
বিএনপির প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদ নেবে কি না, বিষয়টি এখনো স্পষ্ট করেনি জামায়াতে ইসলামী।
আগামীকাল ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন সামনে রেখে আজ বুধবার জামায়াতসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর ডেপুটি স্পিকার পদের বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই সনদেই আছে যে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিস মিল; পুরোটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি।’
প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘সরকার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কথা বলেছে। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই, জুলাই সনদের সংস্কারের প্রস্তাবগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। এর আলোকে বিরোধী দলের যতটুকু পাওনা, আমরা ততটুকু চাই, এর বেশি চাই না।’
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংসদ সদস্য—দুটি শপথই নিয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত সরকারি দল প্রথম শপথটি নেয়নি।’
ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আসুন জুলাইকে সম্মান করি। চব্বিশ থাকলেই ছাব্বিশ হবে, নইলে ছাব্বিশের অস্তিত্ব থাকে না। চব্বিশকে অমান্য বা অগ্রাহ্য করে পাশ কাটিয়ে ছাব্বিশ জাতির জন্য কোনো সুখবর নয়। আমরা আশা করতে চাই, সরকারি দল এই কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করবে।’
দেশের ৬৯ ভাগ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এর পক্ষে ভূমিকা রেখে যাব এবং আমরা চাইব যে চারটি বিষয় গণভোটে দেওয়া হয়েছিল, তার সবগুলো হুবহু গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক।’
সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে জামায়াত কী ভূমিকা নেবে, জানতে চাইলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক আলাপ-আলোচনা করেছি এ ব্যাপারে। কালকে আমাদের ভূমিকা দৃশ্যমান আপনারা দেখবেন। যেমন সূর্য উঠবে, তেমন ভাষণ শুনবেন এবং আমাদের ভূমিকাও দেখবেন।’
‘সব ব্যাপারে বিরোধিতা নয়’
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার সভাকক্ষে আজ সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন জামায়াতের ৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৬ জনসহ সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা। পরে সংসদের এলডি হলে বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান।
একটা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘সব ব্যাপারে বিরোধিতা নয়, আবার না বুঝেও কোনো সহযোগিতা নয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারি দলের গৃহীত সব সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব। ভুল করলে প্রথমে আমরা সেই ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব৷ যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াব।’
সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সরকার কোনো কিছু করতে চাইলে সেটা তারা পারবে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, কিন্তু যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য উত্তম।
‘আমরা সিরিয়াসলি ধারণ করি চব্বিশকে’
জামায়াতের আমির বলেন, এই সংসদটা হঠাৎ করে এভাবে হয়নি, একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালে গঠিত সংসদ প্রথম তার মেয়াদ পূর্ণ করে। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এই সুযোগ এসেছিল। ২০০৮ সালে গঠিত সংসদও মেয়াদ পূর্ণ করেছিল। বাকি যেগুলো হয়েছে, সেগুলোকে জনগণ নির্বাচন হিসেবে দেখে না, মানে না। এর কোনো নৈতিক বৈধতা ছিল না। এরপর এ নির্বাচন তো ২০২৬ সালে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান মানলে এ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। এটা ২০২৬ সালে হয়েছে চব্বিশের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে।
এ প্রসঙ্গে চব্বিশে অনেক মানুষের শাহাদাতবরণ, আহত হওয়া, পঙ্গুত্ববরণ এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে খুন, গুম, আয়নাঘরে নির্যাতন ও কারাবরণের কথা উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান।
১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালকে জাতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’ উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘এই টার্নিং পয়েন্টগুলাকে যেমন আমরা ধারণ করি, আমরা সিরিয়াসলি ধারণ করি চব্বিশকে।...জুলাই যোদ্ধাদের মূল স্লোগান ছিল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”। আমরা সব ক্ষেত্রে সুবিচার চাই, বৈষম্যহীন একটি সমাজ চাই।’
এই সমাজ গড়ার জন্যই এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে আরেকটা নির্বাচন হয়েছে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেটা হচ্ছে সংস্কার পরিষদের নির্বাচন। যে অর্ডিন্যান্সের কারণে সংসদ নির্বাচন হয়েছে, একই অর্ডিন্যান্স বলেছে দুটি নির্বাচন একই দিনে হবে। একটা সংস্কার বিষয়ে জনগণের মতামত গণভোট, আরেকটা সংসদ নির্বাচন। ফলাফল যেটা হয়েছে, সেটা সবাই দেখেছেন। আমরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দুটি ফলাফলই মেনে নিয়েছি। ফলে একটি নির্বাচনকে আরেকটির থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দুটি একটি আরেকটির পরিপূরক।’
জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এই সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। দলের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন৷