
জাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য ডেটাবেজ করা এবং দেশে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ‘প্রমোট’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ।
আজ শনিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে আন্দালিভ রহমান এ প্রস্তাব করেন। তবে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে তাঁর এ প্রস্তাবের প্রসঙ্গ টেনে সরকারি দলের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অভিযোগ করেছেন, ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি হয় না। এটা বিএনপির লক্ষ্য ও আদর্শের সঙ্গে যায় না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, দেশ কি শুধু মুসলমানদের জন্য স্বাধীন হয়েছে? পরে এটি নিয়ে সংসদে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়।
বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন আন্দালিভ রহমান। যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সারা পৃথিবী ইসলামিক ব্যাংকিং এর দিকে যাচ্ছে। দেশেও এই ইসলামিক ব্যাংকিং প্রমোট করা উচিত।
কেন ইসলামিক ব্যাংকিং প্রমোট করা উচিত তার ব্যাখ্যা দিয়ে আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘আমরা ডিভাইন ব্লেসিংয়ে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি ইসলামিক ব্যাংকিং যত প্রমোটেড হবে বাংলাদেশে ইসলামি মহলে আল্লাহ–তাআলার সেই রহমত, ডিভাইন ব্লেসিং আমাদের ওপরে আসবে।’
ইসলামিক ব্যাংকিংকে সমাধান উল্লেখ করে আন্দালিভ বলেন, ‘কনভেনশনাল ব্যাংকিং বা শাইলক সিস্টেমে (চড়া সুদের ঋণ ব্যবসা) আমরা যেভাবে ঢুকে গিয়েছি, এটা আমরা রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারব না। কিন্তু এটা সত্যি কথা যে পৃথিবীতে এখন ইসলামিক ব্যাংকিং ইজ দ্য ট্রেন্ড।’
বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে আন্দালিভ বলেন, বাংলাদেশের জাকাত একটা ‘হিডেন ইকোনমি’। দেশে মোট কত টাকা জাকাত দেওয়া হয় তা কেউ জানে না। সরকারের জাকাত ফান্ডে টাকা নেওয়ার একটা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেটা নামমাত্র। আন্দালিভ মনে করেন, জাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ডেটাবেজ থাকা উচিত। কারা জাকাত নিতে পারেন নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক সে তথ্য সেখানে থাকতে পারে।
বিজেপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ভোলাকে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা বা কমিটি করা যেতে পারে। প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে কার্ড সুবিধা, কৃষক সহায়তা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরঞ্জামের ওপর করছাড়, স্টার্টআপ সহায়তা, মসলার দাম কমানো, ক্যানসার, হৃদ্রোগ ও চোখের চিকিৎসাসহ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে আন্দালিভ রহমান বলেন, বাজেটে ‘জনগণের কল্যাণ ও মানুষের প্রতি যত্ন’–এর একটি বার্তা রয়েছে।
ক্রিকেটার নাহিদ রানার কথা উল্লেখ করে আন্দালিভ রহমান বলেন, তাঁকে উঠিয়ে আনা গেছে, তাঁর মেরিটোক্রেসি ছিল। দেশে বিভিন্ন খাতে এ রকম হাজার হাজার নাহিদ রানা আছেন। তাঁদের নিয়ে আসতে হবে।
নিজের নির্বাচনী এলাকা ভোলার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান আন্দালিভ রহমান। তিনি বলেন, ভোলায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস সম্পদ রয়েছে এবং সঠিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। ভোলার উন্নয়নে পৃথক কমিটি গঠনেরও দাবি করেন তিনি।
ব্যাংক তো মসজিদ, মাদ্রাসা না: গয়েশ্বর
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে আন্দালিভ রহমানের দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, আন্দালিভ রহমান পার্থ বক্তব্যে ইসলামিক ব্যাংক সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ, বিএনপির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ ধর্মীয় মূল্যবোধ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের কথা বলা হয়নি। সব ধর্মের মানুষের মূল্যবোধকে ধারণ করা হবে।
গয়েশ্বর বলেন, ইসলামী ব্যাংকের একজন পরিচালক যিনি এখন জামায়াতের রাজনীতি করেন, তাঁকে তিনি একজনের চাকরির জন্য বলেছিলেন। গয়েশ্বরের ভাষায়, ‘সে (ওই পরিচালক) বলল, দাদা, নামটা পাঠিয়ে দেন। নাম পাঠানোর পরে বলে—“দাদা সরি, ও তো হিন্দু, এ চাকরি তো আমি দিতে পারব না।’’’
বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘ব্যাংকের নামের আগে যদি ইসলাম থাকে, সেখানে যদি মুসলিম ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো ধর্মের মানুষ চাকরি করতে না পারে, এটা যদি কোনো আইন হয়, বলতে পারে আমি হিন্দু মানুষ মসজিদে যেতে পারব না বা মাদ্রাসায় যাওয়া উচিত হবে না। কিন্তু ব্যাংক তো কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা না।’
এটাকে বৈষম্য আখ্যা দিয়ে গয়েশ্বর প্রশ্ন রাখেন, দেশ কি মুসলমানদের জন্য স্বাধীন হয়েছে? নাকি এ ভৌগোলিক অঞ্চলে জন্ম নেওয়া সব জাতি–ধর্মের মানুষ যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা দেশ স্বাধীন করেছে? আন্দালিভ রহমানের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করেন গয়েশ্বর।
আন্দালিভ রহমানের ব্যাখ্যা
গয়েশ্বরের বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে দাঁড়ান আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ইসলামিক ব্যাংকিং পৃথিবীতে এখন অমুসলিমদের মধ্যেও জনপ্রিয় হচ্ছে। অমুসলিমরা ইসলামি ব্যাংকিংয়ে চাকরি করতে পারবেন না—এ বাধার কথা তাঁর জানা নেই। তবে তাঁর ধারণা ইসলামী ব্যাংকে যে কেউ চাকরি করতে পারেন।
তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি লক্ষ করেছেন, এই সংসদে অনেক অনুমাননির্ভর কথাবার্তা হয়। ইসলামী ব্যাংকের কোনো পরিচালক এখানে থাকলে বিষয়টি নিয়ে বলতে পারতেন। বিষয়টিকে স্পর্শকাতর ও সাম্প্রদায়িক ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেন স্পিকার।
এ পর্যায়ে সংসদে ফ্লোর নেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকে যেকোনো ধর্মাবলম্বী চাকরি করতে পারেন। তাঁর এলাকারই হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করেন।