
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। সরকারের এক মাস হতে চলেছে। এ সময়ে সরকারের কার্যক্রম কেমন ছিল, তা নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের অভিমত।
সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এক মাস খুবই অপ্রতুল সময়। তার ওপর সাধারণভাবে একটি সরকারের বিদায়ের পর আরেকটি সরকার আসার যে পরিপ্রেক্ষিত, এবারের সরকারের ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন। এই সরকার এসেছে রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে। সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেশি, প্রত্যাশার ধরনও গতানুগতিক নয়। অন্যদিকে সরকারের অঙ্গীকারও বিশাল ও বহুমাত্রিক। ফলে সরকারের মূল্যায়নের জন্য এক মাস সময়টা খুবই অল্প।
অবশ্য শুরুর দিকের কাজ দেখে আগামীর দিনগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়।আমার মতে, সরকারের ইতিমধ্যে গৃহীত কার্যক্রম আশাজাগানিয়া, আবার কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগজনকও।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠন কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই জাতীয় সনদ ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে দেখা গেছে, সেটা আশা জাগায়। যেমন সংসদ সদস্যরা বিনা শুল্কে গাড়ি ও প্লটের মতো অযাচিত সুবিধা নেবেন না।
সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী, বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া ও খাল খনন। কৃষক কার্ড দেওয়া ও গাছ লাগানোর উদ্যোগও চলমান। দেখা যাচ্ছে, সরকার তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তৎপর। এগুলো দেশবাসীর মধ্যে একধরনের আশার সঞ্চার করছে।
এর বাইরে আরও ভালো দৃষ্টান্ত আছে। তেমনি নেতিবাচক প্রবণতাও আছে। যেমন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো প্রতিষ্ঠানে অপসারণ ও নিয়োগ। যে প্রক্রিয়ায় যে ধরনের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা আশা জাগায় না। তার মধ্যে একটি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিদায় ও নতুন গভর্নর নিয়োগ।
কর্তৃত্ববাদের সময় ব্যাংক খাতই ছিল লুটপাটের একটি বড় জায়গা। সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগ সুচিন্তিত ছিল না, সেটা বোঝা যায়। যদি চিন্তাভাবনা করে এ ধরনের নিয়োগ হয়ে থাকে, তাহলে সেটা উদ্দেশ্যমূলক কি না, সে প্রশ্ন উঠবে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার পদত্যাগ করেছেন। এটিকে অপসারণ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। এটা যেভাবে তড়িঘড়ি করে করা হয়েছে, তা খুব একটা ভালো বার্তা দিচ্ছে না। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে একচ্ছত্রভাবে দলের অনুগত শিক্ষকদের বেছে নেওয়া হয়েছে। একই লক্ষণ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও আমলাতন্ত্রে নিয়োগের ক্ষেত্রেও। এসব ঘটনা সরকারের আশা–জাগানিয়া দৃষ্টান্তগুলোর সঙ্গে মিলছে না; বরং তা ‘এবার আমাদের পালা’ চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামোয় একচ্ছত্র দলীয়করণের ঝুঁকিপূর্ণ পথরেখা।
সরকার দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের কথা বলেছে। সেটা মাথায় রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ আরও সুচিন্তিত হওয়া দরকার ছিল। মনে রাখতে হবে, সরকারপ্রধানের কাছ থেকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত আসছে। কিন্তু সুশাসিত ও দুর্নীতিমুক্তভাবে সরকার পরিচালনায় তিনি একা সফল হতে পারবেন না। যাঁদের নিয়ে তিনি কাজ করবেন, যাঁরা তাঁর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সমান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও তৎপর হওয়ার কথা, তাঁদের কাছ থেকে কিছু প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান আসছে। যেমন চাঁদাবাজিকে সমঝোতার লেনদেন হিসেবে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়াস। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখেও সেই অবস্থানে অটল থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানানো হয়নি, যেটা প্রয়োজন ছিল। আশা করেছিলাম, সরকারপ্রধান এ বিষয়ে তাঁর সহকর্মী বা দলের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দেবেন। তা হয়নি, যদিও সময় ফুরিয়ে যায়নি।
সরকারের অনেক ভালো অঙ্গীকার আছে। কোনোটাই সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না, যদি না দুর্নীতি প্রতিরোধকে সব কর্মসূচির মূলধারায় নিয়ে আসা না যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা আসতে পারে দলের অভ্যন্তর এবং প্রশাসন ও আমলাতন্ত্র থেকে। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনে সর্বোচ্চ প্রাধান্য না দিয়ে যদি বিক্ষিপ্তভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সর্বোচ্চ সদিচ্ছাপ্রসূত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারের প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ বা ব্যর্থতা যেমন জনগণকে হতাশ করবে, তেমনি প্রতিপক্ষের জন্য রাজনৈতিক ফায়দার সুযোগ তৈরি করে দেবে।
নতুন সংসদ যাত্রা শুরু করেছে। তবে গণভোট অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। এতে আমি অবাক হচ্ছি না। কারণ, শুরু থেকেই দেখা গেছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি নিজেদের পছন্দের বাইরের সংস্কার প্রস্তাবে ভিন্নমত দিয়েছে এবং তাতে তারা অটল থেকেছে, বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিমূলক সুপারিশের ক্ষেত্রে। বিএনপির বক্তব্য ছিল, ওই সব সংস্কার প্রস্তাব সরকারের হাত–পা বেঁধে দেবে, যা ক্ষমতার একচ্ছত্র ব্যবহারের পথে অন্তরায় প্রতিহত করার প্রয়াসের নামান্তর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হলেও তারা যা চাইত, তার বাইরে কিছু করা কঠিন হতো।
তা সত্ত্বেও মনে করি, সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিএনপির আছে। নির্বাচনে জনগণ তাদের সেই রায়ও দিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার, জুলাই জাতীয় সনদ এবং ১১টি কমিশনের সুপারিশে যেসব যুগান্তকারী সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, সরকার যেন সেগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সংস্কারকে এগিয়ে নেয়। কারণ, এসব সংস্কার কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের পুনর্বাসন প্রতিরোধের পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদের অন্যতম ভুক্তভোগী বিএনপি নিজেই।
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
*মতামত লেখকের নিজস্ব