
দেশের জনগণ যাতে তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার পান, সে জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টাইম সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকারের ওপর একটি প্রতিবেদন বুধবার টাইম–এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
টাইমকে তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি যদি আমার পরিকল্পনার ৩০ ভাগও বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবেন।’
টাইম–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো এমন এক প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে, যা দেশকে আবার স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। আর এ জন্য দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের সময়ে তারেক রহমান প্রয়োজনীয় আত্মোপলব্ধি ও পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, যাতে তিনি দেশের জনগণের প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘যাঁরা (জুলাই অভ্যুত্থানে) প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণ যাতে তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান, সে জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তারেক রহমানের এটাই প্রথম একান্ত সাক্ষাৎকার। তারেক রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পৌঁছালে লাখো উচ্ছ্বসিত সমর্থক তাঁকে স্বাগত জানান। এর মাত্র পাঁচ দিন পর দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মা এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান।
খালেদা জিয়ার জানাজায় রাজধানী জনসমুদ্রে পরিণত হয়। অশ্রুসজল চোখে তারেক রহমান বলেন, ‘আমার হৃদয় বড় বেশি দুঃখভারাক্রান্ত। কিন্তু তাঁর (খালেদা জিয়া) কাছ থেকে আমি এই শিক্ষা পেয়েছি, যখন কোনো দায়িত্ব আপনার ওপর অর্পিত হয়, তখন আপনাকে অবশ্যই তা পালন করতে হবে।’
তারেক রহমানের সমর্থকদের কাছে তিনি নিপীড়নের শিকার একজন মুক্তিদাতা, যিনি তাঁর সমস্যাগ্রস্ত মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করেন, তাঁর নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা হলো পারিবারিক সূত্রে পাওয়া সুযোগ। অবশ্য তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন, এই বিভক্ত জাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার কারণে এটা হয়নি। আমার দলের সমর্থকদের জন্যই আজ আমি এখানে পৌঁছেছি।’
টাইম–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষও তাঁর কথায় আস্থা রাখছে বলে মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে করা জনমত জরিপ অনুযায়ী, তাঁর দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতি সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন ১৯ শতাংশ।
তবে স্পষ্ট উদ্বেগ রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির ধারণা সূচকে টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিক্ষোভকারী প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের সেই রক্তের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত হয়তো আরেকজন স্বার্থপর অভিজাত ব্যক্তির উত্থান ঘটবে।
টাইম–এর প্রতিবেদনে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ এবং তাঁর দণ্ড হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারেক রহমান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাঁর সব দণ্ড বাতিল হয়েছে। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘তারা (অভিযোগকারীরা) কোনো কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।’
টাইম–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি অভিযোগে তারেক রহমান ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন।
কারাগারে থাকাকালে নির্যাতনে তাঁর মেরুদণ্ডে সমস্যা তৈরি হয়, যা আজও তাঁকে ভোগাচ্ছে। মূলত চিকিৎসার লক্ষ্যেই তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তারেক রহমান বলেন, ‘খুব বেশি শীত পড়লে আমার পিঠে ব্যথা বেড়ে যায়। তবে আমি একে জনগণের প্রতি আমার যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার স্মারক হিসেবে দেখি। আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।’