সৈয়দা নীলিমা দোলা
সৈয়দা নীলিমা দোলা

সংসদ নির্বাচন

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার জের, এনসিপি ছাড়লেন আরও এক নেত্রী

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার জেরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা। আজ শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা ঘিরে এ নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত দলটির ১৫ নেতা দল ছাড়লেন।

জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সমালোচনা করে পদত্যাগপত্রে নীলিমা দোলা লিখেছেন, ‘দলের নেতা–কর্মীদের চোখে ধুলা দিয়ে এই জোট করা হয়েছে এবং মনোনয়ন দেওয়ার নাম করে তীব্র প্রতারণা করা হয়েছে।’

নীলিমা দোলা আরও লেখেন, ‘আমি মনে করি, এনসিপির পক্ষে এখন আর মধ্যপন্থী রাজনীতির নতুন পথ সৃষ্টি সম্ভব নয়। এত দিন আমি এনসিপির সঙ্গে ছিলাম কারণ আমি মনে করেছিলাম, দলটি জুলাই–পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। তবে সম্প্রতি দলটির নানা সিদ্ধান্তের পর আমার কাছে এটুকু স্পষ্ট, এই দলটি সম্পূর্ণভাবে ডানপন্থী ঘরানায় ঢুকে পড়ছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই তারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।’

জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা আসে গত ২৮ ডিসেম্বর। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সেদিন বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন।

জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর আগের দিন সন্ধ্যায় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তাসনিম জারা। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। এর আগে ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমর্থন জানিয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক।

এ ছাড়া এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য আসিফ নেহাল (আসিফ মোস্তফা জামাল), মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল আমিন টুটুল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া।

জামায়াত জোটে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ‘সম্ভাব্য জোট বিষয়ে নীতিগত আপত্তি’ বিষয়ে একটি স্মারকলিপি দেন দলের ৩০ জন নেতা। এরপর এ ইস্যুতে এখন পর্যন্ত ১৫ নেতার দল ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটল। এ ছাড়া নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন কয়েকজন।

নাহিদ ইসলামকে পাঠানো ওই স্মারকলিপিতে নেতারা বলেছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ধরনের জোট এনসিপির বহু কর্মী, সমর্থক এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মসহ নতুন ধারার রাজনীতিকে সমর্থন করা বহু সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি করবে। এর মাধ্যমে এনসিপির নিজস্ব মধ্যপন্থী রাজনৈতিক এজেন্সি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

‘মধ্যপন্থী রাজনীতির’ কথা বলে গেল বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনা শুরু হলে গত অক্টোবর থেকে তারা প্রথমে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা শুরু করে।

তখন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একাধিকবার আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে চাওয়া–পাওয়া নিয়ে শেষ পর্যন্ত বোঝাপড়া হয়নি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা যায় কি না, সে চেষ্টাও ছিল। তবে সেটা আর হয়ে ওঠেনি।

এরই মাঝে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে আলাদা জোট গঠনের চিন্তা থেকে মধ্যপন্থী আলাদা জোট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগে গণতন্ত্র মঞ্চকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা ছিল। পরে কেবল এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে জোট হয়। ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নামে ৭ ডিসেম্বর এই ত্রিদলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

কিন্তু ভোটের রাজনীতির হিসাব–নিকাশ মেলাতে গিয়ে এনসিপি বড় দুই দলের কোনো একটির সঙ্গে আসন সমঝোতাকে গুরুত্ব দেয়। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা কমে আসার পর এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়। এরপর সদ্য গঠিত ত্রিদলীয় জোটও ভাঙনের মুখে পড়ে।

বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার এই প্রচেষ্টায় এনসিপির পাশাপাশি এবি পার্টির নামও আলোচনায় আসে। কিন্তু তাদের জোটের আরেক শরিক রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন জামায়াত বা বিএনপির সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতা হয় এবি পার্টিরও।