ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে
ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে

দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটা কালো ছায়া সরে গেল: রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে জামায়াত আমির

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটা কালো ছায়া সরে গেল।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক জরুরি ব্রিফিংয়ে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে জামায়াতের কোনো আগ্রহ নেই উল্লেখ করে দলটির আমির বলেন, ‘তিনি কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, এ বিষয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, আমরা আগে থেকেই বিবেচনায় নিয়েছি যে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে থাকার আর যোগ্য নন। তিনি তাঁর যোগ্যতা হারিয়েছেন।’

সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যত দিন দায়িত্ব পালন করবেন, পক্ষপাতিত্ব না করে ন্যায়নিষ্ঠভাবে, নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা করে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জামায়াত আশা করে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের ভেতরে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। যেহেতু এর ভেতরেই সংসদ অধিবেশন হওয়ার কথা রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়তোবা সেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সময় এলে আমাদের ভূমিকা কী হবে, ইনশা আল্লাহ আপনারা দেখতে পাবেন।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এখন ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। এখানে কোনো সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। তবে জনগণের মৌলিক প্রত্যাশার বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে নবগঠিত সংসদ এখনো পা বাড়ায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা অনবরত আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ভেতরে এবং বাইরে। আমাদের এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

জামায়াতের আমির বলেন, ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বাংলাদেশে যে পরিবর্তন হয়েছিল, সেই পরিবর্তনের দাবি ছিল এই রাষ্ট্রপতি থাকবেন না। কারণ, তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় বেশ কটি অঘটন ঘটেছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে এতগুলো মানুষের জীবন গিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে তিনি কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। শুধু নীরবতা নয়, জনগণ মনে করে তিনি এই অপকর্মের মদদদাতাও ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণে সরকারি দল সন্তোষ প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘কারণ, শেখ হাসিনার নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতির মুখ দিয়ে তারা হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলাতে পেরেছে। এটাকেই তারা বিজয় ভেবেছে। তবে জনগণ এটা পছন্দ করেনি।’

শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ভবনে যে সভা হয়েছিল, সেখানকার পরামর্শের আলোকে রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণে তিনি স্পষ্টতই বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তী বছর একটি জাতীয় দৈনিকের একজন সম্পাদককে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তিনি পুরো বিষয়টাকে অস্বীকার করে বলেছিলেন, তিনি কোনো পদত্যাগপত্র দেখেননি।

সেদিন এ বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মিথ্যাচার করেছেন দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, বক্তব্য মিথ্যা হলে রাষ্ট্রপতি তাঁর শপথ ভঙ্গ করেছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার পদে থেকে তিনি মিথ্যাচার করতে পারেন না। সে জন্য তখনই তাঁর সরে যাওয়া উচিত ছিল। তিনি সরে যাননি। বর্তমান সরকারও তাঁকে সরায়নি। বরং যে মানুষ স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন, জোর করে তাঁকে দিয়েই জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ানো হলো।

রাষ্ট্রপতির ভাষণে সরকারি দল সন্তোষ প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘কারণ, শেখ হাসিনার নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতির মুখ দিয়ে তারা হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলাতে পেরেছে। এটাকেই তারা বিজয় ভেবেছে। তবে জনগণ এটা পছন্দ করেনি।’

রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি নীরবে সরকারকে সাহায্য করেছেন। এখন যদি সে ধরনের নির্ভরযোগ্য কোনো আলামত পাওয়া যায়, তাহলে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

জামায়াত রাষ্ট্রপতির বিচার চায় কি না, জানতে চাইলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সেটা চিন্তাভাবনা করেই আমাদের পদক্ষেপটি নেব।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা তো প্রেসিডেন্টের মর্যাদায় প্রেসিডেন্টকে দেখতে চাই। কোনো তোষামোদকারী দেখতে চাই না। আমরা যে রিফর্মের (সংস্কার) কথা বলছি, সেই তোষামোদের জায়গাটাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য বলছি। আমরা বলছি যার যার জায়গায় সবাই সম্মানিত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা অন্য কারও কাছে মাথা নত করে কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না।…যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনিও রাষ্ট্রের নীতি মেনে চলবেন। তিনি অন্য কারও কাছে তাঁর বিবেককে তিনি বিলিয়ে দেবেন না—এটা আমরা আশা করব।’

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি যাতে দেশ ছেড়ে যেতে না পারে, জামায়াত এমন কোনো দাবি জানাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে চান আর তিনি বিশ্রামে থাকতে চান। সেটা সরকার দেখবে, আমরাও খেয়াল রাখব।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, সব ট্রিটমেন্টই দেশে সম্ভব। কারণ, আমারও তো একটা জটিল রোগ হয়েছিল, আমাকে তো ডাক্তাররা পর্যন্ত রিকমেন্ড করেছিলেন বাইরে যাওয়ার জন্য। আমি তো যাইনি। আমি তো এখানেই চিকিৎসা নিয়েছি। আমি চাই যে সবাই যেন এখানেই চিকিৎসা নেয়। এমনকি প্রয়োজন হয় বিদেশ থেকে এক্সপার্ট আনাও যেতে পারে। এটা কোনো সমস্যা না।’

এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের আমির।