সবচেয়ে বেশি আয় ও সম্পদের মালিক এনায়াত উল্লা।
সবচেয়ে প্রবীণ মিজানুর রহমান ও আব্দুল হামিদ মোল্লা।
সবচেয়ে নবীন আমির হামজা, ৩৩ বছর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২৪ আসনে প্রার্থী রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। এর মধ্যে ২০১ জন উচ্চশিক্ষিত। জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক বা আগে শিক্ষকতা করেছেন। ব্যবসায়ীর সংখ্যাও কাছাকাছি। দলের প্রার্থীদের মধ্যে কোটি টাকার বেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১১২ জনের।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এবারের হলফনামায় প্রার্থীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, মামলার তথ্য, আয়, সম্পদসহ ১০ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২২৪টি আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। তবে ‘১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’ থাকা অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে—এমন কিছু আসনেও জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে। সমঝোতার কারণে কিছু আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা সরে দাঁড়াতে পারেন। তবে তাঁদের নাম ব্যালটে থাকবে।
উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী ২০১ জন
জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ২২৪ প্রার্থীর মধ্যে ২০১ জন উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ তাঁরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান অথবা পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী রয়েছেন ১০ জন।
জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে এইচএসসি পাস সাতজন ও এসএসসি পাস পাঁচজন। মাধ্যমিকের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা একজনের। দুজন প্রার্থী নিজেদের স্বশিক্ষিত ও সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। আট প্রার্থীর হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য অস্পষ্ট।
জামায়াতের পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন পটুয়াখালী-২ আসনের শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঝালকাঠি-১ আসনের ফয়জুল হক, ঢাকা-৬ আসনের আব্দুল মান্নান, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া, জামালপুর-২ আসনের ছামিউল হক, কুমিল্লা-৫ আসনের মোবারক হোসাইন, কুমিল্লা-৯ আসনের ছৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দীন ছিদ্দীকি ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের রেজাউল করিম। জামায়াতের ‘স্বশিক্ষিত’ বা সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন দুই প্রার্থী হলেন ঢাকা-৭ আসনের এনায়াত উল্লা ও বরিশাল-১ আসনের মাওলানা কামরুল ইসলাম খান।
জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ২২৪ প্রার্থীর মধ্যে ২০১ জন উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ তাঁরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান অথবা পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী রয়েছেন ১০ জন।
সবচেয়ে প্রবীণ মিজানুর রহমান ও আব্দুল হামিদ
জামায়াতের প্রার্থীদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২২৪ প্রার্থীর মধ্যে ১৪৩ জনের বয়স ৫০-এর বেশি। অন্যদিকে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী কোনো প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়নি জামায়াত। আবার ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী প্রার্থী মাত্র ১২ জন। ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ৬২ জন। ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৭০ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৫৬ জন ও ৭০ বছরের বেশি বয়সী ১৭ জন। সাতজনের তথ্য হলফনামায় পাওয়া যায়নি অথবা অস্পষ্ট।
জামায়াতের ২২৪ প্রার্থীর মধ্যে ৭৫ জন নিজেদের পেশা হিসেবে শিক্ষকতা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন বা আগে শিক্ষক ছিলেন। ৬৯ জন নিজের পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, কেউ কেউ একাধিক পেশার কথা উল্লেখ করেছেন।
হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জামায়াতের সবচেয়ে প্রবীণ দুজন প্রার্থীর বয়স ৭৭ বছর—ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের মিজানুর রহমান ও গোপালগঞ্জ-১ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ মোল্লা। সবচেয়ে কম বয়সী কুষ্টিয়া-৩ আসনের আমির হামজা। তিনি হলফনামায় বয়স উল্লেখ করেছেন ৩৩ বছর ২ মাস। আমির হামজা ধর্মীয় বক্তা।
শিক্ষক ৭৫, ব্যবসায়ী ৬৯
জামায়াতের ২২৪ প্রার্থীর মধ্যে ৭৫ জন নিজেদের পেশা হিসেবে শিক্ষকতা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন বা আগে শিক্ষক ছিলেন। ৬৯ জন নিজের পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, কেউ কেউ একাধিক পেশার কথা উল্লেখ করেছেন। সে ক্ষেত্রে হিসাবের সুবিধার জন্য প্রথমে যে পেশার নাম তিনি লিখেছেন, সেটাকেই তাঁর মূল পেশা হিসেবে ধরা হয়েছে।
দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের মধ্যে নিজের পেশার ঘরে ২৬ জন আইনজীবী, ১৬ জন চিকিৎসক, ১৪ জন কৃষক, ১১ জন বর্তমান বা সাবেক চাকরিজীবী ও ৩ জন রাজনীতিবিদ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য পেশার কথা উল্লেখ করেছেন ৭ জন। হলফনামায় পেশার তথ্য দেননি অথবা অস্পষ্ট ৩ জনের।
হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন কোটি টাকার বেশি আয় করেন। ৫১ থেকে ৯৯ লাখ টাকার ঘরে আয় ৩ জনের। ৩১ থেকে ৫০ লাখ টাকার ঘরে আয় ৭ জনের। ২১ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয়ের ঘরে ৮ জন। বছরে ২০ লাখ টাকার কম আয় ৩৯ জনের। আর ১০ লাখ পর্যন্ত আয় ১৫৪ জনের। তথ্য অস্পষ্ট অথবা দেননি ৮ জন।
হলফনামায় তিনজন প্রার্থী নিজেদের পেশা হিসেবে রাজনীতির কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একজনের পেশা শুধুই রাজনীতি। আর রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা ও বই লেখার কথা উল্লেখ করেছেন দুজন। জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের প্রার্থী মুজিবুর রহমান রাজনীতির পাশাপাশি বই লেখাকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসাকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান।
আর জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের প্রার্থী আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম পেশা হিসেবে শুধু রাজনীতি উল্লেখ করেছেন। পেশা হিসেবে জামে মসজিদের খতিব উল্লেখ করেছেন ভোলা-২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফজলুল করিম।
১৫৪ জনের বছরে আয় ১০ লাখের নিচে
হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন কোটি টাকার বেশি আয় করেন। ৫১ থেকে ৯৯ লাখ টাকার ঘরে আয় ৩ জনের। ৩১ থেকে ৫০ লাখ টাকার ঘরে আয় ৭ জনের। ২১ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয়ের ঘরে ৮ জন। বছরে ২০ লাখ টাকার কম আয় ৩৯ জনের। আর ১০ লাখ পর্যন্ত আয় ১৫৪ জনের। তথ্য অস্পষ্ট অথবা দেননি ৮ জন।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক আয় সবচেয়ে বেশি ঢাকা-৭ আসনের প্রার্থী এনায়াত উল্লার। তিনি বছরে আয় দেখিয়েছেন ৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তিনি ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) ২০২৩-২৫ মেয়াদে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে তিনি পরিচালক (অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ) হয়েছিলেন। এনায়াত উল্লা পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির বর্তমান সভাপতি।
জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম আয় দেখিয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী মো. রমজান আলী। তিনি হলফনামায় বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৫ হাজার টাকা। জামায়াতের এই প্রার্থী হলফনামায় পেশা হিসেবে কৃষি উল্লেখ করেছেন। যদিও ২০২৫-২৬ করবর্ষে দেওয়া আয়কর রিটার্নে রমজান আলী বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী রেজাউল করিম হলফনামায় পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন সাংবাদিকতা ও লেখালেখি। তবে আয়ের ঘর তিনি ফাঁকা রেখেছেন। যদিও আয়কর রিটার্নে তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে, ৭ লাখ টাকা। তিনি দলটির ঢাকা মহানগর উত্তর সেক্রেটারি।
ঢাকা-১ আসনের প্রার্থী মোহাম্মাদ নজরুল ইসলাম নিজের পেশা হিসেবে ‘আইনজীবী’ উল্লেখ করেছেন। আয়ের উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে, ‘জমি বিক্রয়’। যদিও তাঁর আয় কত, সেটি উল্লেখ করেননি। তবে আয়কর রিটার্নে নজরুল ইসলামের বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৬০ লাখ টাকার বেশি।
কোটিপতি ১১২ জন
জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে কোটি টাকার বেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১১২ জনের। সবচেয়ে বেশি সম্পদ দেখিয়েছেন ঢাকা-৭ আসনের প্রার্থী এনায়াত উল্লা। তিনি দেখিয়েছেন প্রায় ১১৬ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। এ ছাড়া ঋণও তাঁর বেশি, প্রায় ৮৩ কোটি টাকা।
এনায়াত উল্লা সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর এ সম্পদ ও ঋণ মূলত ব্যবসার। পণ্য যখন আসে, তখন ঋণ বেড়ে যায়, আবার কমে। ব্যবসার ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক।
জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম সম্পদ দেখিয়েছেন মাদারীপুর-৩ আসনের প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম মৃধা। তিনি হলফনামায় লিখেছেন, তাঁর মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে মাত্র দেড় লাখ টাকার।
উল্লেখ্য, হিসাব করার ক্ষেত্রে প্রার্থীর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ধরা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এটা না থাকায় যে মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা-ই ধরা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থী কিছু সম্পদের কোনো মূল্য উল্লেখ করেননি, তা বাদ রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সম্পদ অথবা আয়ের তথ্য অস্পষ্ট থাকায় আয়কর বিবরণী থেকে নেওয়া হয়েছে।