প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার সকালে রাজধানীর হেয়ার রোডে সরকারি বাসভবনে
প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার সকালে রাজধানীর হেয়ার রোডে সরকারি বাসভবনে

বিশেষ সাক্ষাৎকার: মির্জা ফখরুল ইসলাম

শেখ হাসিনার চলে যাওয়া অলৌকিক মনে হচ্ছিল

ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের। গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি হচ্ছে আগামী বুধবার। দিনটি সামনে রেখে প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি সেলিম জাহিদ

প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে আপনি কোথায় ছিলেন? সেদিনই শেখ হাসিনা সরকারের পতন হতে যাচ্ছে—এমন আভাস পেয়েছিলেন?

মির্জা ফখরুল: আমি বাসাতেই ছিলাম। আগে থেকেই ছাত্রদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল এবং বেশ ধারাবাহিকভাবেই চলছিল। আমার সময়টা ঠিক মনে নেই। সম্ভবত ১১টার দিকে আমাদের জেনারেল আকবর (অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর) উনি আমাকে ফোন করে জানালেন যে চিফ (সেনাপ্রধান) আপনাকে ফোন করবেন, আপনি ধরবেন।

তারপর বোধ হয় ১২টার দিকে চিফ ফোন করলেন, বললেন যে আমি একটু আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে চান, আমি সে বিষয়টা নিয়ে একটু আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই—তারপর কী হবে।

আমি বললাম, আপনি আর কাকে কাকে ডাকছেন। উনি বললেন যে তিনি বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলকে ডেকেছেন। এরপর আমি বললাম, এখন তো বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। গাড়ি তো চলবে না, এখন রাস্তায় সব মানুষ। উনি বললেন, আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

এরপর উনি একজন অফিসারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। আমাকে পাঠিয়েছেন, আব্বাস (মির্জা আব্বাস) সাহেবকেও। এই সময়টাতে আমি আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি লন্ডনে—আমরা কী আলোচনা করব, কত দূর যেতে পারি না পারি। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে নেওয়ার পর আমরা যাই। যাওয়ার পর তো অন্য পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর সঙ্গে আলাপ হলো। কথা উঠেছিল যে ন্যাশনাল গভর্নমেন্টের।

শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। ৫ আগস্ট, ২০২৪
প্রশ্ন

আপনি বলেছেন ১২টার দিকে সেনাপ্রধানের সঙ্গে আপনার কথা হয়, কার মাধ্যমে হয়েছিল সেটাও বলেছেন। বৈঠকের বিষয় ও অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে কি আপনাকে আগে কিছু জানানো হয়েছিল?

মির্জা ফখরুল: না। তখন তো মানুষ গণভবনের দিকে যাচ্ছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিস্ফোরণোন্মুখ। তখন এজেন্ডা ঠিক করবেন কোত্থেকে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন, সেটা সেনাপ্রধানকে জানানো হয়েছে। এখন আমরা (রাজনৈতিক দলগুলো) কী করব। ওখানে আলোচনা করি, এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়।

প্রশ্ন

সেনাসদরে গিয়ে কী পরিস্থিতি দেখলেন?

মির্জা ফখরুল: সেনাসদরে গিয়ে আমরা দেখলাম, তিন বাহিনীর প্রধানেরা আছেন, আমাদের আগেই জাতীয় পার্টি এসেছিল। জি এম কাদের ছিলেন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু—এই তিনজন ছিলেন। তারপর জামায়াত এল। জামায়াতের শফিকুর রহমান সাহেব ছিলেন, যত দূর মনে পড়ে আজাদ (হামিদুর রহমান আজাদ) সাহেব ছিলেন।

না। তখন তো মানুষ গণভবনের দিকে যাচ্ছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিস্ফোরণোন্মুখ। তখন এজেন্ডা ঠিক করবেন কোত্থেকে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন, সেটা সেনাপ্রধানকে জানানো হয়েছে। এখন আমরা (রাজনৈতিক দলগুলো) কী করব। ওখানে আলোচনা করি, এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়।
প্রশ্ন

আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল?

মির্জা ফখরুল: আলোচনা হচ্ছে এখন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন, আমরা এখন কী করতে পারি? এই হচ্ছে কথা।

প্রশ্ন

তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারা ভূমিকা রাখছিলেন?

মির্জা ফখরুল: ওখানে মান্না (মাহমুদুর রহমান মান্না) সাহেব ছিলেন, সাকি (জোনায়েদ সাকি) সাহেব ছিলেন। এরপর ইসলামি দলগুলোর দু-একজন করে আসছিলেন। মাওলানা মামুনুল হক সাহেব ছিলেন। ছাত্রনেতাদের তখন পর্যন্ত কেউ ছিল না। পরে শুনলাম যে ওরা এখানে আসবে না। ওদের কাছে যেতে হবে। তখন ন্যাশনাল গভর্নমেন্টের (জাতীয় সরকার) প্রশ্ন এল। কিন্তু আমরা তো এর আগেই আমাদের পার্টি প্রধানের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করেছি যে আমরা ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের (অন্তর্বর্তী সরকার) কথা বলব। আমরা ন্যাশনাল গভর্নমেন্টে থাকব না।

প্রশ্ন

তার মানে সেনাসদরের যে আলোচনা, সেখানে জাতীয় সরকারের আলোচনা উঠেছিল? কে আলোচনাটা তুলেছিলেন?

মির্জা ফখরুল: আমার ঠিক এক্সাক্টলি মনে নেই। এটা সম্ভবত মান্না সাহেবরা তুলতে পারেন বা এ রকম ধরনের কেউ হতে পারে। তখন আমরা এটা (ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট) করব না, আমরা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট চাই। আপনারা ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের ফরমেশন নিয়ে আলাপ করেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবন অভিমুখে লাখো মানুষ। রাজধানীর বিজয় সরণিতে
প্রশ্ন

এরপরই তো সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলেছেন।

মির্জা ফখরুল: হ্যাঁ, আমাদের সঙ্গে কথা বলার পরেই উনি বলেছেন। উনি আবার আমাদের বলছিলেন যে আপনারাও আসেন, আমরা একসঙ্গে কথা বলি। আমরা বলেছি যে না, এটা আপনি বলেন। আমাদের এই মুহূর্তে যাওয়া ঠিক হবে না।

প্রশ্ন

সেদিন সেনাবাহিনীর ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেছেন—তারা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, নাকি রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবেশ তৈরি করছিল?

