ঢাকা–১২ আসন

এত ব্যানার–ফেস্টুনের ‘ভিড়ে’ নিজেকেই খুঁজছেন প্রার্থী

দেশের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি প্রার্থী এই আসনে, ১৫ জন। একজন স্বতন্ত্র, বাকিরা বিভিন্ন দলের। এখানে ভোটার প্রায় সাড়ে তিন লাখ।

অন্যরা টাকা বেশি খরচ করছেন, যে কারণে ‘দরিদ্র’ প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে ফরিদ আহমেদের। তিনি জনতার দলের প্রার্থী হিসেবে কলম প্রতীকে ঢাকা–১২ আসনে নির্বাচন করছেন।

যদিও ফরিদ আহমেদ নিজেই ‘মৌলিক বাংলা’ নামের একটি দলের সভাপতি। তবে নিজের দলের নিবন্ধন না থাকায় জনতার দলের প্রার্থী হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, সব মানুষের কাছে পরিচিতি তুলে ধরতে পারলে তিনিই জয়ী হবেন।

নির্বাচনী প্রচারে ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন জানিয়ে ফরিদ আহমেদ গত মঙ্গলবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, চার চাকার স্কুটির মতো একটি গাড়ি আছে তাঁর। সেটিকে ব্যানার দিয়ে সাজিয়ে নির্বাচনী গাড়ি বানিয়েছেন। সেই গাড়ি নিয়ে নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যাচ্ছেন। মাইকে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভোট চাচ্ছেন।

নির্বাচনে অর্থের লড়াই বেশি হচ্ছে জানিয়ে এই প্রার্থী জানান, ভোটের মাঠে এত ব্যানার–ফেস্টুনের ‘ভিড়ে’ নিজেকে খুঁজে পাচ্ছেন না। বন্ধু ও বিদেশি কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহাযোগিতায় ১২০টি প্ল্যাকার্ড ও ৭০টি ব্যানার তৈরি করেছেন। বড় দলের প্রার্থীদের পেশিশক্তি ও টাকার কাছে পেরে উঠছেন না। একজন দরিদ্র প্রার্থী হিসেবে টিকে থাকা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর থানার কিছু অংশ নিয়ে ঢাকা–১২ আসন। এই আসনে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, বাকিরা বিভিন্ন দলের। এখানে ভোটার প্রায় সাড়ে তিন লাখ।

এ আসনের প্রার্থীদের একজন মোমিনুল আমিন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের (এনডিএম) প্রার্থী হিসেবে ‘সিংহ’ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই প্রার্থীর সঙ্গে মঙ্গলবার মুঠোফোনে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি জানান, আনুষ্ঠানিক প্রচারের শুরুর দিন থেকেই নির্বাচনী এলাকায় ব্যানার, প্ল্যাকার্ড লাগিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে তা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েও কাজ হয়নি।

দুটি ভিন্ন কৌশলে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন জানিয়ে মোমিনুল আমিন বলেন, বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ৮৯ হাজার ভোটারের কাছে পৌঁছেছেন। ভোটারদের সমস্যা জানার চেষ্টা করেছেন। সে অনুযায়ী ইশতেহার করছেন। পাশাপাশি এই আসনের অনেক এলাকা আছে, যেখানে সাধারণত কোনো প্রার্থী যান না। সেই এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।

এবারের ভোট অন্যবারের তুলনায় ভিন্ন হবে জানিয়ে মোমিনুল আমিন বলেন, ‘এবার অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও হেরে যাবে। মানুষ শুধু মার্কা দেখে ভোট দেবে না। জয়–পরাজয় নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। শুধু এটুকু বলব, চমকপ্রদ ফলাফল হবে।’

সাইফুল আলম নীরব

এ আসনে বিএনপি থেকে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে। পরে জোটসঙ্গীদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে তাঁকে বাদ দিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তাঁর প্রতীক ‘কোদাল’।

অন্যদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন নীরব। বিএনপি থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নীরবের প্রতীক ‘ফুটবল’।

সাইফুল আলম খান মিলন

এ আসনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন সাইফুল আলম খান মিলন।

গত মঙ্গল ও বুধবার ঢাকা-১২ সংসদীয় আসনের শেরেবাংলা নগর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, নাখালপাড়া, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও হাতিরঝিল এলাকা ঘুরেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। এসব এলাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পাড়া–মহল্লায় দাঁড়িপাল্লা, কোদাল ও ফুটবল প্রতীকের ব্যানার–প্ল্যাকার্ড–বিলবোর্ড দেখা গেছে। এই আসনের অন্য প্রার্থীদেরও কমবেশি ব্যানার–ফেস্টুন চোখে পড়েছে।

এ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্য ফ্রন্ট থেকে ‘মোমবাতি’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন মোহাম্মাদ শাহজালাল। প্রচারে পিছিয়ে থাকার কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বড় দলের প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন। প্রতি রাতে নতুন নতুন ব্যানার–পোস্টার লাগাচ্ছেন। প্রচারের শুরুতে কিছু ব্যানার লাগিয়েছিলাম, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে।’

এ আসনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে নির্বাচন করছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে, ভোটের প্রচার নির্ভর করে আর্থিক সচ্ছলতার ওপর। যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি।

মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘মানুষ আমাকে ভীষণ পছন্দ করছে, যা আমাকে পাস–ফেলের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।’

এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা প্রতীক), গণ অধিকার পরিষদের আবুল বাশার চৌধুরী (ট্রাক), সিপিবির কল্লোল বনিক (কাস্তে), গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার (মাথাল), ইনসানিয়াত বিপ্লবের সালমা আক্তার (আপেল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের মুনতাসির মাহমুদ (ছড়ি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নাঈম হাসান (কাঁঠাল) ও আমজনতার দলের মো. তারেক রহমান (প্রজাপতি)।

সিপিবির প্রার্থী কল্লোল বনিক প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন এখন টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে। আগের মতোই এ আসনে পেশিশক্তির প্রদর্শনী চলছে।