যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তিকে ‘লাল কার্ড’ দেখাচ্ছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপস্থিত লোকজন। আজ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তিকে ‘লাল কার্ড’ দেখাচ্ছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপস্থিত লোকজন। আজ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে

এর চেয়ে ঔপনিবেশিক দাসত্ব আর কিছু হতে পারে না: মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আনু মুহাম্মদ

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ‘ভয়াবহ বাংলাদেশবিরোধী চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার চুক্তির ৩২ পৃষ্ঠার যে দলিল প্রকাশ করেছে, সেটা পড়লে দেখা যাবে কোনোভাবেই এটাকে চুক্তি বলা যায় না। এটাকে বলতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটা আদেশনামা, একটা হুকুমনামা।’ এই চুক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সব পর্যায়ের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক গণজমায়েত কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আনু মুহাম্মদ এ কথাগুলো বলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবিতে এই কর্মসূচির আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। কর্মসূচিতে এই চুক্তিকে ‘ফাউল’ আখ্যায়িত করে এটিকে লাল কার্ড দেখানো হয়।

দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো, টোকিও কারও আধিপত্য আমরা স্বীকার করতে চাই না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যদি রাখতে হয়, জাতীয় সক্ষমতার যদি বিকাশ ঘটাতে এবং পৃথিবীতে যদি সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশকে উপস্থিত রাখতে হয়, তাহলে এই চুক্তি বাতিলের লড়াই করতে হবে
আনু মুহাম্মদ, সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি

এই কর্মসূচিতে অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ছিলেন সমাপনী বক্তা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, নতুন সরকারও এই চুক্তি সম্পর্কে কিছু জানাচ্ছে না। চুক্তি সম্পর্কে আমরা যতটুকু জেনেছি, সেটা জেনেছি মার্কিন সরকারের প্রকাশিত ৩২ পৃষ্ঠার দলিল থেকে। বাংলাদেশ সরকার কিছুই বলেনি। সেই ৩২ পৃষ্ঠার দলিল পড়লে দেখা যাবে কোনোভাবেই এটাকে চুক্তি বলা যায় না। এটাকে বলতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটা আদেশনামা, একটা হুকুমনামা।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তির প্রতিবাদ জানিয়ে পথনাটক। আজ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে

চুক্তির সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের দরকার থাকুক বা না থাকুক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। চুক্তি না মানলে মার্কিন সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবে, সেটা চুক্তিতে বলা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটাকে দুটি সার্বভৌম দেশের চুক্তি বলা যায় না। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার যদি এ ধরনের কোনো আদেশনামা কোনো রাজ্যকে দেয়, সেই রাজ্য এটা মানবে না। মার্কিন একটা রাজ্য যেটা মানবে না, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী সরকার সেই আদেশপত্র গ্রহণ করেছে। এর চাইতে ঔপনিবেশিক দাসত্ব আর কিছু হতে পারে না।

‘মানুষের ওপর বোঝা’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তির কারণে পোলট্রি, মাছ, ডিমসহ দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, যে ক্ষুদ্র শিল্পগুলোতে লাখ লাখ মানুষ যুক্ত, সেই খাতগুলো বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। দেশে কর্মসংস্থান এমনিতেই একটা সমস্যা, সেখানে এই সমস্যাটা আরও বাড়বে। এ ছাড়া বিনা শুল্কে মার্কিন পণ্য আমদানির কারণে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমবে। তখন রাজস্ব আয় করতে সরকার দেশের মানুষের ওপর নতুন কর বসাবে। আবার বেশি দামে যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আনতে হবে, ফলে সেই বেশি দামের জিনিস মানুষ কিনবে না। তখন সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সব মিলিয়ে মানুষের ওপর বোঝা চলে আসবে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে

আনু মুহাম্মদ বলেন, চুক্তিতে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করতে পারবে না, যা মার্কিন করপোরেট স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়, এ রকম কোনো দেশ বা সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার কোনো বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক কিংবা কৌশলগত চুক্তি করতে পারবে না। অর্থাৎ পুরোপুরি দাসত্বমূলক একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে হাতকড়া পরানো হয়েছে।

‘যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ভারতের আধিপত্য ঠেকাতে পারে না’

কর্মসূচিতে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘অনেকে বলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের যে দাপট, তাতে তাদের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি বাতিল কীভাবে সম্ভব? আবার ভারতের আধিপত্য থেকে বের হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বলা হয়। এই দুটি কথাই ভুল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত পরস্পরবিরোধী শক্তি নয়। ভারতের আধিপত্য ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো সহায়ক শক্তি নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত গভীরভাবে সম্পর্কিত। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র নেতা হিসেবে গণ্য করে। ভারতের আধিপত্য যখন বাংলাদেশে ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করেছে৷ সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ভারতের আধিপত্য ঠেকাতে পারে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, যদি এটা ঘটে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র শিল্প যদি বিপর্যস্ত হয়, তাহলে লাভ হবে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার করপোরেট স্বার্থের।

নাটকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তির প্রতিবাদ। আজ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো, টোকিও কারও আধিপত্য আমরা স্বীকার করতে চাই না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যদি রাখতে হয়, জাতীয় সক্ষমতার যদি বিকাশ ঘটাতে এবং পৃথিবীতে যদি সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশকে উপস্থিত রাখতে হয়, তাহলে এই চুক্তি বাতিলের লড়াই করতে হবে।’

সংসদে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা না হওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘এখন সংসদে যেসব রাজনৈতিক দল আছে, তাদের মধ্যে কত কিছু নিয়ে ঝগড়া হয়, কত কিছু নিয়ে পরস্পর আক্রমণ হয়। কিন্তু এই রাজনৈতিক দলগুলো এই দাসত্বের চুক্তির বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে নীরব থাকার ব্যাপারে অসম্ভব রকম নীরবতার ঐক্য তৈরি করেছে। এই রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীসহ সারা দেশের মানুষের দায়িত্ব এই চুক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ তৈরি করা।’

কর্মসূচিতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদ, সামিনা লুৎফা, মাহা মির্জা, সীমা দত্ত, বাংলাদেশ জাসদের নেতা মুশতাক হোসেন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন প্রমুখ। বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও দলের নেতা–কর্মীরা এতে অংশ নেন। আয়োজনে ছিল নাটক, গান ও আবৃত্তি পরিবেশনা। এসব পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে চলে বক্তৃতা।