মির্জা ফখরুল: আমি সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখেছি। বিশেষ করে আর্মি চিফ ওয়াজ ভেরি অ্যাকটিভ। উনি সবগুলো যোগাযোগ করছিলেন এবং সবাইকে নিয়ে আসছিলেন। উনি চাচ্ছিলেন যে এই সমস্যাটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাক। ইতিমধ্যে খবর আসে তাঁর কাছে যে প্রাইম মিনিস্টার শেখ হাসিনা চলে গেছেন। তখন উনি আবার ভেতরে গিয়ে টেলিফোনে কী কথাবার্তা বললেন। বেরিয়ে এসে বললেন যে উনি (প্রধানমন্ত্রী) চলে গেছেন।

ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড, তখন তো দারুণ একটা উত্তেজনা। হাসিনা চলে যাচ্ছে, এটা তো একটা আমাদের কাছে অলৌকিক ঘটনা মনে হচ্ছিল। এ জন্য যে ১৭টা বছর আমরা এটার জন্য লড়াই করছি। আর এত বড় একটা কঠিন আন্দোলন, এটা রিয়ালি বর্ণনা করা যাবে না তখনকার সেই অভিব্যক্তি।
প্রশ্ন

ঠিক সে সময়ে আপনার প্রতিক্রিয়াটা কী ছিল।

প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত শনিবার সকালে রাজধানীর হেয়ার রোডে সরকারি বাসভবনে

মির্জা ফখরুল: ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড, তখন তো দারুণ একটা উত্তেজনা। হাসিনা চলে যাচ্ছে, এটা তো একটা আমাদের কাছে অলৌকিক ঘটনা মনে হচ্ছিল। এ জন্য যে ১৭টা বছর আমরা এটার জন্য লড়াই করছি। আর এত বড় একটা কঠিন আন্দোলন, এটা রিয়ালি বর্ণনা করা যাবে না তখনকার সেই অভিব্যক্তি। আমি কিন্তু ওখান থেকে মাঝে মাঝে আমাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম। তারপর তো আমাদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গভবনে। রওনা হয়েছি আমরা বিকেলে, কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা। প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে গেছে ওখানে যেতে। সারা রাস্তায় তো মানুষ আর মানুষ এবং সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। সমস্ত ছেলে-মেয়ে, কেউ ঘাড়ের মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটছে।

আমরা যখন ক্যান্টনমেন্টের গেট থেকে বের হব, দেখি গাড়ি বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। রাস্তা একদম ব্লক। মানুষের দ্বারা ব্লক। ওইখানেই তখন কতগুলো ওই ড্রাম, সেগুলোর ওপর প্রথমেই আমাদের মান্না দাঁড়াল, আমি দাঁড়ালাম, তারপর জামায়াতে ইসলামের শফিকুর রহমান দাঁড়ালেন। আমরা অনুরোধ জানালাম, এখন আমাদের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, দেশকে চালাতে হবে। আমরা বঙ্গভবনে যাচ্ছি। আমরা যখন বঙ্গভবনে পৌঁছালাম, প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ছাত্রদের নেতারা তখনো এসে পৌঁছায়নি। কয়েকজন এসেছে, এক্সাক্টলি নামগুলো আমার মনে নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, ডিজিএফআই, এনএসআইয়ের কর্মকর্তারা ছিলেন। আসিফ নজরুল ওয়াজ নেগোশিয়েটিং, ইনফ্যাক্ট উনি তখন এই যে কথাবার্তাগুলো হচ্ছিল, সেটার ব্রিজিং (সেতুবন্ধ) করছিলেন আসলে। উনি সেনাসদরেও ছিলেন এবং দেয়ার অলসো হি ওয়াজ প্লেয়িং লিডিং রোল। (বঙ্গভবনে) ওখানে আসার পর আলোচনা হচ্ছিল। প্রথমেই আমি বললাম, আলোচনার আগে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। তখন আর্মি চিফ বললেন, হ্যাঁ, এটা অবশ্যই করা উচিত।

গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র–জনতার বিজয় উদ্‌যাপন। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে
প্রশ্ন

এটা কি রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে? তখন রাষ্ট্রপতির অভিব্যক্তি কী ছিল।

মির্জা ফখরুল: রাষ্ট্রপতি বললেন, সবাই একমত হলে অবশ্যই হবে। উনি একটারও বিরোধিতা করেননি। তারপর হলো যে হু উইল লিড দ্য গভর্নমেন্ট। তখন আলোচনায় ইউনূস সাহেবের (অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস) নাম এল।

প্রশ্ন

এটা কে তুললেন?

মির্জা ফখরুল: এটা ছাত্ররা তুলল।

প্রশ্ন

তার মানে কোনো রাজনৈতিক দল থেকে নয়।

মির্জা ফখরুল: না, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে তাঁর (ইউনূস) নাম আসেনি।

এখানে আমরা ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করি। আমাদের কিন্তু ছাত্রনেতাদের সঙ্গে প্রত্যেক দিনই আলোচনা চলছিল। প্রত্যেক রাতে কথা হতো, দিনে কথা হতো। কখনো রাতে ওরা আসত আমার এখানে (বাসায়)। মাহফুজ সাহেব (মাহফুজ আলম) ৩ আগস্ট আমার বাসায় এসেছে।
গণ–অভ্যুত্থানে এক দফা দাবির মুখে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। ৩ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এটা ৬ আগস্টের পরিবর্তে এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট আনা হয়। এ ক্ষেত্রে আপনাদের কোনো ভূমিকা ছিল কি? থাকলে কীভাবে এবং কোন পর্যায়ে যোগাযোগ হয়েছিল?

মির্জা ফখরুল: এখানে আমরা ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করি। আমাদের কিন্তু ছাত্রনেতাদের সঙ্গে প্রত্যেক দিনই আলোচনা চলছিল। প্রত্যেক রাতে কথা হতো, দিনে কথা হতো। কখনো রাতে ওরা আসত আমার এখানে (বাসায়)। মাহফুজ সাহেব (মাহফুজ আলম) ৩ আগস্ট আমার বাসায় এসেছে।

প্রশ্ন

এই পর্বটা একটু বলবেন?

