাই দ্রুত আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হয়েছিলেন।
প্রশ্ন

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: আমাকে প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। আমার দায়িত্বের একটি নির্দিষ্ট সীমা ছিল। সেটি অতিক্রম করে নিজের সিদ্ধান্তে কাউকে ডাকতে চাইনি।

সেনাপ্রধান বিশেষভাবে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মতো প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তখন জনপরিসরে যাঁরা পরিচিত রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, মূলত তাঁদের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়েছিল।

প্রশ্ন

সেনাপ্রধানের বার্তা পাওয়ার পর রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: সবাই ইতিবাচকভাবে নিয়েছিলেন। জুলাই আন্দোলন তখন এক দিন বা দুই দিনের ঘটনা ছিল না। অনেক দিন ধরে রক্তপাত, সংঘর্ষ ও অস্থিরতা চলছিল। সবাই এর অবসানের পথ খুঁজছিলেন।

সেনাপ্রধান রাজনৈতিক সমাধান চান এবং নেতাদের সঙ্গে বসতে চান—এই বার্তা স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছিল। কারও মধ্যে অনাগ্রহ দেখিনি। সবাই দ্রুত আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হয়েছিলেন।

একপর্যায়ে সেনাপ্রধান আমাদের বলেন, তিনি এইমাত্র খবর পেয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর তিনি অন্তর্বর্তী একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চান। দেশ তো চালাতে হবে—সেটিই তখন প্রধান বিষয়।
দেশ ছেড়ে পালানোর আগে হেলিকপ্টার থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নামছেন শেখ হাসিনা। সঙ্গে তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা
প্রশ্ন

আপনি কখন সেনা সদরে পৌঁছালেন? সেখানে কী দেখেছিলেন?

ফজলে এলাহী আকবর: রাজনৈতিক নেতাদের দ্বিতীয় দফায় ফোন করার পর আমি বাসায় যাই। দ্রুত জোহরের নামাজ পড়ে নিজেই গাড়ি চালিয়ে সেনা সদরে যাই। আমার স্মৃতি অনুযায়ী, তখন বেলা দেড়টা থেকে পৌনে দুইটার মধ্যে হবে।

সেখানে গিয়ে দেখি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আগেই এসে বসেছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, জোনায়েদ সাকি, মাওলানা মামুনুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ইসলামী দলের নেতারা আসেন। আরও কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিও ছিলেন।

পরে আসিফ নজরুল (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) সেখানে আসেন। তিনি সেনাপ্রধানের দপ্তরের ভেতর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সরাসরি বার্তা দেন। তিনি দেশবাসীকে ধৈর্য ধরতে এবং ভালো খবরের জন্য অপেক্ষা করতে বলেন।

একপর্যায়ে সেনাপ্রধান আমাদের বলেন, তিনি এইমাত্র খবর পেয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর তিনি অন্তর্বর্তী একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চান। দেশ তো চালাতে হবে—সেটিই তখন প্রধান বিষয়।

এ কথা বলার পর সেনাপ্রধান এবং নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান বাইরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর
প্রশ্ন

শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন—এই খবর শোনার পর ভেতরের পরিবেশ কেমন ছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমার মনে হয়েছিল, ঘরের সব কার্বন ডাই-অক্সাইড চলে গিয়ে অফুরন্ত অক্সিজেন এসেছে। সবার মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ছিল।

মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বড় একটি চাপ সরে গেছে। সবাই উৎফুল্ল ছিলেন। তবে একই সঙ্গে সামনে দেশ পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বড় দায়িত্বও ছিল।

প্রশ্ন

সেনা সদর থেকে বঙ্গভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো?

