
দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বিভিন্ন এনজিও গরিব মানুষকে মুক্তি দেওয়ার বদলে উল্টো ঋণের জালে আটকে ফেলছে। ঋণের এই দুর্বিষহ বোঝা বইতে না পেরে অনেক ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ মজুর আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। গ্রামীণ মজুররা কারও দয়া বা ভিক্ষা চান না; তাঁরা সারা বছর কাজ চান, ন্যায্য মজুরি চান, পরিশ্রম করে মানুষের মতো বাঁচতে চান।
‘বাজেট ২০২৬-২৭: গ্রামীণ মজুরের সমস্যা ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় কথাগুলো বলেছেন অর্থনীতির অধ্যাপক এম এম আকাশ। শুক্রবার রাজধানীর মুক্তি ভবনে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি এই সভার আয়োজন করে। সভায় বক্তারা আসন্ন বাজেটে ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জন্য রেশন, পেনশন, সারা বছর কাজ ও ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দের দাবি জানান।
‘মজুরের ছেলে মজুর হবে—এটা হতে পারে না। তাদের শিক্ষিত করে উপযুক্ত চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।’অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি
সভায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, উন্নয়নের ডামাডোলে মেহনতি মানুষের কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
অধিকার আদায়ের লড়াই জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জমি বর্গা দেওয়া যায়, স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, খাসজমি ভূমিহীনদের অধিকার, তা আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণে যাতে কোনোভাবেই ‘স্বজনপ্রীতি’ বা অনিয়ম না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার তাগিদ দেন তিনি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান শ্রমিকের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন, মজুরের ছেলে মজুর হবে—এটা হতে পারে না। তাদের শিক্ষিত করে উপযুক্ত চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আয় ও ভোগবৈষম্য বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং প্রবীণ শ্রমিকদের মাসিক পেনশনের আওতায় আনার দাবি জানান। এ ছাড়া মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির প্রভাবে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি দরিদ্র মানুষের ওপর পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ এবং সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সভাপতি তরিকুল ইসলামসহ তৃণমূলের প্রতিনিধি ছৈনউদ্দিন, সুফিয়া খাতুন, ফরিদ প্রধান ও তজু মিয়া সভায় বক্তব্য দেন। গ্রামীণ মজুররা জানান, তাঁরা কৃষকের জমি লিজ নিয়ে রাতদিন খাটলেও উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম পাচ্ছেন না। বর্তমানে হাওর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ধানক্ষেত নষ্ট হওয়ায় তাঁরা চরম সংকটে আছেন। সভায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং বজ্রপাত ও দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের পরিবারকে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, সংসদ সদস্যদের কাজ সংসদে আইন প্রণয়ন করা; কিন্তু উপজেলা পরিষদে তাঁদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নির্মাণ করা হলে তা জনগণের ক্ষমতায়নের বিপরীতমুখী ও প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে।
ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. ফজলুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অর্ণব সরকার মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং সভা পরিচালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক কল্লোল বণিক।