
নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অংশীদারত্বের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের সাহেবের কথায় আস্থা রাখা, বিশ্বাস করা—এটার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এটা আরেকটি চক্রান্ত জনগণকে বিভ্রান্ত করার। তারা (আওয়ামী লীগ) বলবে, এই তো আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, ওরা শুনছে না, যাচ্ছে না।’
আজ মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন।
এর আগে গত রোববার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলে দলটিকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। আওয়ামী লীগ নেতা এই বক্তব্য দেওয়ার দুই দিন পর আজ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সংবাদ সম্মেলন করেন। সাংবাদিকেরা নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের প্রস্তাবের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে মির্জা ফখরুল এটিকে সরকারের একটি চক্রান্ত বলে বর্ণনা করেন।
বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের দেওয়া একই ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।
এখন আবার আওয়ামী লীগ যে সেই পুরোনো প্রস্তাব সামনে এনেছে, সে ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব সরকারের প্রতি তাদের বিশ্বাসের অভাবের কথা তুলে ধরেন। মির্জা ফখরুল গত নির্বাচনের আগে সংলাপের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করে আমরা তাঁর সঙ্গে সংলাপে বসেছিলাম। সেই সংলাপে যেসব কথা তিনি দিয়েছিলেন, সেগুলোর একটাও তাঁরা রক্ষা করেননি। গত দুটি নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারেনি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও তারা ভোট দিতে পারে না।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামে একটি উপনির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটাকে কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকার পরিকল্পিতভাবে জনগণের ভোট দেওয়ার আগ্রহকে নষ্ট করে দিয়েছে, যাতে তারা নিজের মতো করে ব্যালট ভোট বাক্সে ভরতে পারে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই অবৈধ সরকারের অধীনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। সে জন্য এই সংসদ ভেঙে দিয়ে এই অবৈধ সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা তুলে ধরা হয় এ সংবাদ সম্মেলনে। মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, নির্বাচনী মাঠ শূন্য করতে সরকার আবারও ‘পুরোনো খেলা’ শুরু করেছে। তিনি বলেন, এই সরকার—যারা নির্বাচিত নয়, যাদের কোনো ম্যান্ডেট নেই। তারা আবারও নির্বাচন নিয়ে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো আগের খেলায় মেতে উঠেছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় থেকে তারা শুরু করেছিল। এবার তারা অনেক আগে থেকে শুরু করেছে। মামলা-মোকদ্দমা, ত্রাস-সন্ত্রাস, বিভিন্ন আইনের মধ্য দিয়ে মিথ্যা মামলা ও গায়েবি মামলা করে আবারও নেতা-কর্মীদের মাঠ থেকে পুরোপুরিভাবে সরিয়ে দেওয়ার সেই কাজ তারা শুরু করে দিয়েছে। তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, একটা নীলনকশার নির্বাচন করা। বিরোধী দলকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া, এরপর নীলনকশার নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসা। সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করছে।
এবার কী পারবে? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘একেবারেই পারবে না। কারণ, এবার জনগণ ইতিমধ্যে রাস্তায় নেমেছে, আন্দোলন শুরু করেছে। ইতিমধ্যে আমাদের ১৭ জন মানুষ এই আন্দোলনে রাজপথে প্রাণ হারিয়েছে, অসংখ্য নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। এই আন্দোলন আরও তীব্র হবে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার বাধ্য হবে জনগণের দাবি মেনে নিতে।’
বিএনপির মহাসচিব জানান, সারা দেশে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নামে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৪৩টির অধিক মামলা দায়ের করেছে এই সরকার। আসামির সংখ্যা প্রায় ৩৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৮১। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২ হাজার ৮৩০ এর বেশি মামলা রয়েছে। ঢাকাতেই বিরোধী মত ও বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫০০টি মামলা আছে।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের শুধু গ্রেপ্তারই নয়, যাঁরা চলমান আন্দোলনে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের কীভাবে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, সে কাজ করছে সরকার।
বিএনপির মহাসচিব বলেন, তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ না নিলেও সরকার নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বাড়ি-বাড়ি তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে। গাজীপুরে একটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। সিলেটে নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার ও বাসায় বাসায় তল্লাশি করছে।
গতকাল বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠক করে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কাউকে কোনো নালিশ করি না, আমরা কাউকে কিছু বলতে যাই না, এটা মনে রাখতে হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এখানে বিদেশি যেসব মিশন আছে, অথবা যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সঙ্গে রুটিন আলোচনা হয়, সেই আলোচনা হয়েছে।’