
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে এবার বিভাগভিত্তিক লংমার্চের চিন্তা করছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য।
চলতি মাসের শেষ দিকে, ২৯ বা ৩০ আগস্ট এ কর্মসূচি শুরু করার বিষয়ে একটি প্রস্তাব জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এসেছে। আজ সোমবার সন্ধ্যায় ১১–দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে এ বৈঠকে জোটের আন্দোলনের পরবর্তী ধাপের রূপরেখাও নির্ধারণ করা হবে।
জোটের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, বিভাগভিত্তিক লংমার্চের পাশাপাশি পথসভা, জনসভা, রাজধানীতে মহাসমাবেশ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের নিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রস্তাবও রয়েছে।
জোটের নেতাদের ভাষ্য, সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোই এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি কর্মসূচির মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর দিকটিও বিবেচনায় আছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছে ১১–দলীয় ঐক্য। সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই জোটের বিভাগীয় সমাবেশের কর্মসূচি শেষ হয়।
এরপর আন্দোলনের নতুন ধাপ নির্ধারণে ৩০ জুলাই রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে বৈঠক করে ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটি। বৈঠকে বিভাগভিত্তিক লংমার্চ, লংমার্চ চলাকালে পথসভা-জনসভা, রাজধানীতে মহাসমাবেশ, জাতীয় সেমিনার, গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে সেমিনার-আলোচনা সভার প্রস্তাব ওঠে।
জোটের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, আজ ১১–দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে। এরপর কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। আর ৫ আগস্ট রাজধানীর পল্টনের পূর্বঘোষিত সমাবেশ থেকে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
জানতে চাইলে জোটভুক্ত দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন গতকাল রোববার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে লংমার্চ কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে একটি প্রস্তাব এসেছে। জোটের শীর্ষ নেতাদের ৩ আগস্টের (আজ সোমবার) বৈঠকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এরপর কর্মসূচির সময় ও রুট (পথ) নির্ধারণ করা হবে।
প্রথম ধাপে লংমার্চ হতে পারে ৩ বিভাগে
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ঢাকা থেকে খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগে লংমার্চ হবে। প্রতিটি লংমার্চের পথে একাধিক পথসভা ও জনসভা করার চিন্তা রয়েছে, যাতে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো যায়। প্রথম ধাপ শেষে রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে একই ধরনের কর্মসূচি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নেতারা বলছেন, এর আগে আগামী অক্টোবরে ঢাকায় জোটের মহাসমাবেশ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে লংমার্চের কর্মসূচি চূড়ান্ত হলে এই মহাসমাবেশ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ, তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে থেকে আন্দোলনের গতি ধরে রাখতে চান।
জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট দাবিও থাকবে
বিরোধী এই জোটের সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নই তাঁদের আন্দোলনের মূল দাবি। তবে তাঁদের আন্দোলন কর্মসূচিতে রাজনৈতিক ইস্যুর বাইরে জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ও গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে আছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, লোডশেডিং, গ্যাস–সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান, জনভোগান্তির মতো বিষয়। জনগণের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে সামনে আনলে আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে।
জোটের এসব নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোতে ১১ দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা গেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার মাঠপর্যায়ে আরও বড় কর্মসূচি নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জোটের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ধরে রাখার বিষয়টি তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারবিরোধী আন্দোলন হলেও তা সহিংস হবে না বলে জানিয়েছেন ১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত একটি দলের শীর্ষ নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন মূল দাবি হলেও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তাঁদের কর্মসূচিগুলোতে গুরুত্ব পাবে। সরকারবিরোধী আন্দোলন হলেও বিরোধী জোট জ্বালাও-পোড়াও, হরতালের মতো সহিংস কর্মসূচিতে যাবে না। শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হবে।
সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি দাবির বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে ১১–দলীয় ঐক্য।
জোটের সংশ্লিষ্ট নেতারা প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর ১১–দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে সাড়া মিলেছে। কিন্তু সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তাই দাবিগুলো সামনে রেখে জোটের আরও বড় কর্মসূচির দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ধারাবাহিক কর্মসূচিগুলোতে মানুষের সাড়া পাওয়া গেলেও সরকার এখনো দাবিগুলো বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ কারণে আন্দোলনকে নতুন ধাপে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। লংমার্চ, মহাসমাবেশসহ বেশ কিছু কর্মসূচির প্রস্তাব রয়েছে। জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলে সেগুলো পর্যায়ক্রমে ঘোষণা করা হবে।