জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করেন দলের আমির শফিকুর রহমান। গতকাল খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করেন দলের আমির শফিকুর রহমান। গতকাল খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে

নির্বাচনী জনসভায় শফিকুর

বাধা এলে প্রতিহত করতে হবে

নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার আপনারা কে? আচরণবিধি ভঙ্গ হলে আপনারা প্রশাসনকে বলুন। যে শাস্তি হয় আমরা মাথা পেতে নেব; কিন্তু আপনারা কে গায়ে হাত দেওয়ার? আমাদের মায়ের জাতিকে অপমান বরদাশত করব না।’

গতকাল মঙ্গলবার সকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি যুব সমাজকে আহ্বান জানাব, যেখানেই বাধা আসবে, সেখানেই প্রতিহত করতে হবে। আমরা কারোর পায়ে পা দিয়ে ঝামেলা করব না। তবে কাউকে ছাড়াও দেব না।’

যশোরের পর সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। এসব সভায় জামায়াতসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য মনোনীত প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও হানাহানির ঘটনায় খুলনার জনসভা থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের আমির। সেখানে তিনি বলেন, ‘আজ বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু হয়ে গেছে। মাথা গরম হয়ে গেছে। এখন মাঘ মাস, এখন মাথা গরম হলে চৈত্র মাসে কী করবেন? এখন আরামদায়ক বাতাস আছে, আবহাওয়া আছে-এখন মাথা গরম কইরেন না। জনগণের রায়ের প্রতি আস্থা রাখুন। অতীতে জনগণের রায়কে যারা সম্মান করেনি, তাদের পরিণতি কী হয়েছে, তা থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত।’

পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি থাকবে না

অতীতের ‘পরিবার তন্ত্রনির্ভর’ রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। যশোরের জনসভায় তিনি বলেন, ‘অতীতের বস্তাপচা রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে আমরা বাংলাদেশে নতুন রাজনীতি নিয়ে আসব, যেখানে পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি থাকবে না। আমাদের দলের বিজয় চাই না, আমরা দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।’

গণভোট প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে হ্যাঁ ভোট মানেই আজাদি, আর না ভোট মানেই গোলামি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম হবে হ্যাঁ ভোট, এরপর সরকার গঠনে প্রতীকের ভোট।

প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং জনগণের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে দল নিজেদের কর্মীদের সামাল দিতে পারে না, তাঁরা দেশও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আগে আপনারা দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরান। এ ক্ষেত্রে যদি আমাদের কোনো সহযোগিতা লাগে, তাহলে আমরা দেব।’

যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের সভাপতিত্বে ওই জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলামসহ অনেকে।

‘কিছু মানুষের মাথা গরম হয়ে গেছে’

সাতক্ষীরা সরকারি বিদ্যালয় মাঠে গতকাল দুপুরে আয়োজিত জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে স্রোত তৈরি হয়েছে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে, পরিবর্তনের পক্ষে, বস্তাপচা রাজনীতির বিপক্ষে, দুর্নীতির বিপক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে, জুলুমতন্ত্রের বিপক্ষে, মা-বোনদের বেইজ্জত করার বিপক্ষে আর ইজ্জত দেওয়ার পক্ষে। কিছু মানুষের এ অবস্থা দেখে মাথা গরম হয়ে গেছে।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘তারা আমাদের মায়ের ইজ্জতের ওপর হাত দিয়েছে। আমরা তাদের অনুরোধ করি, তোমরা তোমাদের মায়েদের সম্মান করতে শেখো। যারা নিজের মাকে সম্মান করতে পারে, তারা গোটা জাতি, বিশেষ করে মায়ের জাতিকে সম্মান করতে পারে। যারা নিজের মাকে সম্মান করে না, তারা অন্য মাকে সম্মান জানাতে পারে না। মনে রাখবে, আমাদের জীবনের চেয়ে আমাদের মায়েদের ইজ্জতের মূল্য অনেক বেশি। সুতরাং কোথাও আমাদের মায়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করলে আমরা কাউকে ছেড়ে দিয়ে কথা বলব না।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহ যদি সুযোগ দেন, তবে কোনো শিক্ষিত চোর আপনাদের সম্পদ খেয়ে ফেলতে পারবে না, খেয়ে ফেলতে দেওয়া হবে না।’

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি আজিজুর রহমানের সঞ্চালনায় জনসভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী মুহা. রবিউল বাশার ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলামসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতারা বক্তব্য দেন।

‘বেকার ভাতা দিয়ে অপমান করতে চাই না’

খুলনার জনসভায় জামায়াত আমির বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমাদের একটি বন্ধু সংগঠন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছে, এটা মায়েদের হাতে দেবেন। তাঁরা এক দিকে দিচ্ছেন ফ্যামিলি কার্ড, আরেক দিকে আমার মায়ের গায়ে হাত দিচ্ছেন। এ দুটি একসঙ্গে চলে না। দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে—এ দেশের মানুষ, মাটি ও সম্পদ, ইজ্জত কার কাছে নিরাপদ। সেটা এখন আর কারও কাছে বুঝতে বাকি নেই।’

তরুণদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তোমরা বুক চিতিয়ে লড়াই করে মুক্তি এনে দিয়েছ—তোমাদের মোবারকবাদ। আমরা তোমাদের হাতে বেকারের ভাতা তুলে দিয়ে অপমান করতে চাই না। আমরা তোমাদের প্রত্যেকটি হাতকে কর্মী ও কারিগরের হাতে পরিণত করতে চাই। তোমাদের সম্মানিত করতে চাই। জুলাই বিপ্লবে তোমাদের যে অবদান, কিছুটা হলেও তার ঋণ শোধ করতে চাই।’

‘আমরা কান ধরে টান দেব’

বাগেরহাটের জনসভা আয়োজন করা হয় শহরতলির হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজার-সংলগ্ন মাঠে। সেখানে জামায়াতের আমির বলেন, ‘রাজনীতির জায়গা স্বচ্ছ হলে গোটা সমাজ স্বচ্ছ হয়ে যাবে। মাথা যদি ঠিক থাকে, গোটা শরীর ঠিক হয়ে যাবে। তখন আর কেউ দুঃসাহস দেখাবে না দুর্নীতি করার, অন্য কোনো অপরাধ করার। আমরা লেজ ধরে টান দেব না, আমরা কান ধরে টান দেব ইনশা আল্লাহ। যারাই অপরাধ করুক কোনো ছাড় নেই।’

ব্যাংক ডাকাত, শেয়ার মার্কেট লুটেরাদের কী হবে—এমন প্রশ্ন তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তারা অনেকে পালিয়ে গিয়ে বিদেশে আলিশান বাড়িতে থাকেন। আল্লাহ যদি আমাদের তৌফিক দেন, আমরা ওদের পেটের ভেতরে হাত ঢুকাইয়া জনগণের টাকা বের করে নিয়ে আসব। সেই টাকা রাষ্ট্রীয় তহবিলে যোগ হবে।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা ও খুলনা এবং প্রতিনিধি, বাগেরহাট]