ফজলে এলাহী আকবর: জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে ফিরে এসে সেনাপ্রধান বললেন, এখন তাঁকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে সম্মতি নিতে হবে। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের তাঁর সঙ্গে বঙ্গভবনে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

প্রথমে কয়েকজন যেতে চাইছিলেন না। তাঁদের বক্তব্য ছিল—রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলা সেনাপ্রধানের দায়িত্ব; তিনি গিয়ে সেটি সম্পন্ন করুন। তখন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আমি বললাম, সেনাপ্রধান যদি একা গিয়ে কোনো প্রস্তাব নিয়ে ফিরে আসেন, সেটি রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। রাজনৈতিক নেতারা সঙ্গে গেলে রাষ্ট্রপতির সামনে সরাসরি আলোচনা হবে এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

এরপর সবাই যেতে সম্মত হন। রাজনৈতিক নেতাদের জন্য দুটি কোস্টার আনা হয়। সামনে তিন বাহিনীর প্রধান নিজেদের গাড়িতে ছিলেন। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা ও তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালকও ছিলেন। নিরাপত্তার জন্য সাঁজোয়া যান সঙ্গে ছিল।

আমার স্মৃতি অনুযায়ী, বিকেলে আমরা সেনা সদর থেকে রওনা হই। বঙ্গভবনে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাতটার কাছাকাছি হয়ে যায়।

ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে পরিস্থিতি শান্ত ছিল। জাহাঙ্গীর গেট পার হওয়ার পর মানুষের উল্লাস চোখে পড়ে। রাস্তায় এত মানুষ ছিল যে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েকটি ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নেতারা জনতাকে শান্ত থাকার অনুরোধ করেন।

মানুষের আনন্দ দেখে কয়েকবার আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। বিজয় সরণির ভাস্কর্যে (শেখ মুজিবুর রহমানের) তখন দড়ি বাঁধা হয়েছে। গণভবন থেকে বের হওয়া মানুষের হাতে বিভিন্ন জিনিস দেখেছি। এক তরুণের হাতে দুটি মুরগি ছিল। সে মির্জা ফখরুল সাহেবকে বলছিল, এগুলো গণভবন থেকে এনেছে। ফখরুল সাহেবকে নিতে অনুরোধ করল। পুরো দৃশ্যটি ছিল একই সঙ্গে আনন্দ, আবেগ ও কিছুটা বিশৃঙ্খলায় পূর্ণ।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বস্তরের মানুষ গণভবন অভিমুখে যাত্রা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে
প্রশ্ন

বঙ্গভবনের বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: বঙ্গভবনে পৌঁছানোর পর প্রথমে সবাই নামাজ পড়েন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাষ্ট্রপতি বৈঠকে আসেন। সেখানে রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, ডিজিএফআই মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন।

প্রথম দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য দেন। তিনি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গঠনের বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে বলেন, সবার আগে বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।

রাষ্ট্রপতি (মো. সাহাবুদ্দিন) প্রথমে বললেন, দু-এক দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে; সেই সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তখন সেনাপ্রধান বললেন, ‘স্যার, এই মুহূর্তে পূর্ণ কর্তৃত্ব আপনার (রাষ্ট্রপতি)। আপনি এখনই তাঁকে মুক্তি দিতে পারেন।’

আমার মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি মুক্তির বিরোধিতা করছিলেন না। তিনি সম্ভবত নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দায়িত্বটি পরবর্তী সরকারের ওপর দিতে চাইছিলেন। সেনাপ্রধান বিষয়টি স্পষ্ট করার পর খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্ত এগোয়।

বৈঠকের সময় ডিজিএফআই মহাপরিচালক (মেজর জেনারেল হামিদুল হক) ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দিচ্ছিলেন। কোন থানায় হামলা হচ্ছে, কোথায় মানুষ মারা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথায় কতটা খারাপ—এসব বিষয়ে তিনি উপস্থিত সবাইকে অবহিত করছিলেন।

রাষ্ট্রপতি কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, আয়নাঘর নামে সত্যিই কিছু আছে কি না? আমি বললাম, এমন স্থান বাস্তবে আছে কি না, আপনি যেমন জানেন না, আমিও নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে ডিজিএফআই প্রধান এখানে উপস্থিত আছেন। তিনিই বলুন।
প্রশ্ন

আপনি বঙ্গভবনের বৈঠকে কী কী প্রস্তাব দিয়েছিলেন?

ফজলে এলাহী আকবর: আমি তিনটি বিষয় তুলেছিলাম। প্রথমটি ছিল পুলিশকে নিয়ে। আমি বলেছিলাম, সেনাবাহিনী সাময়িকভাবে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে পুলিশের বিকল্প সেনাবাহিনী নয়। অথচ পুলিশের প্রতি জনগণের তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই ক্ষোভ প্রশমিত না হলে পুলিশকে আবার দায়িত্বে ফেরানো কঠিন হবে।

আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা অতিমাত্রায় অন্যায় ও দমন-পীড়নে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করে বিষয়টি দৃশ্যমান করা হোক। তাহলে জনগণ বুঝবে, অন্যায়ের বিচার শুরু হয়েছে; পুলিশের প্রতিও আস্থা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাব ছিল আকাশপথ বন্ধ করা। তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন—এমন খবর আসছিল। আমি বলেছিলাম, সাময়িকভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া দরকার, যাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পালিয়ে যেতে না পারেন।

তৃতীয় বিষয়টি ছিল ‘আয়নাঘর’ ও গোপন বন্দিশালার বন্দীদের মুক্ত করা।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিজয়ের উল্লাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছিল জনতার নিয়ন্ত্রণে
প্রশ্ন

গোপন বন্দিশালা বা আয়নাঘর থেকে বন্দীদের মুক্ত করার প্রসঙ্গটি কীভাবে বঙ্গভবনের আলোচনায় এল?

ফজলে এলাহী আকবর: আমি বঙ্গভবনে থাকা অবস্থায় হাসান নাসির (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি জানান, কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনেরা ডিজিএফআই কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছেন। তাঁদের দাবি, গোপন বন্দিশালায় যাঁরা এখনো আটক আছেন, তাঁদের মুক্ত করতে হবে।

আমি বিষয়টি রাষ্ট্রপতির সামনে তুলি। বললাম, গুমের শিকার পরিবারের সদস্য এবং আমাদের কয়েকজন কর্মকর্তা ডিজিএফআই কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছেন। তাঁরা জানতে চান, আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হবে কি না।

রাষ্ট্রপতি কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, আয়নাঘর নামে সত্যিই কিছু আছে কি না? আমি বললাম, এমন স্থান বাস্তবে আছে কি না, আপনি যেমন জানেন না, আমিও নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে ডিজিএফআই প্রধান এখানে উপস্থিত আছেন। তিনিই বলুন।

তখন সেনাপ্রধান বলেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন এবং কেউ আটক থাকলে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। পরদিন বন্দীদের মুক্ত করার ব্যবস্থা হয়েছিল বলে আমরা জানতে পারি।

প্রশ্ন

বঙ্গভবনে পরবর্তী সরকারের কাঠামো অথবা জাতীয় সরকার নিয়ে আলোচনা হয়েছিল? ছাত্রনেতারা কি সেখানে ছিলেন?

ফজলে এলাহী আকবর: পরবর্তী সরকারের বিস্তারিত কাঠামো, কে সরকারপ্রধান হবেন বা কারা সদস্য হবেন—এসব নিয়ে আমাদের সামনে কোনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। শুধু বলা হয়েছিল, সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

‘জাতীয় সরকার’ শব্দটি ব্যবহার করে কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। তবে সবাইকে সম্পৃক্ত করে একটি ব্যবস্থা গঠনের ধারণা ছিল। সেই অর্থে এটিকে অংশগ্রহণমূলক সরকারের একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত বলা যায়।

আশ্চর্যের বিষয় ছিল, আলোচনার বড় অংশে ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিলেন না। আমি আসিফ নজরুল ও জোনায়েদ সাকির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ছাত্রনেতারা কোথায়? তাঁরা বলেছিলেন, ছাত্ররা আসছেন।

বৈঠকের একেবারে শেষ দিকে একজন তরুণ ও একজন তরুণী এসেছিলেন। তাঁরা পরে বঙ্গভবনে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্যও দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের যাঁরা প্রধান নেতা হিসেবে সামনে আসেন, তাঁদের ওই বৈঠকে আমি দেখিনি। কেন তাঁরা তখন উপস্থিত ছিলেন না বা পরবর্তী সরকারের কাঠামো নিয়ে কখন, কোথায় আলোচনা হয়েছিল—সেটি আমার সামনে ঘটেনি।

আমাদের শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো আলোচনা করেই নেওয়া হবে। রাত সাড়ে নয়টার কাছাকাছি পর্যন্ত আমরা বঙ্গভবনে ছিলাম।

