
বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের সরকারি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১–দলীয় ঐক্যের এই অবস্থানের কথা জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
‘বিএনপি কর্তৃক গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করে সংস্কারের পরিবর্তে সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান ও ১১–দলীয় ঐক্যের বক্তব্য তুলে ধরার লক্ষ্যে’ এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগ ১১–দলীয় ঐক্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
জুলাই সনদে সই করা রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে আজ মতবিনিময় করছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। জুলাই সনদে সই করা ২৬টি দল ও জোটের প্রতিনিধিদের এই মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল এই মতবিনিময়ে অংশ নিচ্ছে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১–দলীয় ঐক্য মনে করে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটে প্রকাশিত জনগণের রায়—এই তিনটির প্রতি সম্মান দেখানোই বর্তমান সাংবিধানিক মতপার্থক্য নিরসনের গণতান্ত্রিক পথ।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের (এমপি) দুটি শপথ নেওয়ার কথা। এর একটি এমপি হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর বিরোধী দলের এমপিরা দুটি শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নিয়েছেন। এখানেই বর্তমান সাংবিধানিক সংকটের মূল প্রশ্ন চিহ্নিত।
সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের গণভোটে অর্পিত গাঠনিক ক্ষমতা এক নয় বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, একই ব্যক্তি দুটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে পারেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটির ক্ষমতার উৎস, আইনগত পরিচয় ও দায়িত্ব এক নয়। জাতীয় সংসদ সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সংবিধানের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস।
গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেই রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, সেটি না করে, গণরায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে বিষয়টিকে সীমিত পরিসরের সাধারণ সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণভোটে জনগণ যে প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে, তাকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের ম্যান্ডেটের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিলেও তা সীমাহীন নয় বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন সাধারণ সংশোধনী–ক্ষমতার মাধ্যমে করা যায় না। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা গেলেও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এখতিয়ার নেই।
এ ক্ষেত্রে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ, ষোড়শসহ বিভিন্ন সংশোধনী সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাতিল হওয়ার দৃষ্টান্ত টানেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্বারা সংশোধনী আনা হয়েছে কি না, সেটি মৌলিক প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেই ক্ষমতার উৎস কী, আর জনগণ কোন প্রক্রিয়ায় সেই ম্যান্ডেট দিয়েছে।
১১–দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। এগুলো হলো গণভোটের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিষদ কার্যকর করা।
সরকারকে একতরফাভাবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো–সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন আনার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারকে জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।