মির্জা ফখরুল: এতটা এক্সাক্টলি মনে নেই আমার।

প্রশ্ন

যতটা মনে করতে পারেন।

মির্জা ফখরুল: ওই যে বললাম, রাতে আমার বাসায় এসেছে। বাসায় আসার পর কথা হয়েছে, এই জায়গায় কী কী করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারপর আবার রাতে গাড়ি চেঞ্জ করে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখন আমাদের নাজমুল (ছাত্রদল নেতা নাজমুল হাসান) ছিল, ছাত্রদল করত। ও নেগোসিয়েশনটা করত। আর এহসানও (এহসান মাহমুদ) এই যোগাযোগগুলোর মধ্যে ছিল। আর একজন ছিলেন আশরাফউদ্দিন নিজান (বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ), ওই সময়ে তিনি আমাদের পক্ষ থেকে কাজগুলো করতেন।

প্রশ্ন

ছাত্রদের মধ্যে মাহফুজ ছাড়া আর কারা কারা এসেছিল?

মির্জা ফখরুল: নাহিদ ইসলামও এসেছিল একবার। আমার যত দূর মনে পড়ে পাটওয়ারী (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী) এসেছে একবার। এটা ছিল ৫ তারিখের দু-তিন দিন আগে। আবার ৫ তারিখের পরে ৬–৭ তারিখেও ছিল। একসময়, এটা মোস্ট প্রোবাবলি ৭ (আগস্ট) তারিখে পুরো টিম এসেছিল। ওরা তালিকা (অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের) নিয়ে এসেছিল। উপদেষ্টা কে কে হতে পারে? ইতিমধ্যে ওরা ফাইনাল করে ফেলেছে যে অধ্যাপক ইউনূসই প্রধান উপদেষ্টা হবেন। সেই তালিকাটা আমাদের দিয়েছিল আরকি।

প্রশ্ন

তাতে কি আপনাদের পছন্দ-অপছন্দ ছিল?

মির্জা ফখরুল: অবশ্যই। ওরা যে তালিকা নিয়ে এসেছিল, সেই তালিকার ব্যাপারে আমি তো চট করে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারিনি। সেটা নিয়ে আমাকে আমার পার্টির টপ লিডারের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে। ছাত্রদের প্রস্তাব নিয়ে আমরা একসঙ্গে বসে চেয়ারম্যানের (তারেক রহমান) সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলি। সেখানে আমি ছিলাম, আমার সঙ্গে বোধ হয় বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ছিলেন, এখন যিনি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, উনি ছিলেন। নজরুল ইসলাম খান সাহেব ছিলেন।

প্রশ্ন

ছাত্রদের তালিকা ধরে বিএনপির দিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে কোনো প্রস্তাব বা পরামর্শ ছিল?

মির্জা ফখরুল: ওদের যে তালিকা, আমরাও আমাদের মতো করে একটা তালিকা করেছি।

প্রশ্ন

কোনো নাম মনে পড়ে?

মির্জা ফখরুল: আমি নাম বলতে চাই না। কনফিউশন ক্রিয়েট করবে।

এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে, আমি মেসেজও পাঠিয়েছিলাম যে এই কর্মসূচি পেছালে এটা বাধাগ্রস্ত হয়ে যাবে এবং ব্যর্থ হতে পারে। তাই পরের দিন যেন করা যায় অর্থাৎ ৫ তারিখে যেন করা যায়, এ ব্যাপারটা তাদের আমি বলেছিলাম।
প্রশ্ন

আপনি একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ছাত্রদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে আপনাদের কারও ভূমিকা ছিল কি।

মির্জা ফখরুল: এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে, আমি মেসেজও পাঠিয়েছিলাম যে এই কর্মসূচি পেছালে এটা বাধাগ্রস্ত হয়ে যাবে এবং ব্যর্থ হতে পারে। তাই পরের দিন যেন করা যায় অর্থাৎ ৫ তারিখে যেন করা যায়, এ ব্যাপারটা তাদের আমি বলেছিলাম।

বিজয়ের আনন্দে সংসদ ভবনে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষ। সংসদ ভবন, ঢাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪
প্রশ্ন

৫ আগস্টের কয়েক দিন আগে থেকে ছাত্রদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগের কথা বিভিন্নভাবে এসেছে। এই যে ৩৬ দিনের আন্দোলন, একদিকে সরকারের নিপীড়ন, অন্যদিকে গোয়েন্দা নজরদারি—এর মধ্যেও যোগাযোগ হতো?

মির্জা ফখরুল: আমাদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ তো ছিল। নাহিদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমরা কিন্তু খুব কনশাসলি প্রথম দিকে ওই আন্দোলনের ব্যাপারে সামনের দিকে যাইনি। নাহিদও বলেছে...তখন কৌশলগত কারণেই আমরা পেছন থেকে আমাদের সব দলবলকে নামিয়ে দিয়েছি। আমরাও তো গেলাম ৩ তারিখে (৩ আগস্ট) বোধ হয়। যেখানে হেলিকপ্টার থেকে প্রচুর গুলি করল। প্রেসক্লাবের সামনে আমাদের দাঁড়াতেই দিল না। মির্জা আব্বাসসহ আমরা সব মার খেলাম।

প্রশ্ন

কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে ছাত্রদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছিল?

মির্জা ফখরুল: কর্মসূচির প্রণয়ন ওরা ওদের মতো করে করেছে। আমরা সাপোর্ট দিয়েছি, যোগাযোগটা ছিল। আর ওদের তো পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হতো। এখন এক বাসায়, তখন আরেক বাসায়। আমার দলের তো সব জেলে চলে গেছে। একমাত্র আমি বাইরে। আপনাদের মনে থাকার কথা, আমি পার্টি অফিসে গিয়ে প্রেস কনফারেন্স করতাম, আর বাসায় চলে আসতাম।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হাজারো মানুষ
প্রশ্ন

ছাত্ররা তো প্রস্তাব করলেন যে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার হবে। ৫ আগস্ট রাতে বিএনপির ভেতরে কী আলোচনা হয়েছিল? অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবে, তা নিয়ে কি কোনো নাম বিবেচনায় ছিল?