বিজয়ের আনন্দে সংসদ ভবনে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষ। সংসদ ভবন, ঢাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবিও তো উঠেছিল।

ফজলে এলাহী আকবর: রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ ও সংবিধান বাতিলের দাবি জোরালো হওয়ার সময় সেনাপ্রধান বিদেশে ছিলেন। একদিন রাত প্রায় নয়টার দিকে তিনি আমাকে ফোন করে জানতে চান, এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান কী। রাষ্ট্রপতিকে সরানো হলে সামনে কী হবে, নির্বাচন কবে হবে—এসব নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল।

মির্জা ফখরুল তখন চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। আমি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানাই। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির কার্যকর ক্ষমতা সীমিত; তাঁকে সরালে বরং সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তিনি (খালেদা জিয়া) তখন সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের অবস্থান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাতে বলেন।

আমি মনে করি, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের অংশগ্রহণ সেনাবাহিনীর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তরুণ কর্মকর্তারা তাঁদের পরিবার ও সৈনিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রতিক্রিয়া পাচ্ছিলেন।
প্রশ্ন

জুলাই আন্দোলনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল? উদ্যোগগুলো কি সমন্বিত ছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: বাংলাদেশের আন্দোলনের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবারের মতো অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এত দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

এটি শুধু অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয় ছিল না। তাঁদের অনেকের সন্তান, ভাই কিংবা নিকটাত্মীয় সেনা কর্মকর্তা বা সদস্য হিসেবে কর্মরত। সামরিক পরিবারগুলো যখন প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাল, সেটি কর্মরত তরুণ কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মানসিকতায় অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে।

মধ্য জুলাইয়ে মিরপুর ডিওএইচএসের ফটক ভেঙে আন্দোলনকারীদের ওপর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী ও পুলিশের হামলা এবং সেখানকার বাসিন্দাদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে। এরপর বিভিন্ন ডিওএইচএসে আলোচনা শুরু হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যরা মিছিল করেন। ৪ আগস্ট রাওয়া ক্লাবে জ্যেষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলন করেন।

এসব উদ্যোগ কোনো একক কেন্দ্র থেকে পরিকল্পিত বা কঠোরভাবে সমন্বিত ছিল না। পুরো বিষয়টি অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন গ্রুপে আলোচনা হচ্ছিল। সবার উদ্বেগ ও চাওয়া প্রায় একই ছিল। সবাই বলছিল, আর রক্তপাত নয়, জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা যাবে না।

আমি মনে করি, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের অংশগ্রহণ সেনাবাহিনীর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তরুণ কর্মকর্তারা তাঁদের পরিবার ও সৈনিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রতিক্রিয়া পাচ্ছিলেন। দুঃখজনকভাবে জুলাই ঘোষণায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের এই ভূমিকা যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি।

সেনা সদর থেকে বেরিয়ে বঙ্গভবনের দিকে যাচ্ছে রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক নেতৃত্বের গাড়িবহর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে
প্রশ্ন

আপনি আগে বলেছেন, সেনাবাহিনীকে দেশের স্থিতিশীলতার কেন্দ্র হিসেবে দেখেন। কেন এমনটি মনে করেন?

ফজলে এলাহী আকবর: আমাদের মতো উন্নয়নশীল, ঘনবসতিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। আমি বলছি না, সেনাবাহিনী কখনো ভুল করেনি। সেনাবাহিনীরও অনেক ভুল ও বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। তারপরও দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো এই প্রতিষ্ঠানটিকে সম্মান করে এবং জাতীয় সংকটে এর দিকে তাকায়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেবে। ১৯৭৫ সালের পর আমরা সেনাবাহিনীর ভেতরে বারবার অস্থিরতা, অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থান দেখেছি। একবার বাহিনীর ভেতরে অস্থিতিশীলতা শুরু হলে সেটি একটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; আরও ঘটনার জন্ম দেয় এবং পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করে।

এ কারণে ৫ আগস্টের পর আমার প্রধান উদ্বেগ ছিল, সেনাবাহিনীর ভেতরে যেন কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়। বিএনপির পক্ষে আমার অবস্থান থেকে আমি যতটা পেরেছি, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। আমার লক্ষ্য ছিল, কোনো সংঘাত ছাড়াই যত দ্রুত সম্ভব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।

