ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনের চিত্র
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনের চিত্র

সংসদে আলোচনা

খালেদা জিয়া আজীবন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়েছে। আলোচনা শেষে সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা বলেন, খালেদা জিয়া আজীবন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে খালেদা জিয়াকে একজন ‘অসম সাহসী’ ও ‘মহীয়সী নারী’ বলে উল্লেখ করেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি গণতন্ত্র, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনো কারও সঙ্গে আপস করেননি। তিনি বাংলাদেশের নারী উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। নারী শিক্ষা, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, উন্মুক্ত ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের অনুমতি, ৫ হাজার টাকার কৃষিঋণ মওকুফ, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, মুক্তবাজার অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া ইত্যাদি ছিল তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

মির্জা ফখরুল বলেন, কারামুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়া কোনো প্রতিহিংসা নয়; বরং ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আসুন, আমরা ভালোবাসার বাংলাদেশ গড়ে তুলি। বেগম জিয়ার এই দর্শনই আমাদের আগামীর পথ চলার প্রেরণা।’
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আজ সংসদে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘অপরাজিতা’ উল্লেখ করে এই বিএনপি নেতা বলেন, তিনি যতবার যত আসনেই নির্বাচন করেছেন, ততবারই জয়ী হয়েছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আজকে সেই গণতন্ত্রের মা আমাদের মাঝে নেই। তবে তিনি মানুষের মাঝে আছেন। তিনি আজীবন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।’

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘আপাদমস্তক বাংলাদেশ প্রেমিক মহিলা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাঁকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দেশের বাইরে আর কোনো ঠিকানা নেই। একপর্যায়ে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া নিজ দলের শীর্ষ নেতাদের কথা স্মরণ করে আজহার বলেন, ‘কারাগারে যাদের পাশে ছিলাম, তাঁদের অনেকেই আজ নেই। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমাকেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসির হুকুম দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে হাসপাতালে ভর্তি করে ভুল অথবা বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হয়েছে।’

বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার ওপর আলোচনায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রমুখ।

পরে চব্বিশের জুলাই যোদ্ধাদের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান মানে শুধু জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নয়, এটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা। গণভোটের রায় অনুযায়ী আমরা যেমন সংসদ সদস্য, একইভাবে সংবিধান সংস্কার কমিশনেরও সদস্য। আমাদের সরকারি দলের বন্ধুরা অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন বলেই আমরা বিশ্বাস করি। আমরা একই সাথে গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলো সাধন করতে চাই। ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে তাঁদের রায় জানিয়ে দিয়েছেন।’

নাহিদ বলেন, ‘আমরা জুলাই গণহত্যার বিচার চাই, শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার চাই, গুম–খুনের বিচার চাই, বিগত সময়ে হওয়া লুটপাট এবং দুর্নীতির বিচার চাই, জুলাই মানে নতুন বন্দোবস্ত গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈষম্যহীন দেশ। জুলাই মানে আধিপত্যবাদমুক্ত, ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশ। জুলাই মানে মানবিক মর্যাদা এবং দায় ও দরদের বাংলাদেশ।’

জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের ঋণ ধারণ করে তাঁদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের রক্তের ঋণে জাতি আজ আবদ্ধ। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সরকার, সংসদ নেতা, বিরোধী দল এবং সব সংসদ সদস্যকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া আরও বক্তব্য দেন বিএনপির সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী।  

পরে জাতীয় সংসদে আনীত শোকপ্রস্তাবগুলো গৃহীত হয়। শেষে মৃত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে মোনাজাত করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন।