নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ফ্যাক্ট চেক

ফেসবুকে এক সপ্তাহে তারেক রহমানকে নিয়ে ২৯টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত

ফেসবুকে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে ছড়ানো দুই শর মতো ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। জাতীয় নির্বাচনের আগে ছড়ানো ভুয়া তথ্যগুলোর শিকার মূলত রাজনৈতিক দল ও নেতারাই হয়েছেন। একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে।

রিউমর স্ক্যানার, ফ্যাক্ট ওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, বাংলা ফ্যাক্ট ও দ্য ডিসেন্ট এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সাত দিনে ১৯০টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। তার মধ্যে ৯৩টি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে ২৯টি রয়েছে তারেক রহমানকে নিয়ে। তাঁর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও ভুয়া তথ্যের শিকার হয়েছেন।

বিএনপির চেয়ারম্যানের পর সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ভুয়া তথ্য।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারেক রহমানের বক্তব্য বিকৃত করে ও ভুয়া উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে মেয়ে জাইমা রহমানের বিয়ে প্রসঙ্গে তারেক রহমানের ভুয়া মন্তব্যের একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয় একটি সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদলে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমটি এমন কোনো ফটোকার্ডই প্রকাশ করেনি।

আরেকটি ঘটনায় তারেক রহমান পুরোনো ও ছেঁড়া জুতা পরে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন—এমন দাবি করে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, তাঁর নাইকি ব্র্যান্ডের জুতাটি ছেঁড়া নয়। এটি নাইকি ব্র্যান্ডের একটি জুতা, যার আউটার সোলের নকশাই এমন।

তারেক রহমানকে নিয়ে তৈরি করা এই কার্ডে তার এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে যা তিনি বলেননি

তারেক রহমানের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর কারামুক্তি ও বিএনপিতে যোগদানের দাবিতে একটি ছবিও প্রচার করা হয়। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি। এ ছাড়া ‘দুই দেশের নাগরিকত্ব থাকার পরও তারেক রহমানকে নির্বাচন করতে দেওয়া হচ্ছে কেন’—এমন শিরোনামে পুলিশের বক্তব্য দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। এটিও এআই দিয়ে তৈরি করা।

তারেক রহমান নতুন ফেসবুক পেজ খুলে সবাইকে ফলো করার আহ্বান জানিয়েছেন—এমন দাবিতে একটি ডিপফেক ভিডিও প্রচার করা হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, তাঁর পুরোনো একটি ভিডিওর ভিন্ন দৃশ্য ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়েছে।

আর কার কার নামে

শেখ হাসিনাকে নিয়ে গত সপ্তাহে ৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব কনটেন্টে কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে প্রচার করা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের নামে ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে বক্তব্য আরোপ করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ৭টি ভুয়া তথ্য। এর মধ্যে ‘তারেক রহমান ঝগড়া করতে এলে ছাত্রী সংস্থার কর্মীরা যথেষ্ট’—এমন একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয় একটি সংবাদমাধ্যমের নামে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে ৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত এক সপ্তাহে। এসব কনটেন্টে মূলত তাঁর বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ‘বড় দল বলতে এখনো আওয়ামী লীগকেই মনে করি’—এমন মন্তব্য তাঁর নামে প্রচার করা হয়; যদিও তিনি বলেছেন, নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগকে এত দিন ধরে বড় দল হিসেবে বোঝানো হতো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিয়ে ৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ফ্যাক্ট চেকিংয়ে। এর মধ্যে ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছেন’—এমন দাবিতে গণমাধ্যমের নামে একটি ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। ঢাকা–৮ আসনে মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী শুরু থেকেই বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে আসছেন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে ৪টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত সপ্তাহে। ফেসবুকে কয়েকটি ছবিসহ দাবি করা হয়, তাঁর বাসা থেকে চার বস্তা টাকা উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনি র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, হাতকড়া পরা ছবিটি অন্য এক ব্যক্তির, যেখানে সম্পাদনা করে নাসীরুদ্দীনের মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত সপ্তাহে। গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—এমন দাবিতে সংবাদমাধ্যমের একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়।

শফিকুর রহমান বলেননি, এমন বক্তব্য নিয়েও তৈরি করা হয় কার্ড

এনসিপির নেতা কুমিল্লা–৪ আসনে প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে ৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। জাইমা রহমানের কথায় তাঁর বিএনপিতে যোগদানের দাবিতে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি।

ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারাকে নিয়ে ৩টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। ‘জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন’—এমন শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট।

ভুয়া তথ্যের অর্ধেকই নির্বাচনকেন্দ্রিক

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর নিয়ে উদ্বেগ ছিল সব মহল থেকে। ফ্যাক্ট চেকিংয়েও দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভূরি ভূরি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

গত সপ্তাহে যে ১৯০টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে রিউমর স্ক্যানার শনাক্ত করেছে ১২৬টি, ফ্যাক্ট ওয়াচ ২৩টি, ডিসমিসল্যাব ১৫টি, বাংলা ফ্যাক্ট ১৫টি, দ্য ডিসেন্ট ১১টি। মোট শনাক্ত ভুয়া তথ্যের ৯৩টি নির্বাচন নিয়ে।

ভোটের তারিখ, নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত, নির্দিষ্ট দলের জয়ের সম্ভাবনা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান—এসব নিয়েই বিভ্রান্তি বেশি ছড়ানো হচ্ছে। একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি তাঁর পুরোনো ভাষণ সম্পাদনা করে তৈরি করা।

নির্বাচন ঘিরে আরেকটি ভুয়া তথ্যে দাবি করা হয়, জাতিসংঘের জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি ২৪০ থেকে ২৫০টি আসনে জয় পাবে। অথচ এমন কোনো জরিপ জাতিসংঘ করেনি, করেও না।

‘আ.লীগবিহীন একক নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ নেই’—ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনকে উদ্ধৃত করে এমন ভুয়া তথ্যও প্রচার করা হয়। ‘স্লোগান একটাই, ভোটকেন্দ্রে যাব না, ভোট দেব না’—সেনাবাহিনীর এক সদস্যের নামে এআই দিয়ে তৈরি এমন ভিডিও ছড়াতেও দেখা গেছে।

নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া তথ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের নকল ফটোকার্ড। গত সপ্তাহে এমন ৫৭টি ভুয়া ফটোকার্ডে শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। ভুয়া মন্তব্য, খণ্ডিত বক্তব্য কিংবা সম্পাদিত বা ভুয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অন্তত ২৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।

ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খানের নামে ‘যার জীবনে একটা ফ্যামিলি কার্ড থাকবে, তার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে না’—এমন একটি বক্তব্য ছড়ানো হয়, যা তিনি আদৌ বলেননি। কুমিল্লা–৭ আসনের বিএনপির প্রার্থীকে দল থেকে বহিষ্কারের একটি ভুয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, দলের একটি ভিন্ন প্রকৃত প্রেস বিজ্ঞপ্তি ডিজিটালভাবে সম্পাদনা করেই আলোচিত ভুয়া বিজ্ঞপ্তিটি তৈরি করা হয়েছে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সংবাদ সম্মেলনের ছবি সম্পাদনা করে তৈরি করা হয় এই কার্ড

ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা, পুরোনো ছবি ও ভিডিওকে সমসাময়িক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে ২৫টি ঘটনায়। যেমন এক নারীকে মারধরের একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়—‘বিয়েতে রাজি না হওয়ায় বিএনপি নেতা এক নারীকে চুরির অপবাদ দিয়ে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে’। অথচ ভিডিওটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের।এ ছাড়া ৮টি ঘটনায় সম্পাদিত ছবি বা সাজানো ভিডিওকে বাস্তব বলে দাবি করা হয়েছে। একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে ‘মির্জা আব্বাস, চাঁদাবাজ’ স্লোগান দিতে শোনা গেলেও যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটিতে সম্পাদনা করে স্লোগানের অডিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে এআই তৈরি অন্তত ২২টি ছবি ও ভিডিও এবং ২টি ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সংবাদ সম্মেলনের একটি ছবিতে সবার মাথায় ব্যান্ডেজ দেখানো হয়। প্রকৃতপক্ষে মূল ছবিতে মাত্র দুজনের মাথায় ব্যান্ডেজ ছিল।

গত এক সপ্তাহে ফ্যাক্ট চেকিংয়ে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলেক নিয়ে ৩৬টি করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিয়ে ৯টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়েও কয়েকটি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে গত সপ্তাহে।