মির্জা ফখরুল: আমরা ছাত্রদের প্রস্তাবে আপত্তি করিনি।

প্রশ্ন

অধ্যাপক ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হচ্ছেন, এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর তিনি কি তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?

মির্জা ফখরুল: তা আমি বলতে পারব না। তখন তো তারেক রহমান লন্ডনে, আর অধ্যাপক ইউনূস ফ্রান্সে। উনি কথা বলেছেন কি না, আমি জানি না। আমাদের সঙ্গে কথা হয় একবার। আর উনি যখন আসলেন, এয়ারপোর্টে যখন নামলেন, তখন কিন্তু কথা বলার জন্য এয়ারপোর্টে কয়েকজনকে ডেকেছিলেন। তার মধ্যে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, সালেহউদ্দিন আহমেদ ছিলেন। ওনারা গিয়েছিলেন।

প্রশ্ন

আমরা যতটুকু দেখেছি, আবু সাঈদ মারা যাওয়ার পর ১৬-১৭ জুলাই থেকে তারেক রহমান সোশ্যাল মিডিয়ায় খুবই সক্রিয় ছিলেন।

মির্জা ফখরুল: আমাদের এখানে তো ধরেন নিষেধাজ্ঞা ছিল বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। কিন্তু একটা দিনও বাদ যায়নি...আন্দোলনে তাঁর বক্তব্য ছিলই। উনি আমাদের ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল—এদের সঙ্গে ডাইরেক্ট যোগাযোগ করতেন। অন্য এলাকাগুলোতে কীভাবে এগোবে, কীভাবে মুভমেন্ট করবে, কার সঙ্গে যাবে—মানে হি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য মেইন আর্কিটেক্ট। বিএনপি প্রধানের সঙ্গে ছাত্রনেতা, এই নাহিদদের সঙ্গে ৫ তারিখের আগেই রেগুলার কন্টাক্ট ছিল, কয়েক দফা ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়েছে। এটা কিন্তু অনেকেই জানে না।

প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তৈরির সময় বিএনপির সঙ্গে কতটা আলোচনা হয়েছে?

মির্জা ফখরুল: আলোচনা হয়েছে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে। সেগুলো আর্মি চিফের কাছেও গেছে। আর্মি চিফও একমত হওয়ার পরেই সবাই মিলে এটা করা হয়েছে। আর্মি চিফের কিন্তু এখানে একটা বড় রোল ছিল অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে।

প্রশ্ন

ওনাদের (সেনা সদর) কোনো পছন্দ ছিল?

মির্জা ফখরুল: না, ওটা অতটুক বলতে পারব না; কিন্তু প্রতিটা বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে।

এখানে ছাত্র হত্যার ব্যাপারটা এত আবেগ সৃষ্টি করেছিল মানুষের মধ্যে, ছাত্রদের মধ্যে, তরুণদের মধ্যে, মহিলাদের মধ্যে—সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তখন কারও ছিল না। এটা ভয়াবহভাবে একটা উত্তাল তরঙ্গের মতো, সুনামির মতোই আঘাত করেছে।
প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে আপনি এর সবচেয়ে বড় অর্জন কী মনে করেন? এর কি কোনো অপূর্ণতা দেখেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: গণ-অভ্যুত্থানে যে বিষয়টা সামনে এসেছে, মানুষের যে পার্টিসিপেশনটা। মূল বিষয় যেটা ছিল, সেটা হচ্ছে ‘এগেইনস্ট ফ্যাসিজম’। হাসিনার ব্যাপারে ‘নো’। তাঁকে যেতে হবে, এটা ছিল গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান জিনিস। এখানে ছাত্র হত্যার ব্যাপারটা এত আবেগ সৃষ্টি করেছিল মানুষের মধ্যে, ছাত্রদের মধ্যে, তরুণদের মধ্যে, মহিলাদের মধ্যে—সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তখন কারও ছিল না। এটা ভয়াবহভাবে একটা উত্তাল তরঙ্গের মতো, সুনামির মতোই আঘাত করেছে।

আমি যেটা ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেটা প্রথম বিষয়—একটা পরিবর্তন। পরিবর্তনটা হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটা এনভায়রনমেন্ট দরকার, অধিকারগুলো রক্ষা করার ব্যাপারে। নম্বর টু হচ্ছে, দেশে দীর্ঘ ফ্যাসিজমের পরে ইনস্টিটিউশনগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, মানুষ কোথাও গিয়ে কোনো সুরাহা পাচ্ছিল না, কোনো ন্যায়বিচার বা ইনসাফ পাচ্ছিল না। এই বিষয়গুলো মানুষের সামনে প্রধান হয়ে এসেছে। দ্যাট ওয়াজ ডিজায়ার অব পিপল এবং সেই ডিজায়ার অনুযায়ীই কিন্তু আলোচনা হলো। দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে সংস্কার কমিশন বসল। জুলাই ঘোষণা নিয়েও আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ওখানে আমাদের সঙ্গে, ছাত্রনেতাদের সঙ্গে, জামায়াতের সঙ্গে একসঙ্গে বসে আলটিমেটলি জুলাই ঘোষণাটা হয়েছে।

এর পরে এসেছে জুলাই জাতীয় সনদ। ১৫ মাস ধরে এই আলোচনা চলেছে। ফাইনালি আমরা কিন্তু উচ্চকক্ষে আনুপাতিক হারে নির্বাচন কখনোই অ্যাগ্রি করিনি; এবং আমাদের নোট অব ডিসেন্টও আছে। গণভোটের ব্যাপারটা আমরা ওই মুহূর্তে রাজি হয়েছিলাম এই কারণে...। ব্যাপার হচ্ছে একটা জায়গায় তো আসতে হবে। ওরা তখন এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে—বেরিয়ে যাবে। ফলে আমরা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে গণভোটের কথা বলেছি। নির্বাচনের কথা আমি বলি না। বাট প্রতারণাটা কোথায় হলো? প্রতারণা হলো গণভোটের চারটি প্রশ্ন। ওখানেই পুরো বিষয়টা উল্টো করে দিল যে এভাবে হতে হবে। জুলাই সনদের প্রতিটাতে বলা আছে, সরকার গঠন করবে যারা, তাদের ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী তারা কাজ করবে। দ্যাট ওয়াজ অ্যাগ্রিড, এখন এই কথা বললে তো হবে না। তুমি তো অ্যাগ্রি করেছ যে ভাই আমি আমার মতো করব। আমরা তো ইতিমধ্যে পার্লামেন্টে কমিটি করেছি। তাদের বারবার রিকোয়েস্ট করা হচ্ছে যে আসো, এখানে কথা বলো। কথা বলে এখানে আলোচনা করে যদি আরও কিছু চেঞ্জ করতে চাই, আমরা চেঞ্জ করব। সেটা কিন্তু তারা করছে না। এখানে সমস্যা কী? জামায়াতে ইসলামী একটা খুব নেগেটিভ রোল প্লে করছে, রিগার্ডিং দিস কনস্টিটিউশন অ্যামেন্ডমেন্ট। ওরা এটাকে একটা ইস্যু বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য আন্দোলন করছে। আন্দোলনে কিন্তু সাড়া নেই কোনো।

