জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১টি দলের যে ঐক্য জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে, নিকট ভবিষ্যতে তার রূপ কী হতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল রয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, এই ঐক্য গঠিত হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, নাম ছিল ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় এই ঐক্যের রূপ কী দাঁড়াবে, এটির ব্যাপ্তি কত দিন হবে, একই নামে থাকবে কি না—এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়।
সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সভায় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন প্রশ্ন করেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী ঐক্য আর কত দিন থাকবে? জবাবে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তাঁরা বলেন, মাত্রই সংসদ গঠিত হলো, এনসিপি এখন বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে।
৭৭টি আসন নিয়ে এখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল ১১-দলীয় ঐক্য। এর মধ্যে জামায়াতের সংসদ সদস্য ৬৮ জন। বাকি ৯ জনের মধ্যে ৬ জন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের দল এনসিপির সংসদ সদস্য। অন্য তিনজনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও একজন খেলাফত মজলিসের।
নির্বাচনের পর ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছে। সেদিনের পর ১৫ মার্চ প্রথম অধিবেশনের বৈঠক হয়। এরপর সংসদ অধিবেশন মুলতবি হয়েছে। ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ আবার অধিবেশন বসার কথা রয়েছে। আর সংসদের প্রথম অধিবেশন চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।
সংসদের প্রথম অধিবেশনের দুই দিনের বৈঠকে এরই মধ্যে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে আলাদাভাবে আলোচিত হয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণকে কেন্দ্র করে প্রথম দিনেই সংসদে বিরোধী দল যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেখানেও সামনের সারিতে ছিলেন নাহিদ ও হাসনাত। সংসদের বৈঠকে তাঁদের এই ভূমিকা দেখে পর্যবেক্ষকদের অনেকের মূল্যায়ন হচ্ছে, ১১ দলের সঙ্গে থেকেই বিরোধী দলে বর্তমান সংসদের বড় সময় নেতৃস্থানীয় অবস্থানে থাকতে পারে এনসিপি।
এমন মূল্যায়নের পেছনের কারণ হিসেবে আরও একটি বিষয় সামনে আনা হচ্ছে। সেটি হচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের চিফ হুইপ হিসেবে এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলামকে মনোনীত করা। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে নির্বাচনের মতো সংসদেও এনসিপিকে সঙ্গে রাখতে জামায়াতের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট। কিন্তু যদি এই ঐক্যকে আরও প্রলম্বিত করতে হয়, তাহলে এর নাম ও কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে।
ঈদের পর আলোচনা
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৫ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ১১ দলের নির্বাচনী ঐক্য ঘোষণার কথা ছিল। সেখানে ইসলামী আন্দোলনেরও থাকার কথা ছিল। দলটির আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের জন্য চেয়ারও রাখা হয়েছিল মঞ্চে।
কিন্তু ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এই ঐক্যে যোগ দেয়নি। পরে তাদের ছাড়াই জামায়াত-এনসিপিসহ ১০ দলের নির্বাচনী ঐক্য ঘোষণা করা হয় সেই রাতে। পরের দিন আলাদা নির্বাচন করার ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন।
অবশ্য এর এক সপ্তাহ পর ১০ দলের সঙ্গে যোগ দেয় বিএনপি জোট ছেড়ে আসা লেবার পার্টি। সেদিন থেকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ওই ঐক্য ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ নাম ধারণ করে। এই নামেই তারা গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। এই ঐক্য থেকে জামায়াতের ২২৪ জন ও এনসিপির ৩০ জন প্রার্থী হয়েছিলেন।
১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলেছেন, তাঁদের এই ঐক্যের ভিত্তি শুধু নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচারের ধারাবাহিকতা এবং দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁরা এক হয়েছেন।
এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের দুজন নেতা গত বুধবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ১১-দলীয় ঐক্যের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে বলে তাঁরা মনে করছেন না। কারণ, বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়। এর সঙ্গে বিচার ও আধিপত্যবাদের বিষয়টি যুক্ত। এ ছাড়া দুর্নীতিও অব্যাহত আছে। ফলে এই ঐক্য বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
অবশ্য ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নাম ও কাঠামো পরিবর্তন নিয়ে ঈদের পর আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন এনসিপির একজন নীতিনির্ধারক। তবে ওই নেতা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
একই ইঙ্গিত দিয়েছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির রাজনৈতিক লিয়াজোঁপ্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সংস্কার ও বিচারের বিষয়টি এখনো প্রাসঙ্গিক। সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপি ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। এসব বিষয়ে ১১ দল একসঙ্গে লড়বে। আবার প্রতিটি দলের আলাদা কর্মসূচিও থাকবে।