
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গণভোট বিষয়ে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একই দিনে জাতীয় নির্বাচনের ভোট ও গণভোট দুটি ভোট দিয়েছিলেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারণাকালে গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দিতে বলেছিলেন। এর মানে তিনি গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। এই হ্যাঁ ভোট দেওয়ার অর্থ জুলাই সনদের সব সংস্কারের পক্ষে হ্যাঁ বলা।’
প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আপনি কি আপনার দেওয়া ভোটের ফলাফলকে অস্বীকার করবেন? তাহলে আপনি দাঁড়িয়ে বলেন, “না, আমি ১২ ফেব্রুয়ারিতে হ্যাঁ ভোট দিইনি।” তা-ই আপনি বলেন। তাহলেই জাতি বলবে না আপনি দ্বিচারিতা করেননি, প্রতারণা করেননি।’
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথাগুলো বলেন।
অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জ্বালানিসংকট নিরসনের দাবিতে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এ কর্মসূচির আয়োজন করে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর মতো গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে বলেছিলেন। পাঁচ কোটি মানুষ ভোট দিয়ে হ্যাঁ–কে জয়যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে বিএনপির দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) খারিজ করে দিয়েছে।
বিএনপি রাজনীতিতে সংকট তৈরি করেছে অভিযোগ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘রাজনীতিতে এই সংকট কে তৈরি করল, সারা দেশবাসী জানে। এই সংকট তৈরি করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। ফলে বিএনপির তৈরি করা সংকট বিএনপিকেই নিরসন করতে হবে। বিএনপিকেই সমাধান করতে হবে।’
সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে চলমান সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, বিএনপি যেন জুলাই সনদ মেনে নেয়। গণভোটের ফলাফল কার্যকর করার জন্য সংবিধান সংস্কারের পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে। সেই অধিবেশনে আলোচনা করে এই সনদকে আইনে পরিণত করে সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে। তাহলেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন শেষ হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, ‘আজকে যেমন আপনি (প্রধানমন্ত্রী), আপনার মন্ত্রীরা বলছেন গণভোট অবৈধ, অর্ডিন্যান্স জারি করে গণভোট বাতিল করছেন, তার অর্থ হলো আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভোটকে বাতিল করার জন্য অর্ডিন্যান্স আনা হয়েছে পার্লামেন্টে। এই গণভোট বাতিল করার অর্থ আপনার ভোটকে বাতিল করা। তাহলে আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে আপনি সেদিন হ্যাঁ ভোটে পক্ষে ভোট দেননি। তা না হলে আমরা ধরে নেব, আপনার দেওয়া ভোটকে আপনি অস্বীকার করছেন।’
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দলকে রাজপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অভিযোগ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল আবার জনগণের কাছে ফিরে এসেছে। বিলম্ব না করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
বিএনপিকে আবার জাতির কাছে ফিরে আসতে হবে উল্লেখ করে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, ‘কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা, কোনো পুলিশ, কোনো র্যাব, কোনো পরাশক্তি কিন্তু জুলাই-আগস্টের বিপ্লবকে ঠেকাতে পারেনি। ওই সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন না। আপনারা সেই ফ্যাসিবাদের ধিকৃত, নিন্দিত পথের দিকেই হাঁটছেন, যে পথে তারা (আওয়ামী লীগ) গিয়েছিল। আপনাদের যাত্রা দেখে মনে হয় সেই অপরিণামদর্শী পথে আপনারা রওনা করেছেন। সময় থাকতে ফিরে আসুন। এখনো পাঁচ বছরের এক-দেড় মাস গিয়ে পারেনি। জাতির মুখোমুখি হবেন না। গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চলে যাবেন না। তাহলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, বিএনপির ভাষায় গণভোট অবৈধ। তেমনটি হলে নির্বাচনের আগে গণভোটে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন কেন, সেটি প্রশ্ন থেকে যায়। এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারা গণভোট মানতে চায় না। তাদের এই দ্বিচারিতা জনগণ বুঝে ফেলেছে। ১১ দল গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেই ঘরে ফিরবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। এখন তারা ৫১ শতাংশের ম্যান্ডেট নিয়ে ৭০ শতাংশের ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী বিএনপিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ করতে হবে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বলেন, বিএনপি এখন জনরায়কে অস্বীকার করছে। তারা আওয়ামী লীগের পথে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে, এটা তরুণ সমাজ মানবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
বিএনপিকে ৫ আগস্টের কথা স্মরণ করার পরামর্শ দিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দল রাজপথে উত্তাপ তৈরি করতে নয়, সংসদে সমাধান চায়। তবে সরকারি দল তাদের রাজপথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে জনগণ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ রুখে দিয়েছিল, তারা আরেকটি জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সব ষড়যন্ত্র রুখে দেবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ প্রমুখ।