প্রশ্ন

৫ আগস্টের আগে বা পরে ছাত্রদের সঙ্গে আপনাদের একটা যোগাযোগের চিত্র পাওয়া যায়; কিন্তু ছাত্রদের বাইরে অন্যান্য দল, বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ হতো। দলটির নেতারাও আত্মগোপনে ছিল, ৫ আগস্টের আগে নিষিদ্ধও ছিল।

মির্জা ফখরুল: ৫ আগস্টের আগে জামায়াত (নেতারা) তো বাইরে বের হতো না। তখনো যোগাযোগ ছিল। এই ১৫ বছর যেভাবে করেছি সেভাবে, গোপনে।

প্রশ্ন

তার মানে জুলাই আন্দোলন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ ও আলোচনা ছিল।

মির্জা ফখরুল: রেগুলার আলোচনা হয়েছে। আমাদের টিম ছিল। এই টিমগুলো আলোচনা করত। এই আলোচনার ব্যাপারটা আমাদের সব সময় চলেছে। ৫ তারিখের আগেও আমাদের আলোচনা হয়েছে।

গোয়েন্দা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে কাজ করা হতো, গাড়ি বদল করে চলে যেতাম বিভিন্ন জায়গায়, একদম কমিউনিস্ট পার্টির মতো। আমি নিজে কতবার গেছি। আমি আর নজরুল ইসলাম খান ভাই। আর ওনাদের মধ্যে থাকতেন কখনো ডা. শফিকুর রহমান। উনি জেলে থাকলে থাকতেন হামিদুর রহমান আযাদ, পরওয়ার সাহেব (গোলাম পরওয়ার) খুব কম ছিলেন; আর হালিম সাহেব (আবদুল হালিম) বেশি থাকতেন। উনি ছিলেন মেইন, উনি বাইরে থাকতে পারতেন।
প্রশ্ন

তীক্ষ্ণ গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে সেটি কীভাবে হতো।

মির্জা ফখরুল: গোয়েন্দা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে কাজ করা হতো, গাড়ি বদল করে চলে যেতাম বিভিন্ন জায়গায়, একদম কমিউনিস্ট পার্টির মতো। আমি নিজে কতবার গেছি। আমি আর নজরুল ইসলাম খান ভাই। আর ওনাদের মধ্যে থাকতেন কখনো ডা. শফিকুর রহমান। উনি জেলে থাকলে থাকতেন হামিদুর রহমান আযাদ, পরওয়ার সাহেব (গোলাম পরওয়ার) খুব কম ছিলেন; আর হালিম সাহেব (আবদুল হালিম) বেশি থাকতেন। উনি ছিলেন মেইন, উনি বাইরে থাকতে পারতেন। অর্থাৎ জুলাই আন্দোলন নিয়ে জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির একটা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল।

শপথ নেওয়ার পর স্বাক্ষর করেন তারেক রহমান
প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন একটি বড় অর্জন। এই অভ্যুত্থানের অপূর্ণতা কী দেখেন।

মির্জা ফখরুল: এত তাড়াতাড়ি পূর্ণতা আসবে না। ১৫ বছরের একটা জিনিস খেয়াল করেন না কেন? অল ইনস্টিটিউশন ইজ ডেসট্রয়েড। আপনি শিক্ষার কথা চিন্তা করেন। ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) হওয়ার জন্য টাকা নিয়ে ঘোরে। তখনো আমরা সরকারে আসিনি, ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময়, ভিসি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তখন শিক্ষা উপদেষ্টা। সবাই মনে করে যে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে, বললে বোধ হয় কাজ হবে। আমার কাছে লোকজন এসেছে ভিসি হওয়ার জন্য। টাকা নিয়ে এসেছে। বিশ্বাস করেন, ওই দিনই আমার মনে হয়েছে, কী হবে এই জাতির?

তারেক সাহেব দিনরাত কাজ করছেন। রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি মিটিং করেন, নিজে গাড়ি নিয়ে বের হন, ঢাকা সিটিকে কী করে সুন্দর করা যায়। বাট হোয়াট আদার্স আর ডুয়িং। এটা আমার বলার দরকার নেই, আপনারা নিজেরা খোঁজ করুন। মন্ত্রীরা চেষ্টা করছেন, সরকারি কর্মকর্তারা কী করছেন? তাঁরা কতটুকু আন্তরিকভাবে কাজ করছেন?
প্রশ্ন

আপনি গত বৃহস্পতিবারই বলেছেন, কিছুই বদলায়নি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: এগুলো বলে তো বিপদে পড়ি ভাই। তারেক সাহেব দিনরাত কাজ করছেন। রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি মিটিং করেন, নিজে গাড়ি নিয়ে বের হন, ঢাকা সিটিকে কী করে সুন্দর করা যায়। বাট হোয়াট আদার্স আর ডুয়িং। এটা আমার বলার দরকার নেই, আপনারা নিজেরা খোঁজ করুন। মন্ত্রীরা চেষ্টা করছেন, সরকারি কর্মকর্তারা কী করছেন? তাঁরা কতটুকু আন্তরিকভাবে কাজ করছেন?

প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের প্রধান সাফল্য ও ব্যর্থতা কী ছিল?