আমার কাছে সেনাবাহিনী ছিল দেশের স্থিতিশীলতার কেন্দ্র। সেই প্রতিষ্ঠানকে স্থিতিশীল রেখেই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা যেতে হবে। নির্বাচন সফল না হলে আরও অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারত।

মানুষের চাওয়া অনেক। সব প্রত্যাশা একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়। সবকিছু পাওয়া গেলে পৃথিবীই স্বর্গ হয়ে যেত। তবে গণতান্ত্রিক একটি সরকার এসেছে, যার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এখন আমাদের দেখতে হবে, সরকার কীভাবে সেগুলো মোকাবিলা করে।
প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রক্রিয়াকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? তাঁকে চলে যেতে দেওয়াটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?

ফজলে এলাহী আকবর: পুরো প্রক্রিয়ার সব অংশের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি নই। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তাঁদের পার্লামেন্টে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়।

ওই পরিস্থিতিতে তাঁকে চলে যেতে দেওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল বলে আমি মনে করি। সিদ্ধান্ত নিতে আরও দেরি হলে ব্যাপক রক্তপাত হতে পারত। চারদিক থেকে মানুষ গণভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাঁকে সেখানে রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সেনাবাহিনী ও জনগণ সরাসরি মুখোমুখি হয়ে পড়ত।

ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের নেতারা আগে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার পতন হলে লাখো মানুষ মারা যাবে। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। আরও বড় রক্তপাত এড়ানো গেছে। সেই বিবেচনায় তাঁর দ্রুত পালিয়ে যাওয়াই ছিল ভালো সিদ্ধান্ত।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দিবাগত রাতে বঙ্গভবনের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। পাশে অন্য সমন্বয়কেরা। আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল
প্রশ্ন

৫ থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে, বিশেষ করে ৭ আগস্ট সেনাবাহিনীর ভূমিকা কেমন ছিল? তখন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অনেক ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যায়। এ বিষয়ে আপনার কিছু জানা আছে?

ফজলে এলাহী আকবর: আমি এটিকে সুসংগঠিত পরিকল্পনা হিসেবে নিশ্চিত করে বলতে পারব না। আমি পুরো প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ সাক্ষীও নই। তবে আমার কাছে খবর এসেছিল, ৫ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটি উল্টে দেওয়ার একটা চেষ্টা চলছিল।

তৎকালীন কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমানের নাম শুনেছিলাম। তিনি আগে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক ছিলেন। আগের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। তবে আমি তাঁকে কোনো পরিকল্পনা করতে সরাসরি দেখিনি। অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর নাম শুনেছিলাম।

তাঁকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনতাম। আমি যখন ডিরেক্টর মিলিটারি অপারেশনস ছিলাম, তখন তিনি মেজর পদে আমার অধীনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ আমার ছিল।

তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালকের সঙ্গেও ওই সময় আমার কয়েকবার কথা হয়েছিল। তবে তিনি কথিত উদ্যোগের অংশ ছিলেন—এমন কথা আমি নিশ্চিতভাবে বলছি না। আমার চেষ্টা ছিল, যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব, তাঁদের সবাইকে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা।

আমি বলেছিলাম, এ ধরনের কিছু করবেন না। আপনারা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেখেননি, আমি দেখেছি। আমার বক্তব্য ছিল, জনগণ যদি মনে করে সেনাবাহিনীর একটি অংশ বাইরের কোনো শক্তির সহায়তায় ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। সেটি শুধু সাধারণ মানুষের প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সেনাবাহিনীর সৈনিকদের মধ্যেও বিদ্রোহাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সৈনিকেরা মাত্রই মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা ফিরে পেয়েছিলেন। তাঁরা দেখেছিলেন, মানুষ তাঁদের স্বাগত জানাচ্ছে। এর পরপরই আগের সরকারকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হলে সৈনিকেরা সেটিকে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখতে পারতেন। আমি সংশ্লিষ্টদের বলেছিলাম, এমন কিছু করবেন না, যার কারণে নিজেদের অধীন সৈনিকদের হাতেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

যারা অন্যায় ও দুর্নীতি করে, তাদের যথাযথ বিচার না হলে এই অবক্ষয় আরও গভীর হবে। এ জন্য স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রধান শর্ত হচ্ছে—আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা।
প্রশ্ন

আপনি কেন ৭ নভেম্বরের সঙ্গে পরিস্থিতিটির তুলনা করেছিলেন?

