
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের পর গত ৫ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন। মুক্ত হওয়ার পর তিনি অভিযোগ করেছেন জেলে ও রিমান্ডে তাঁকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে।
তানভীরের ভাষ্য, ‘আমার শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এসব কিসের ইনজেকশন, তা আমি জানি না। অন্তত ৭০–৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত।’
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে নির্যাতনের বর্ণনা দেন গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। সেখানে তাঁর হাতে স্যালাইন লাগানো ছিল। তাঁর ‘শারীরিক অবস্থা ও তাঁর ওপর হওয়া বর্বর নির্যাতনসহ সার্বিক বিষয়ে’ এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সচিবালয়ে প্রবেশ করে জেলা প্রশাসক নিয়োগে হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবই ছাপার কাজে কমিশন–বাণিজ্যে জড়ানোর অভিযোগ উঠলে আলোচিত হন গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাঁকে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এক বছর তিনি দলের বাইরে ছিলেন। তবে পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় গত ১৬ এপ্রিল সালাউদ্দিনকে আবার দলে নেওয়া হয়।
দলে ফেরার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে একটি আপত্তিকর পোস্ট দেন সালাউদ্দিন তানভীর। সেদিন রাতে তাঁকে এনসিপি থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সাময়িক অব্যাহতি ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। অবশ্য এনসিপির ফেসবুক পেজে সাময়িক অব্যাহতির সেই চিঠি প্রকাশের কাছাকাছি সময়ে সালাউদ্দিন তানভীরও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তাঁর বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এর পাঁচ দিনের মাথায় ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মণিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আজ ডিআরইউতে সংবাদ সম্মেলনে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ‘৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে। এরপরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না, সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকারের মধ্যে খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে, জেলে গিয়ে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও আমি এসব জাতির সামনে তুলে ধরতে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।’
গাজী সালাউদ্দিন তানভীর অভিযোগ করেন, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান এই মামলার বাদী। ৫ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেওয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলো–বাতাসহীন। বিদ্যুৎ ছিল না, পাখাও ছিল না।
কারারক্ষীরাও আওয়ামী লীগের দাবি করে এনসিপির এই নেতা বলেন, তাদের বেশির ভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এবং তারা তাঁকে জুলাই জঙ্গি বলে গালিগালাজ করত। আশপাশের কয়েদিরাও সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের আসামি। তারাও যা–তা বলে সম্বোধন করত।
গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ‘৫ আগস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেওয়া হলো, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেওয়া হলো, কিন্তু আমাকে দুই দিনের পচা খাবার দেওয়া হলো। কারাগারে এমন পচা–বাসি খাবারদাবার দেওয়া হতো, যা খাওয়ার অযোগ্য। একপর্যায়ে আমার ডায়রিয়া হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। সেখানে যে ওষুধ লিখেছেন ডাক্তার, সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি। খুলে দেওয়া অজানা ওষুধ আমাকে খেতে হয়েছে। আমার শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এসব কিসের ইনজেকশন, তা আমি জানি না। অন্তত ৭০–৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত।’
একদিন হাত–পা কাঁপার কারণে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নষ্ট এমআরআই মেশিনে তাঁকে ঢোকানো হয়েছিল উল্লেখ করে তানভীর বলেন, ‘আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে গেল। আমি ১০–১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। পরে দেখি শহীদ জিয়া মেডিকেলের প্রিজন সেলে এবং আমার শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা। একজন কোনো রকমে পরিষ্কার করে দিল।’
এরপর উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাঁকে ঢাকায় আনা হয় বলে জানান গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। রাখা হয় কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য তাঁকে একদিন শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে ডাক্তার দেখিয়ে জেলে নেওয়ার সময় গাড়িতে হঠাৎ সাদাপোশাকে কয়েকজন লোক উঠে আসে। তারা আমাকে নির্যাতন করে। তাদের মধ্যে একজন আমাকে বলে, ‘‘বসুন্ধরার মালিককে তুইতোকারি করেছিলি, এত বড় সাহস তোর।” বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান এবং তাঁর ছেলে আনভীরের নাম বলে আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এই মাফিয়া গোষ্ঠীর হাত এতটাই লম্বা তারা কারাবন্দী একজনকে এভাবে নির্যাতন করতে পারে। এদের কি কোনো বিচার হবে না—জাতির কাছে আমার প্রশ্ন।’ ওই ঘটনার পর কারাগারেও একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেন তানভীর।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিয়ন, কেন্দ্রীয় মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত, এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব আবদুল আহাদ প্রমুখ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।