মির্জা ফখরুল: আমি যেটা মনে করি, তাদের সার্থকতা ছিল—তারা অ্যাটলিস্ট কমিশনগুলো গঠন করতে পেরেছে। যে কমিশন গঠন করা খুব জরুরি ছিল। পরিবর্তনগুলোর ব্যাপারে তারা একটা গাইডলাইন তৈরি করতে পেরেছে। ওই সময়কার একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি—একদিকে ভারত প্রচারণা চালাচ্ছিল যে এখানে কমিউনাল কিলিং হচ্ছে; সেটাকে ফেস করা, চ্যালেঞ্জ করা। আন্তর্জাতিক বিশ্বেও তারা একটা ভালো ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। হ্যাঁ, একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের পক্ষে সবকিছু করে ফেলা সম্ভব নয়। আমাদের ক্রাইসিসগুলো কোথায়? জিনিসপত্রের দাম। এটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট চেষ্টা করেছে। উৎপাদন যদি না বাড়ে, আপনি এর সমাধান কীভাবে করবেন।

প্রশ্ন

তখন কিন্তু আপনারা অধ্যাপক ইউনূস সরকারের কড়া সমালোচনাও করেছিলেন।

মির্জা ফখরুল: হ্যাঁ, সমালোচনা করেছি। আবার এটাও বলছি, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দেওয়া সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। ইউনূস সাহেবই তখন একমাত্র একসেপ্টেবল ব্যক্তি ছিলেন।

প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে বিএনপি ও আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। আপনার মতে, এই টানাপোড়েনের শুরু কোথায় এবং কেন?

মির্জা ফখরুল: আমি এটার সুযোগই দেখি না; এবং এটা হওয়া উচিত না। এটা এ রকম কিছু আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। হ্যাঁ, একটা ব্যাপার হয় যে আমরাও কাজ করেছি, আমাদের লোক মারা গেছে, আমরা জেল খেটেছি। তো স্বাভাবিকভাবে...আমি এত দিন, এত কিছু করলাম, ক্রেডিট নিয়ে যাচ্ছে...এমন একটা মনমানসিকতা থাকতে পারে; কিন্তু আমি সেটা বিশ্বাস করি না। এটা আমি স্বাভাবিকভাবে জানি, একজন পুরোনো লোক হিসেবে তরুণেরা, ছাত্ররা না নামলে আন্দোলন সফল হতো না। ওরা যখন নেমেছে, তখন সফল হয়ে গেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না নামে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশে আন্দোলন সফল হয় না। এটা হচ্ছে প্রমাণিত ইতিহাস।

প্রশ্ন

এখন যে এনসিপির সঙ্গে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটছে?

মির্জা ফখরুল: এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা হচ্ছে লোকালি, সেন্ট্রালি আমাদের সেই সমস্যা নেই।

প্রশ্ন

সিলেটেই কেন বেশি হচ্ছে?

মির্জা ফখরুল: সিলেটের লোকজন একটু অ্যাকটিভ বেশি। যখনই ওদের নেতাকে গালি দেয়, ওরা সহ্য করতে পারে না। ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং। ওরা (এনসিপি) গালি দেয় বিশ্রী-অশ্লীল ভাষায়। এই যে পাটওয়ারী, একটা বাচ্চা ছেলে। বলেন তো দেখি। ও একদিন আমার অফিসে এল প্রথম। এসে আমাকে বলছে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, সেকেন্ড রিপাবলিক করতে হবে, কনস্টিটিউশন বাদ দিয়ে নতুন কনস্টিটিউশন করতে হবে। আমি বললাম, তুমি তো দেখছি ফ্যাসিবাদের মতো কথা বলছ।

প্রশ্ন

২০২৪ সালে রাজপথে থাকা ছাত্রদের একটি অংশ এখন বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তাঁদের বক্তব্যের কোন অংশকে আপনি ন্যায্য মনে করেন?

মির্জা ফখরুল: বাংলাদেশের মতো একটা দেশ, ২০ কোটি মানুষ, ১ লাখ ৫৪ হাজার বর্গমাইল এলাকা। বিদেশি সাহায্যের ওপর অনেক নির্ভর করতে হয়। দুটি মাত্র সেক্টর, যেখান থেকে আপনি আয় করেন। চার কোটি মানুষ আনএমপ্লেয়ড শিক্ষিত। আমাদের ভুল নীতির কারণে আমরা এই লোকজনকে বিএ পাস করিয়েছি, এমএ পাস করিয়েছি। কিন্তু আমরা টেকনিক্যাল এডুকেশন নিতে পারিনি। এটা ছিল ভুল নীতি বিগত সরকারের। এদের চাকরি নেই। এরা একটা সমস্যা।

আমাদের দেশে প্রজেক্ট বেজ ইকোনমি। টোটাল যে প্ল্যানিং, সেটা আমাদের দেশে নেই। যেমন ধরুন, আপনার স্কুল-কলেজ। ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল তৈরি করছেন, মাদ্রাসা তৈরি করছেন। কল্পনা করা যায় না; আর আপনি খুব ভালো করে জানেন, শহরের মধ্যবিত্ত খুব অল্পতেই অস্থির হয়ে যায়। জিনিসের দাম বাড়লে, চলতে–ফিরতে কষ্ট হলে তারা খেপে যাবে।

আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, এখানে রাতারাতি দেশকে চেঞ্জ করা যাবে না। সময় লাগবে, ধৈর্য ধরতে হবে এবং এখানে যেটা সবচেয়ে বড় জিনিস আমি মনে করি, মেরিট্রোক্রেসিকে সবচেয়ে প্রাধান্য দিতে হবে অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে, সবচেয়ে বেশি শিক্ষাব্যবস্থায়। এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ করবেন না। তাহলে আপনি সামনের দিকে আস্তে আস্তে এগোবেন।

প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সময় একটা পারসেপশন তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে আগেই তো ভালো ছিলাম।

মির্জা ফখরুল: একদম ভুল কথা। যেমন এখন আপনার স্কুলগুলোতে পড়াশোনা শুরু হয়েছে। এডুকেশন সেক্টরে বদলি একটা সিস্টেমে নিয়ে আসছে। আপনার প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের বদলি জেলাতে নিয়ে গেছে। নকলটা একদম বন্ধ হয়ে গেছে।