ফজলে এলাহী আকবর: আমি তখন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলাম। ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার পালাবদল, পাল্টা অভ্যুত্থান ও সিপাহিদের প্রতিক্রিয়া আমি কাছ থেকে দেখেছি। খালেদ মোশাররফের উদ্যোগকে জনগণের একটি অংশ ভারতপন্থী হিসেবে দেখেছিল। সেই ধারণাই শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্যোগের বিরুদ্ধে গিয়ে জিয়াউর রহমানের পক্ষে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি সিদ্ধান্ত অধীনস্থ সৈনিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমার ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মনোভাব আগের সরকারের বিপক্ষে ছিল বলে আমার কাছে তথ্য ছিল। ফলে তাদের মনোভাবের বিপরীতে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে সেনাবাহিনীর ভেতরেই সংঘাত তৈরি হতে পারত।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শপথ গ্রহণ। ৮ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও সেনা নেতৃত্বের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা সামনে এসেছে। এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাই।

ফজলে এলাহী আকবর: আমি এখানে কোনো এক পক্ষের অবস্থান নিতে চাই না। ওই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল—প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও সশস্ত্র বাহিনী। মনে রাখতে হবে, সিদ্ধান্তগুলোতে শুধু সেনাপ্রধান নন; নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানও যুক্ত ছিলেন। তিন বাহিনীর প্রধান একই কোর্সের কর্মকর্তা ছিলেন। ফলে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত পরিচয় ও পেশাগত বোঝাপড়া ছিল। জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁরা একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। বঙ্গভবনেও তিন বাহিনীর প্রধান গিয়েছিলেন।

একটি স্বাধীন দেশে সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হতে পারে না। সেটি দেশের জন্য বিপর্যয়কর। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। করিডরসহ কয়েকটি প্রশ্নে সরকার ও সেনা নেতৃত্বের মধ্যে ভিন্ন অবস্থানের কথাও এসেছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ছিল, মতপার্থক্য যেন অস্থিতিশীলতায় রূপ না নেয়।

আমি বিএনপির পক্ষ থেকে যতটা পেরেছি, সেই অস্থিতিশীলতা এড়ানোর চেষ্টা করেছি। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে কোনো বড় ঘটনা ঘটলে সেটি এক জায়গায় থামত না; আরও অস্থিরতা তৈরি করত। আমাদের লক্ষ্য ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি সফলভাবে হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো গেছে।

প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আশা করেছিল। সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে?

ফজলে এলাহী আকবর: মানুষের চাওয়া অনেক। সব প্রত্যাশা একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়। সবকিছু পাওয়া গেলে পৃথিবীই স্বর্গ হয়ে যেত। তবে গণতান্ত্রিক একটি সরকার এসেছে, যার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এখন আমাদের দেখতে হবে, সরকার কীভাবে সেগুলো মোকাবিলা করে।

রাজনীতি যে দলই করুক, জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের চাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে দল বা সরকার যত বেশি কাজ করতে পারবে, তারা তত বেশি সফল হবে।

মানুষ একটি ভালো, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক সরকার চায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, সমাজের ভেতরেও গভীরভাবে ঢুকে গেছে। আগে ঘুষখোর ব্যক্তিকে সমাজে অসম্মানের চোখে দেখা হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করে না; বরং অর্থসম্পদকেই সম্মানের মাপকাঠি মনে করে। এটি বড় সামাজিক অবক্ষয়।

যারা অন্যায় ও দুর্নীতি করে, তাদের যথাযথ বিচার না হলে এই অবক্ষয় আরও গভীর হবে। এ জন্য স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রধান শর্ত হচ্ছে—আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা।

প্রশ্ন

আপনাকে ধন্যবাদ।

ফজলে এলাহী আকবর: আপনাকেও ধন্যবাদ।