বিএনপি (বাঁয়ে) ও জামায়াতের লোগো
বিএনপি (বাঁয়ে) ও জামায়াতের লোগো

সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গায় বিএনপিকে চাপে রাখতে চায় জামায়াত

জাতীয় সংসদকে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চায় জামায়াতে ইসলামী। তবে দলটি শুধু সংসদীয় বিতর্ক, নোটিশ কিংবা ওয়াকআউটের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো ইস্যু সামনে রেখে রাজপথেও চাপ বাড়াতে চায় তারা। দলটির লক্ষ্য—সংসদ ও মাঠ—দুই জায়গা থেকেই বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিক চাপে রাখা। তাদের কর্মসূচিতে ধর্ষণ, খুন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও আধিপত্য, চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাবে।

জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এমন চিন্তা-পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা গেছে।

গণভোটকে ঘিরেই বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সূত্রপাত। ওই গণভোটে সংবিধান–সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়লেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত।

বিএনপি সরকার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে—সংসদে এবং মাঠের কর্মসূচিতে জামায়াত জোরালোভাবে বিষয়টি সামনে আনতে চায়। তারা অতীতের মতো কেবল সংসদ বর্জন বা প্রতীকী প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংসদীয় বিতর্ক, ওয়াকআউট ও মাঠের আন্দোলন—সবকিছু একসঙ্গে চালাতে চায়।

জামায়াত দলীয় প্রশাসক বাদ দিয়ে দ্রুত নির্বাচন এবং সেই নির্বাচনে এসব প্রশাসককে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে। দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন জামায়াতের এজেন্ডায় রয়েছে। দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান দলীয় প্রশাসকেরা যাতে এই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, সরকারকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

গণভোটকে ঘিরেই বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সূত্রপাত। ওই গণভোটে সংবিধান–সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়লেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত।

তবে জামায়াতের কোনো কোনো নেতা মনে করেন, সরকারি দলকে যৌক্তিক সমালোচনার মাধ্যমে চাপে রাখতে তাঁদের আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে।

সংসদ কেন্দ্রবিন্দুতে

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির তিনজন নেতার কাছে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, দলের অভ্যন্তরে কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে, সামনে তাদের পরিকল্পনা কী? তাঁরা জানিয়েছেন, সংসদে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজেদের ভূমিকা, সাফল্য-সীমাবদ্ধতা এবং আগামী রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নিয়মিতই অনানুষ্ঠানিক অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা করেন তাঁরা। সেসব পর্যালোচনায় সংসদকে মূল গুরুত্বের জায়গায় রাখার বিষয়টি উঠে আসে। সামনের দিনগুলোতেও সংসদ একই গুরুত্ব পাবে বলে জানান তাঁরা।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সংসদে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বক্তব্য তুলে ধরা এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সক্রিয় থেকেছেন জামায়াতের সদস্যরা।

তবে জামায়াতের কোনো কোনো নেতা মনে করেন, সরকারি দলকে যৌক্তিক সমালোচনার মাধ্যমে চাপে রাখতে তাঁদের আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার মূল জায়গা হলো মূলত তিনটি। সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে সমালোচনা ও সংশোধনের জন্য তুলে ধরা, আইনপ্রণেতা হিসেবে ভূমিকা রাখা এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া। এই তিনটি বিষয়ে বিরোধী দল তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করেছে। সংসদীয় নীতি অনুযায়ী ওয়াকআউট হলো বড় প্রতিবাদ। বিরোধী দল সেটি করেছে। বেশির ভাগ বিষয়ে বিরোধী দল সরব ছিল। সামনের দিনগুলোতেও সংসদ গুরুত্ব পাবে।

সংসদে জামায়াত দলীয় নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম। তাঁর মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন দাবি এবং সংস্কার–সংশ্লিষ্ট কিছু অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদে জামায়াত যৌক্তিকভাবে ওয়াকআউট করেছে।

আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের লক্ষ্য সংসদকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। জামায়াত অতীতের বিরোধী দলের মতো শুধু সংসদ বর্জন করেই দায়িত্ব শেষ করবে না। সংসদে সরকারি দলের সমালোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিবাদে রাজপথে থাকবে—এ নীতি ঠিক রেখেছে জামায়াত।

১৬ মে রাজশাহীতে, ১৩ জুন চট্টগ্রামে, ২০ জুন খুলনায়, ২৭ জুন ময়মনসিংহে, ১১ জুলাই রংপুরে, ১৮ জুলাই বরিশালে এবং ২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ হবে। এসব সমাবেশে সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় শহর ও জেলাকে সম্পৃক্ত করা হবে। সবশেষে আগামী অক্টোবরে রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে।

বিভাগীয় সমাবেশ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ

সংবাদ সম্মেলনে সমাবেশ-মহাসমাবেশের কর্মসূচি দেয় ১১–দলীয় ঐক্য। কথা বলছেন ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ

সংসদে সংস্কারের বিষয়ে সমাধান না হলে দাবি আদায়ে মাঠের কর্মসূচি জোরালো করা হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে মাঠের কর্মসূচি চলমান রেখেছে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১–দলীয় ঐক্য। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল কয়েক মাসব্যাপী কর্মসূচি দিয়েছে তারা। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১৬ মে রাজশাহীতে, ১৩ জুন চট্টগ্রামে, ২০ জুন খুলনায়, ২৭ জুন ময়মনসিংহে, ১১ জুলাই রংপুরে, ১৮ জুলাই বরিশালে এবং ২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ হবে। এসব সমাবেশে সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় শহর ও জেলাকে সম্পৃক্ত করা হবে। সবশেষে আগামী অক্টোবরে রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে।

১১-দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির বাইরে দলগুলো দলীয় ব্যানারে মতবিনিময়, সেমিনার, বিক্ষোভ, সমাবেশসহ আলাদা কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংবিধান ও রাজনৈতিক সংস্কার-সংক্রান্ত আলোচনাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চিন্তা রয়েছে তাঁদের। তাঁরা মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ ও জনজীবনের সংকট নিয়ে জনগণের উদ্বেগ বাড়ছে। তাই এসব ইস্যুতে তাঁরা ধারাবাহিক অবস্থান নিতে চান।

এ ছাড়া রাজপথের কর্মসূচিকে আরও জোরালো করতেও বেশ কিছু পরিকল্পনা করছে জামায়াত। পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আদর্শিক মিল না থাকলেও গণ-অভ্যুত্থান ও সংস্কার বিষয়ে নীতিগতভাবে জামায়াতের সঙ্গে একমত—এমন অনেক দলের সঙ্গেই তাদের যোগাযোগ রয়েছে। তবে তারা এখনই ১১ দলের সঙ্গে যুক্ত হবে না, নিজেদের মতো করে কর্মসূচি পালন করবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। সরকার মেনে না নিলে আরও জোরদার কর্মসূচি দেওয়া হবে।

ছায়া মন্ত্রিসভা

প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জামায়াত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। সেই মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শেষ করে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এখন শীর্ষ নেতৃত্বের প্রস্তাব অনুযায়ী কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ছায়া মন্ত্রিসভা প্রকাশ্যে আসবে বলে জামায়াত সূত্র জানিয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। আরও সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। এখন এটি জামায়াত আমিরের এখতিয়ারে। তিনি সব প্রস্তুতি শেষে সুবিধাজনক সময়ে সেটি প্রকাশ করবেন।

সব মিলিয়ে জামায়াত এখন বিরোধী রাজনীতির নতুন কৌশল সাজাচ্ছে—সংসদে সরব থাকা, রাজপথে চাপ তৈরি করা এবং ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে নিজেদের বিকল্প অবস্থান তুলে ধরা। তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দলটি সংসদীয় ভূমিকা, ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি ও জনসম্পৃক্ত ইস্যুগুলোর মধ্যে কতটা বাস্তবসম্মত সমন্বয় করতে পারে, তার ওপর।