এগুলো পজিটিভ বিষয়। স্বাস্থ্য খাতে নৈরাজ্য সবটা চলে গেছে বলব না; কিন্তু অনেক কমে আসছে। জুডিশিয়ারি আগের চাইতে মাচ বেটার। জুডিশিয়ারিতে কোনো বিএনপির এমপি বা মন্ত্রী কখনো জজকে টেলিফোন করে না। তাহলে আপনি কোন জায়গায় বলবেন যে কিছু হয়নি। অনেক দূর এগিয়েছে। এই যে পারসেপশনটার কথা বলছেন আগে ভালো ছিল, কমপ্লিটলি রং পারসেপশন। এই প্রচার যারা করছে, পারপাসফুলি করছে।

প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এখন সরকারে বিএনপি। এই আকাঙ্ক্ষার নিরিখে সরকারের প্রথম মাসগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মির্জা ফখরুল: আমাদের প্রথম ছয় মাস গেছে সবকিছু গুছিয়ে নিতে। দলের নেতৃত্বকে সুসংহত করার কাজটি করেছেন চেয়ারম্যান। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কনসলিডেশনটাকে বাড়ানো অর্থাৎ প্রশাসনকে আপনার উন্নয়নমুখী করে নিয়ে আসা। এবং পরিবর্তনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা। সেটা ঘন ঘন মিটিং করে উনি (প্রধানমন্ত্রী) করছেন, আমরাও করছি। তারপর উনি সামাজিক নিরাপত্তার যে কাজগুলো করেছেন, এগুলোর কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে খুব ভালো ইম্প্যাক্ট হয়েছে।

এবারের বাজেটটা তো খুব পজিটিভ বাজেট হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম তো বাড়ার কথা না। জিনিসপত্রের দাম যারা বাড়াচ্ছে, সাপ্লাইয়ের অভাবের কারণে, প্রোডাকশন কম। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীরা তো এখন পর্যন্ত ঠিক ওই জায়গায় যেতে পারেনি, যেখানে তারা ভালো ভূমিকা পালন করবে। ইউ আর ইমপোর্ট বেজড ইকোনমি। আপনার জাহাজ চলে না (মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে)। সমুদ্র বন্ধ। তো আপনি করবেনটা কী?

প্রশ্ন

‘পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নতুন মোড়কে ফিরে আসছে’—এমন সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। নিয়োগ, বদলি, ঠিকাদারি ও স্থানীয় প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। সরকার ও দল এসব অভিযোগের জবাব কীভাবে দেবে?

মির্জা ফখরুল: সরকারে গিয়ে আমরা যেটা দেখেছি, আগেকার যে রুলসগুলো ছিল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস। এটা আওয়ামী লীগের তৈরি করা এবং সেটা কীভাবে শুধু ওদের লোকদের সুযোগ-সুবিধা দেবে, একটা অলিগার্কি তৈরি করা। আমরা সেগুলো পরিবর্তন শুরু করেছি। এখন থেকে ঠিকাদারির ব্যাপারটা অনেকটাই চেঞ্জ হয়ে যাবে।

প্রশ্ন

আপনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন যে কিছুই বদলাচ্ছে না, তাহলে সেটা কী?

মির্জা ফখরুল: ওইটা তো একটা সময় লাগবে। ওটা তো রাতারাতি হবে না। ১৭ বছরের ফ্যাসিজমের যে লোকগুলোকে আপনি চাকরি দিয়েছেন, মেরিটে তো চাকরি দেননি। আপনি দেখছেন, আওয়ামী লীগ করে কি না, গোষ্ঠী দেখছেন। ওই লোকগুলো তো আছে, প্রতিটা জায়গাতেই আছে। ওরা স্লো। ওরা কাজ করতে চায় না। আর ওই যে অভ্যাস হয়ে গেছে, ঘুষটুস খাওয়ার। ওই অভ্যাস থেকে বের করে আনতে সময় লাগবে।

প্রশ্ন

আপনি শিক্ষায়, প্রশাসনে মেধাকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন; কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেল, ১১-১২টা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দলীয়। এটা নিয়ে সমালোচনা আছে।

মির্জা ফখরুল: যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এরা কিন্তু কেউ অযোগ্য না। যেমন ধরেন ড্যানি (বিএনপির কেন্দ্রীয় সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ টি এম আবদুল বারী)। সে একটা ইউনিভার্সিটির ভালো ছাত্র ছিল, ছাত্রনেতা ছিল। এরপর যতগুলো আছে, দেখা যাবে প্রায় সবগুলোই ছাত্রনেতা ছিল। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আছে, বেশির ভাগই তাই। সব যোগ্যতা তাদের মধ্যে আছে। যোগ্যতা নেই কেন? আর বলছেন ফিল্ডের যোগ্যতা। ফিল্ডের যোগ্যতা এমডির থাকবে, জিএমের থাকবে। উনি তো চেয়ারম্যান। উনি একটা মিটিংয়ে প্রিসাইড করবেন; আর তো কিছু না। চেয়ারম্যান মিটিং করতে গিয়ে যেন ওখানে আবার ফ্যাসিস্টরা না আসে। সেটা দেখার জন্য লোক রাখতে হবে তো। আমি এটাকে বলি, অ্যান্টিফ্যাসিজম। আমি সরকারে, আমার লোকজন থাকবে না?

প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার কতটা এখনো অক্ষুণ্ন আছে?

মির্জা ফখরুল: পরিবর্তনের অনেক সুযোগ আছে এবং যথেষ্ট অক্ষুণ্ন আছে। পার্লামেন্টে যদি আমরা ফাংশন করতে পারি, তাহলেই হয়ে যায়।

সংস্কার বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হচ্ছে। দুই-একটা জায়গাতে প্রবলেম, তা ছাড়া উই হ্যাভ টেকেন মেজারস। ইতিমধ্যে আমরা সংবিধান সংশোধনে পার্লামেন্টের কমিটি করেছি। আমরা চাই যে বিরোধী দল আসুক, এসে সেখানে সমাধান করি সমস্যাগুলোর। বিরোধী দল কমিটিতে নাম না দিলেও আমাদের তো পরিবর্তনগুলো করতে হবে। আমরা তো কমিটেড আমাদের ৩১ দফা এবং জুলাই সনদে এবং মেনিফেস্টোতে। সেটা তো আমাদের করতে হবে।
প্রশ্ন

সংস্কারগুলো যদি দ্রুত বাস্তবায়িত না হয়, সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে?

