
গণ–অভ্যুত্থানের পর পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল যেভাবে বিভিন্ন আন্দোলন ও ঘটনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশেও সামনের দিনে সে রকম হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, যদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বৈষমহীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার নিশ্চিত না হয় তাহলে বাংলাদেশের মানুষ ও দেশের তরুণেরা বারবার রাস্তায় নামবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১১ আসন থেকে জয়ী হয়ে সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পাওয়া নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা চাই একটা স্থিতিশীলতা, নতুন সংসদে এগুলো (অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীনতা ও সংস্কার) আলোচনা হবে। কিন্তু সেই জায়গাটা নির্ভর করবে, যারা সরকারে আছে, তাদের ওপর। সেই জায়গা যদি সংকুচিত করে ফেলা হয়, তাহলে আবারও বারবার রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামগুলো গড়াবে।’
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ। এনসিপিকে নিয়ে রচিত ‘এনসিপির যাত্রা’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পুরো বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে থাকবে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এই সময়টা ঠিক করে দিয়েছে যে আগামীর বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে বা কীভাবে যাচ্ছে; সামনের রাজনীতি বা লড়াইয়ের গতিপথটাই–বা কী রকম হতে যাচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমরা দলের জায়গা থেকে এ ধরনের বই প্রকাশের আরও উদ্যোগ নেব।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস এখনো আসেনি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এর আগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া একটা বই লিখেছেন। এ ছাড়া অনেক বই বের হয়েছে গতবারের বইমেলাতে। আরেকটু সময় গেলে হয়তো আমরা বুঝতে পারব যে গণ-অভ্যুত্থানে আসলে কী হয়েছিল এবং পরবর্তী ঘটনা কীভাবে কী গিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান নিয়েও প্রচুর পরিমাণে নিরপেক্ষ গবেষণা ও লেখালেখি হওয়া প্রয়োজন, কোনো দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।’
যাঁরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করেন, তাঁদের প্রতি জুলাই অভ্যুত্থান, তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে লেখালেখি করার আহ্বান জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘বিগত সময়গুলোকে আমাদের আরও বিশ্লেষণ করা উচিত যে এই সময়গুলোয় আসলে আমাদের কোথায় ভুল হলো, কোথায় সফলতা এলো, কোথায় সম্ভাবনা ছিল। যে সম্ভাবনাগুলো এখনো আছে, সেগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।’
‘এনসিপির যাত্রা’ শীর্ষক বইটি লিখেছেন দলের যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মাহাবুব আলম। প্রকাশ করেছে আদর্শ প্রকাশনী। প্রকাশক মাহবুবুর রহমান ও লেখক দুজনই আজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দুজনকেই ধন্যবাদ জানান।
এনসিপি সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমের পাশাপাশি কূটনীতিকদের কাছেও নানা ধরনের অপপ্রচার করা হয় বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘এনসিপি যা বলেনি, যে অবস্থান নেয়নি, তা এনসিপির নামে ছড়ানো হয়। হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে এক-দুজন নেতা কিছু বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপির আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে অবজ্ঞা করা হয় বা কষ্ট করে বোঝার চেষ্টা করেনি অনেকে। প্রকাশিত বইটিতে বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপির আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা যাবে। যতগুলো ইস্যু এসেছে, সব কটিকেই এনসিপি অ্যাড্রেস করেছে, কর্মসূচি দিয়েছে। সংস্কার ইস্যুতে এনসিপির দৃঢ় অবস্থানের কথা এখানে আছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে একটা গণ–অভ্যুত্থান কীভাবে সংঘটিত হলো, তারও একটি সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিকতা বইটিতে আছে বলে জানান নাহিদ। তিনি বলেন, ‘এনসিপির যাত্রা’ বইটিতে এনসিপির শুরু থেকে নির্বাচনের আগপর্যন্ত মোটামুটি একটা দিনপঞ্জিকা আছে। এনসিপি গঠিত হওয়ার পরে গত এক বছরে আসলে কী কী কাজ করেছে, কী কী ইস্যুতে কথা বলেছে, কী ধরনের বক্তব্য দিয়েছে, তা এই বইয়ে রয়েছে।
নাহিদ বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর যে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে অনেক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। সব কটি প্ল্যাটফর্মকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি সব সময়। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড়িয়েছে এনসিপি। এর মূল কারণগুলোর একটা হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্বের বড় অংশই এনসিপিতে এসেছে। দ্বিতীয়ত, গণ–অভ্যুত্থানের পর সংস্কার এবং বিচারের রাজনীতিটা এনসিপি ধরতে পেরেছে এবং করেছে। তারপরও আমাদের অনেক ভুল, ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা ছিল। নির্বাচন ও জুলাই পদযাত্রা আমাদের বড় অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাদা আলাদা বই ও লিটারেচার হওয়া সম্ভব।’
এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর–৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনও এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।