
চার দশক আগে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হাফিজ উদ্দিন আহমদ, তার ১৫ বছর পর খালেদা জিয়ার সরকারে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন, এবার তারেক রহমানের সরকারেও মন্ত্রী হলেন তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শপথ নেন। নতুন মন্ত্রিসভায় হাফিজ উদ্দিন পেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ (লালমোহন-দৌলতখান) আসন থেকে লড়েছিলেন ৮১ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন। ১ লাখ ৪৫ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোট ছিল ৫৭ হাজার ৩৫১। এ নিয়ে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাবেক ফুটবলার, বীর বিক্রম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিনের নির্বাচনী যাত্রার শুরু ১৯৮৬ সালে। সেবার জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির হয়ে নির্বাচিত হলে ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তবে ফলাফলে হেরফের হয়নি, সেবারও ভোটে জয়ী হন তিনি।
১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনেও সংসদ সদস্য হন হাফিজ উদ্দিন, এরপর ওই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনেও একই আসনে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্তকালীন সরকারে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন হাফিজ উদ্দিন। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে তাঁকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়। প্রথমে পাটমন্ত্রী, তারপর পানিসম্পদমন্ত্রী এবং শেষে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
হাফিজ উদ্দিনের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৬৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। জামালপুরের কামালপুর, ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে দুঃসাহসী সব যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আন্তবিভাগ ফুটবলে টানা দুটি হ্যাটট্রিক করায় ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম, যোগ দেন ঢাকা লিগে ফায়ার সার্ভিস দলে। তারপর ঢাকা ওয়ান্ডারার্স হয়ে ১৯৬৭ সালে যোগ দেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। ১৯৭৮ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার আগপর্যন্ত তিনি সাদা-কালো শিবিরেই ছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে খেলেছেন হাফিজ উদ্দিন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেন। তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নির্বাচিত সহসভাপতি ছিলেন।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হন হাফিজ উদ্দিন। বর্তমানে তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।
নির্বাচনী হলফনামায় হাফিজ উদ্দিন তাঁর পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হিসেবে ২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং বাড়ি ভাড়া থেকে ১৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ১ কোটি ৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের কথা উল্লেখ করেন তিনি। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৮০ লাখ টাকার।