মির্জা ফখরুল: সংস্কার বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হচ্ছে। দুই-একটা জায়গাতে প্রবলেম, তা ছাড়া উই হ্যাভ টেকেন মেজারস। ইতিমধ্যে আমরা সংবিধান সংশোধনে পার্লামেন্টের কমিটি করেছি। আমরা চাই যে বিরোধী দল আসুক, এসে সেখানে সমাধান করি সমস্যাগুলোর। বিরোধী দল কমিটিতে নাম না দিলেও আমাদের তো পরিবর্তনগুলো করতে হবে। আমরা তো কমিটেড আমাদের ৩১ দফা এবং জুলাই সনদে এবং মেনিফেস্টোতে। সেটা তো আমাদের করতে হবে।

প্রশ্ন

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির নীতিগত অবস্থান কী? দলটির নেতৃত্বের বিচার, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার—এই তিন প্রশ্নকে বিএনপি কীভাবে দেখে?

মির্জা ফখরুল: এটাতে আমার নিজের কিছু বলার নেই। আওয়ামী লীগ হ্যাজ রুইন্ড ইটসেলফ, কিল ইটসেলফ। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আসলে এখন আর নেই। আওয়ামী লীগ তো তার পলিটিক্যাল এন্ট্রিটিটাই রাখতে পারেনি। যে দলের নেত্রী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় দলবল নিয়ে এবং সব সাধারণ কর্মীকে এখানে অসহায় অবস্থায় রেখে যায়। এখন বলেন, এ রকম একটা দল চলবে কী করে?

প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের তৃতীয় বর্ষে গিয়ে আপনি কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?

মির্জা ফখরুল: আমি যেটা দেখতে চেয়েছি সব সময়। আমি সব সময় এটাকে একটা উদারমুখী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছি। আমি এখানে একটা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছি। সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, ইনসাফের দেশ হিসেবে দেখতে চাই।

প্রশ্ন

আগামী এক বছরের সরকার ও বিএনপির কোন তিনটি কাজকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

মির্জা ফখরুল: প্রথম হচ্ছে অর্থনীতিকে সচল করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া, যেটা অলরেডি নেওয়া হয়েছে; এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে ইতিবাচক করা। অর্থাৎ আমলাতন্ত্র, প্রশাসন সব ঠিকঠাকমতো নিজের কাজ করবে, এটা করা; আর তৃতীয় হচ্ছে, ধর্মের ভিত্তিতে যেন রাজনীতি করে মানুষকে বিভ্রান্ত না করা হয়। উগ্রপন্থা অথবা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা—এই জিনিসটা যাতে না হয়, সেটা দেখা।

প্রশ্ন

এর আগে প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলছিলেন, দেশে দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে আপনি উদ্বিগ্ন। এখন এসে সেটাকে কীভাবে দেখছেন।

মির্জা ফখরুল: এখনো আমি এটাকে নাকচ করে দিতে পারছি না। এখনো আছে। দেখেন, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা হচ্ছে, ওই সময় আপনার সাদা কাপড়ে কালেমা লিখে দিচ্ছে, কারা এরা? এই উত্থানটা তো আমার কাছে অ্যালার্মিং। তারপর বিভিন্ন স্থানে বোমা পাওয়া যাচ্ছে, এটাও তো অ্যালার্মিং। আমার কাছে মনে হয়, একটা ষড়যন্ত্র চলছে, বাংলাদেশকে আবার একটা অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে দেখানো। সরকারের বিরুদ্ধে একটা চক্রান্ত সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে।

প্রশ্ন

একদিকে দক্ষিণপন্থী কিংবা উগ্রবাদের উত্থানের আলামতকে অ্যালার্মিং বলছেন, আবার বলছেন সরকারের বিরুদ্ধে একটা চক্রান্ত সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল: ওই উসকানি তো দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এতে আওয়ামী লীগ জড়িত আছে, আর উগ্রবাদও জড়িত আছে।

এগুলো প্রতিদিন মনে করতে হয়, প্রতিমুহূর্তে মনে করতে হয়। এই অবস্থার পরিবর্তনে যদি রিকনসিলিয়েশন হয়, ইফ অল দ্য পলিটিক্যাল পার্টি অ্যাগ্রি, যে আমরা আমাদের প্রোগ্রামটা মানুষের কাছে দেব, প্রোগ্রাম নিলে মানুষ নেবে। এটা নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করব না, রাস্তায় নামব না, ভিকটিমাইজ করব না। এটা হলে রিকনসিলিয়েশন হবে।
প্রশ্ন

এ ধরনের ক্ষেত্রে রিকনসিলিয়েশনের কথা অনেকে বলেন। এটা সম্ভব মনে করেন?

মির্জা ফখরুল: আমি মনে করি, উইদাউট রিকনসিলিয়েশন বাংলাদেশকে সামনে নিতে পারবেন না। এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। আপনি এখানে রাজনীতিতে থাকবেন, সারাক্ষণ মারামারি করবেন, একে অন্যকে হত্যা করবেন, ভিকটিমাইজ করবেন। এ ক্ষমতায় এলে ও মামলায় যাবে, ও এলে সে মামলায় যাবে।

আমরা রাজনীতি করি, আমরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকব? এখন প্রতিটা কাজ করার আগে মনে হয়, আবার জেলে যেতে হবে কি না। যেন এমন না হয় যে আবার কোনো মামলায় পড়ি। এগুলো প্রতিদিন মনে করতে হয়, প্রতিমুহূর্তে মনে করতে হয়। এই অবস্থার পরিবর্তনে যদি রিকনসিলিয়েশন হয়, ইফ অল দ্য পলিটিক্যাল পার্টি অ্যাগ্রি, যে আমরা আমাদের প্রোগ্রামটা মানুষের কাছে দেব, প্রোগ্রাম নিলে মানুষ নেবে। এটা নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করব না, রাস্তায় নামব না, ভিকটিমাইজ করব না। এটা হলে রিকনসিলিয়েশন হবে।

প্রশ্ন

এমন কোনো ভাবনা সরকারের আছে?

মির্জা ফখরুল: আমাদের মেনিফেস্টোর মধ্যেই তো আছে।

প্রশ্ন

আপনাকে ধন্যবাদ।

মির্জা ফখরুল: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।