
বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ইতিহাস তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটিকে খুঁজে নেয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার এক সংকট মুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমদ ঐতিহাসিক একটি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং সে দায়িত্ব যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছেন, তার কারণও ইতিহাসের ভেতরেই নিহিত। তিনি ইতিহাসে থাকবেন এবং ইতিহাসকে বুঝতে সাহায্য করবেন, সঙ্গী হবেন অগ্রগতির সংগ্রামে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা’য় এ কথা বলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ।
স্মারক বক্তব্যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর ভাষ্যে, অনুপস্থিত শেখ মুজিব ও সংগ্রামরত তাজউদ্দীনের মধ্যে যাতে কোনো ঐক্য না ঘটে, সে জন্য দুই দিক থেকে চেষ্টা চলেছিল। একদিকে ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, যিনি তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে আমেরিকানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। অন্যদিকে ছিল মুজিব বাহিনী, যারা বামপন্থীদের নেতৃত্বে আসা ঠেকাতে সংগঠিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিব বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য নয়, বরং বামপন্থীদের নেতৃত্ব যাওয়া ঠেকাতে গঠিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর যদি শেখ মুজিব দেশে ফিরতে না পারেন, তাহলে ক্ষমতা যেন বামপন্থীদের হাতে না যায়, এমন চিন্তা থেকেই মুজিব বাহিনী নিজেদের সংগঠিত করেছিল।
বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ইতিহাস তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটিকে খুঁজে নেয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার এক সংকট মুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমদ ঐতিহাসিক একটি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং সে দায়িত্ব যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছেন।সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ ও শেখ মুজিবের মধ্যে মতবিরোধের চারটি কারণ তুলে ধরেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রথমত, তাজউদ্দীন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছিলেন, কিন্তু ১৯৭২ সালে দালাল আইন পাসের পর শেখ মুজিব সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংক তথা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেওয়ার প্রশ্নে দ্বিমত দেখা দেয়। তৃতীয়ত, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের তাজউদ্দীনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হয়ে পরিবর্তে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়, যা নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। চতুর্থত, একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
বক্তব্যে তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, বিশেষত ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, যে অল্প কয়েকজন রাজনীতিকে সার্বক্ষণিক কাজ ও চিন্তা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তাজউদ্দীন ছিলেন তাদের অন্যতম। ভেতরের সংবেদনশীলতা, কর্তব্যজ্ঞান আর দায়িত্ববোধের তাড়না থেকে রাজনীতিতেই যোগ দেন তিনি।
তাজউদ্দীন আহমদ যে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের মতো সাংগঠনিক শক্তি বা উপযুক্ত নেতৃত্ব তিনি তাঁর চারপাশে খুঁজে পাননি বলেও মনে করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর মতে, এ কারণেই রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিকে তিনি একরকম একাকী হয়ে পড়েছিলেন।
তবে তাজউদ্দীন আহমদ যে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের মতো সাংগঠনিক শক্তি বা উপযুক্ত নেতৃত্ব তিনি তাঁর চারপাশে খুঁজে পাননি বলেও মনে করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর মতে, এ কারণেই রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিকে তিনি একরকম একাকী হয়ে পড়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মা। আর বাংলাদেশ তার সন্তান। সেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা ছিল বিশাল। তিনি মনে করেন, তাজউদ্দীন আহমদকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হবে।
শারমিন আহমদ আশা প্রকাশ করেন, একদিন বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজনেই তাজউদ্দীন আহমদকে খুঁজে নেবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মেহেদী হাসান খান। এতে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের একজন শিক্ষার্থীকে শান্তি স্বর্ণপদক এবং দুজনকে মেধাবৃত্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়া হয়।