সমাবেশে বক্তব্য দেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ৭ সেপ্টেম্বর
সমাবেশে বক্তব্য দেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ৭ সেপ্টেম্বর

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন প্রত্যাহার না করলে আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারি জামায়াতের

গতকাল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনকে ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন’ আখ্যা দিয়ে এটি প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, এই আইন প্রত্যাহার না করলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। শুধু জামায়াতে ইসলামীর দাবি নয়, দেশের আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থী মানুষের মতামত নিয়ে সরকারকে এ আইন পর্যালোচনার দাবি জানান তিনি।

জাতীয় সংসদে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ২০২৬ পাসের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী শাখা আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এ কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। আজ সোমবার বিকেলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল করে দলটি। মিছিলটি কাকরাইল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।

সম্পত্তি দানের পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে পাস হয়। বিলটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী দাবি করে সংসদে এর বিরোধিতা করেন জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, সামাজিক সমস্যার সমাধানের নামে ইসলামি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এতে হকদারের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ/মাতামহ কর্তৃক তাঁর সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (অথবা বিপরীতক্রমে) অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন।

দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে, সম্পত্তির ভোগাধিকার থাকবে এবং আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে।

তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তখন বলেছিলেন, নতুন আইনের বিধান হেবা বা মুসলিম আইনের অধীন অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিতে প্রভাব ফেলবে না। বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

সমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের মাধ্যমে সরকার কোরআন-সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়েছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বণ্টনের বিধান আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই এ ধরনের আইন করার আগে দেশের বরেণ্য আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মতামত নেওয়া উচিত। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া বোর্ডসহ দেশি-বিদেশি ইসলামি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে আইনটি পরীক্ষা করার আহ্বান জানান।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াত। মিছিলটি কাকরাইল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। ৭ সেপ্টেম্বর

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের পক্ষে সরকারের দেওয়া যুক্তিরও সমালোচনা করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, পিতা-মাতাকে সন্তানদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামি বিধান পরিবর্তন করা যায় না। ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও অধিকারের বিষয়ে আইন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেই পিতা-মাতার অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করা হবে না। অথচ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে কাজ করা হচ্ছে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তাঁকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। ইসলামি আইন ও ইসলামি ব্যাংকিং আধুনিক যুগে অচল—এ ধরনের বক্তব্যেরও প্রতিবাদ করেন তিনি।

সরকারকে সতর্ক করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে আইন পাস করলেই জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারেরও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় থাকতে পারেনি—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারকে জনদাবি ও গণতান্ত্রিক মতামত উপেক্ষা না করে ফিরে আসতে হবে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন প্রত্যাহার করা না হলে ইমান ও কোরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতিবাদে আন্দোলন আরও জোরদার করার কথাও বলেন তিনি।

সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে সরকার কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন করেছে। তাঁর দাবি, উত্তরাধিকার হিসেবে কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন, তা কোরআনে নির্ধারিত রয়েছে। আইনটি নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া বোর্ডসহ দেশি-বিদেশি ইসলামি স্কলারদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত নতুন আইনের সমালোচনা করে এটিকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় এবং দলের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দলটির সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সেলিম উদ্দীন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিমসহ অনেকে।