সময়ের সঙ্গে অনেকটাই বদলেছে নির্বাচনী প্রচারের ধরন। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা এখন জোর দিচ্ছেন ডিজিটাল প্রচারে। এতে দেখা যাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক মাসে ৫২ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও সমর্থকেরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৬৪ লাখ টাকার মতো।
ফেসবুকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটার অ্যাড লাইব্রেরির ‘সোশ্যাল ইস্যুস, ইলেকশনস অ্যান্ড পলিটিকস’ ক্যাটাগরির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩০ দিনে এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে গত এক মাসে ন্যূনতম ১০০ ডলার খরচ করেছে, এমন ১১২টি ফেসবুক পেজের খরচ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১০০ ডলারের কম অঙ্কের বিজ্ঞাপনের হিসাব মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে সরাসরি দেওয়া হয় না। ফলে এটা স্পষ্ট, রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা প্রার্থীদের পক্ষে বিজ্ঞাপনের ব্যয় এর চেয়েও অনেকটাই বেশি হবে।
১১২টি পেজের মধ্যে অন্তত ৫০টি থেকে বিএনপির পক্ষে প্রচারে ব্যয় করা হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অন্তত ৩৩টি পেজ থেকে ব্যয় করা হয়েছে দলটির প্রচারে।
মেটা অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে রাজনৈতিক দল, প্রার্থীর নিজ নামের পেজ এবং বিভিন্ন স্লোগান–সংবলিত পেজ থেকে রাজনৈতিক কনটেন্টে (আধেয়) ৫২ হাজার ৪১১ ডলার ব্যয় করা হয়েছে।
গত এক মাসের পরিসংখ্যানে বিজ্ঞাপনের প্রচারে দল হিসেবে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে দলটির প্রার্থীর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। ১১২টি পেজের মধ্যে অন্তত ৫০টি থেকে বিএনপির পক্ষে প্রচারে ব্যয় করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অন্তত ৩৩টি পেজ থেকে ব্যয় করা হয়েছে দলটির প্রচারে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি পার্টির মতো দলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও রয়েছেন এমন প্রচারে।
দল হিসেবে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও এগিয়ে বিএনপি। দলটির পক্ষে প্রচার চালানো ৫০টি পেজ থেকে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৯১৬ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি পার্টির মতো দলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও রয়েছেন এমন প্রচারে।
ব্যক্তি হিসেবে ব্যয়ে এই দলে এগিয়ে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী। গত এক মাসে তাঁর পেজ থেকে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২০০ ডলার (৫ লাখ টাকার বেশি)।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে প্রচার চালানো ৩৩টি পেজ থেকে মোট ব্যয় করা হয়েছে ১১ হাজার ২২২ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। দলটির পক্ষে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে ‘জামায়াত ঢাকা-১৫, মিরপুর-কাফরুল’ পেজ থেকে, ১ হাজার ৪৪৭ ডলার (১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা)। এই আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রার্থী। দলটির ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী মো. আবদুল বাতেনের পেজ থেকে ব্যয় হয়েছে ৯২৬ ডলার (১ লাখ ১২ হাজার টাকা)।
এনসিপির সর্বোচ্চ ব্যয় করা হয়েছে দলটির ঢাকা-২০ আসনে প্রার্থী নাবিলা তাসনিদের পেজ থেকে। সেখান থেকে ব্যয় করা হয়েছে ৭০৭ ডলার (৮৬ হাজার টাকা)।
ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও পিছিয়ে নেই। কোনো কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী ডিজিটাল প্রচারে বড় বিনিয়োগ করেছেন। তেমনই একজন হলেন বাগেরহাটের তিনটি আসনের প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম। তাঁর পেজ থেকে ব্যয় করা হয়েছে ১ হাজার ৯০০ ডলার (২ লাখ ৩১ হাজার টাকা)। গত এক মাসে ডিজিটাল প্রচারে চতুর্থ সর্বোচ্চ ব্যয় করেছেন সাবেক এই সংসদ সদস্য।
বিজ্ঞাপন সংখ্যায়ও এগিয়ে বিএনপি। দলটির পক্ষে প্রচার চালানো পেজগুলো থেকে ২ হাজার ২২৪টি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে থাকা পেজগুলো দিয়েছে ৭৩৯টি বিজ্ঞাপন। দল হিসেবে এরপরই আছে ইসলামী আন্দোলন। তাদের পক্ষে ৮০টি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আর এনসিপির পক্ষে দেওয়া হয়েছে ৭৭টি।
বিজ্ঞাপন সংখ্যায়ও এগিয়ে বিএনপি। দলটির পক্ষে প্রচার চালানো পেজগুলো থেকে ২ হাজার ২২৪টি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে থাকা পেজগুলো দিয়েছে ৭৩৯টি বিজ্ঞাপন। দল হিসেবে এরপরই আছে ইসলামী আন্দোলন। তাদের পক্ষে ৮০টি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আর এনসিপি পক্ষে দেওয়া হয়েছে ৭৭টি।
তবে ব্যক্তি হিসেবে গত এক মাসে সর্বোচ্চ ২৩৩টি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবদুল বাতেন। আর ২৩২টি বিজ্ঞাপন দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন বিএনপির প্রার্থী মো. আবুল কালাম।
বিজ্ঞাপনে যা রয়েছে
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রচার করা বিজ্ঞাপনগুলোর বড় অংশ ভিডিও ও গ্রাফিকনির্ভর। এগুলোর বেশির ভাগেই দল এবং ব্যক্তির নির্বাচনী প্রচার–প্রচারণার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। বেশ কয়েকটি পেজের কিছু বিজ্ঞাপনে প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে সমালোচনাও দেখা গেছে।
অনেকগুলো পেজের বিজ্ঞাপনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ছবি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ধর্মীয় এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোও বেশ কিছু বিজ্ঞাপনে উঠে এসেছে।
ইসির পেজেও বিজ্ঞাপন
মেটা অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য বলছে, গত এক মাসে নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ‘ইলেকশন কমিশন সেক্রেটারিয়েট’ থেকে ব্যয় করা হয়েছে ২১৭ ডলার (২৬ হাজার টাকা)। এই সময়ে মোট ৯২টি বিজ্ঞাপন দিয়েছে তারা। তবে বিজ্ঞাপনগুলো কোন বিষয়ে, সে সম্পর্কে ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরিতে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডিজিটাল প্রচারে ব্যয়ে রাখতে হবে নজর
প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সীমা থাকলেও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যয় কতটা নজরদারির মধ্যে রয়েছে, সে প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের ব্যয়ের বিষয়ে তদারকির জন্য ইসির একটি মনিটরিং সেল রয়েছে। তবে সেটি এখনো তেমনভাবে কার্যকর নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রার্থীদের ব্যয় তদারকি কার্যক্রম আরও বেগবান হওয়া দরকার। ইসি এ ব্যাপারে কঠিন অবস্থান নেবে।
নির্বাচনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব না থাকলে অর্থের প্রভাব নির্বাচনের সমতা নষ্ট করতে পারে। এ বিষয়ে নির্বাচনবিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী প্রথম আলোকে বলেন, এবারের নির্বাচনের ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারে আইনগত অনুমোদন দেওয়া রয়েছে আচরণবিধিতে। তবে ডিজিটাল প্রচারে যে ব্যয় হবে, সেটি নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমের বাইরে তার ব্যানার, ফেস্টুন, নির্বাচনী ক্যাম্পের যে খরচ তার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সে জন্য প্রচারের শেষ দিন পর্যন্ত প্রত্যেক প্রার্থী কোথায় কত ব্যয় করছেন, সেদিকে নজর রাখতে হবে।