টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে মতবিনিময় সম্পর্কে জামায়াত আমিরের বাসভবনের ফটকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ২ সেপ্টেম্বর
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে মতবিনিময় সম্পর্কে জামায়াত আমিরের বাসভবনের ফটকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ২ সেপ্টেম্বর

জামায়াতের প্রতিবাদ হবে ‘নন-ভায়োলেন্ট’: টেলিভিশন কর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে শফিকুর রহমান

সরকারের সব ভালো কাজে জামায়াতে ইসলামী সহযোগিতা করবে আর জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো কাজে বিরোধিতা করবে। তবে সেই বিরোধিতা বা প্রতিবাদ হবে নন-ভায়োলেন্ট (অহিংস), গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল।

দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে এ অবস্থানের কথা জানিয়েছেন দলের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে নিজের সরকারি বাসভবনে দেশের ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন শফিকুর রহমান। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত আলোচনা হয়। পরে বাসভবনের ফটকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

মতবিনিময় সভায় আলোচনা সম্পর্কে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সভায় শুরুতেই সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। এরপর সমাজে বিরাজমান জনদুর্ভোগ সম্পর্কে একে একে তিনি কথা বলেছেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় রাজনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা তিনি আলোচনায় তুলে ধরেছেন। সে ক্ষেত্রে সংসদ ও বাইরে জামায়াতের প্রকাশ্য ও আন্তরিক ভূমিকার কথাও তিনি বারবার বলেছেন।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস ও দলীয়করণের বিষয়গুলো গণমাধ্যমের শীর্ষ নির্বাহীদের দৃষ্টিতে আনা হয়েছে উল্লেখ করে গোলাম পওয়ার বলেন, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশন ছাড়াও যে জনমত তৈরি, জাতীয় সচেতনতা ও ঐক্য সৃষ্টি এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সামনে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়টি বিরোধীদলীয় নেতা উল্লেখ করেছেন। কোনো ভালো পরামর্শ, দলের কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তাঁদের খোলামেলা বলতে অনুরোধ করা হয়েছে।

জামায়াত আমিরের বক্তব্যের পর সাংবাদিকেরা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। এ বিষয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বিভিন্ন পরামর্শের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের নির্বাহীদের পক্ষ থেকে তাঁদের পেশায় বিরাজমান সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদপত্রে যেসব সুবিধা অন্তত আছে, তা ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে নেই। সেখানে বেতনকাঠামো, ওয়েজ বোর্ড ও কাঠামোগত কোনো অবস্থান নেই। পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলে ধরা হয়। জামায়াত আমির আশ্বস্ত করেছেন, ‘আপনারা একটা ম্যাচিউর ওয়েতে এটা নিয়ে আসুন, আমরাও এখানে ভূমিকা রাখব।’

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সাংবাদিকদের মধ্য থেকে আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, ভিন্নমত ছাড়াই গণভোটের রায় মেনে নিতে হবে, এটা জামায়াতের উচিত সকারকে পরিষ্কারভাবে বলা।

ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের নির্বাহীদের পক্ষ থেকে বর্তমান সংসদে জামায়াতের ভূমিকাকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ‘গঠনমূলক, শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে বলেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘রাজপথে আন্দোলন না করলেও হয়, একজনের পক্ষ থেকে এমন কথা এসেছে। জামায়াতের আমির বলেছেন, বাইরে আন্দোলন বা গণতান্ত্রিক কর্মসূচি, এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জামায়াত আমির আশ্বস্ত করেছেন, আমরা সব ভালো কাজে সহযোগিতা করব, জনস্বার্থবিরোধী কাজে বিরোধিতা করব সংসদের ভেতরে ও বাইরে। তবে আমাদের সেই বিরোধিতা বা প্রতিবাদ হবে নন-ভায়োলেন্ট (অহিংস), গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল।’

ব্রিফিং সঞ্চালনা করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। দলের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ২৪ আগস্ট সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জামায়াত আমির।

টেলিভিশনে ওয়েজ বোর্ডের জন্য ভূমিকা দাবি

মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ। ২ সেপ্টেম্বর

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের ব্রিফিংয়ের পর মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া গণমাধ্যম নির্বাহীদের কয়েকজনও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বেসরকারি সময় টেলিভিশনের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বাবু বলেন, দেশের গণমাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করছে। আলোচনায় তিনি গণমাধ্যমের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন।

টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড বা বেতনকাঠামো না থাকার কথা উল্লেখ করে সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘টেলিভিশনে ম্যানেজমেন্ট ইকোসিস্টেম ঠিক নয়, ফিন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম দুর্নীতিগ্রস্ত। টেলিভিশন আসলে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়ায়নি। সে ক্ষেত্রে আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা তাঁদের (জামায়াত আমির) বলেছি, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যেন তাঁরা সংসদে ও সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের পক্ষে ভূমিকা রাখেন।’

যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা অনেক ইতিবাচক কথা বলেছেন। আমরা বলেছি, দেশের টেলিভিশন কাঠামোগত দিক থেকে অনেক দুর্বল। গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে বিরোধী দলকে সংসদে কথা বলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে বিরোধী দল যেন সরকারের সঙ্গে আলাপ করে ও চাপ প্রয়োগ করে, সেটাও বলা হয়েছে।’

চ্যানেল ২৪–এর হেড অব নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জহিরুল আলম বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা গণমাধ্যমের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। গণমাধ্যমের নির্বাহীদের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের বক্তব্য যেন আরও গঠনমূলক ও কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী হয়, অর্থনীতি–রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের পরিকল্পনা বা রূপরেখা যাতে পরিষ্কার করে বলেন, জনগণের সমস্যা নিয়ে যেন তাঁরা সরকারের সঙ্গে কাজ করেন, জনজীবনে যাতে ভোগান্তি না হয়া, এসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন সুবিধা–অসুবিধার কথা শফিকুর রহমানকে অবহিত করা হয়েছে উল্লেখ করে জহিরুল আলম আরও বলেন, গণমাধ্যম যাতে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকরভাবে বিকশিত হতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।