নির্বাচন
নির্বাচন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রশ্নে ইসি ও সরকারের সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে সরকারের কিছুটা সমন্বয়হীনতা সামনে এসেছে। গত সোমবার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে ইসি। এক দিন পর গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি নিয়ে সরকারের দুজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সরকারের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ না করার অভিযোগ আনেন। এমনকি ইসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

গত সোমবার সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে ইসি বলেছিল, এটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে দিন-তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের সময়সূচির বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির কোনো আলোচনাও হয়নি।

প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কিছু সময় পর ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের যে সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।

ইসি সূত্র জানায়, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। এখানে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল চূড়ান্ত করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রীতি হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ইসি ও সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠিক আলোচনা করে। চিঠি আদান-প্রদানও হয়। এবার এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে ইসি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনগুলো নির্বাচন দেওয়ার সময় হয়েছে, কোথাও সীমানাসংক্রান্ত বা আইনি জটিলতা আছে কি না—এসব তথ্য চেয়ে গত জুলাইয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাসংক্রান্ত তথ্য পাঠায় মন্ত্রণালয়। সিটি করপোরেশন, পৌরসভার তথ্য এখনো ইসি পায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ায় ইসি কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়া দুটি ধাপের ভোটের ঘোষিত তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইসি মনে করছে, তারা আইনি এখতিয়ার বলেই সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে। এখানে তাদের দিক থেকে কোনো ত্রুটি হয়নি।

ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের এ বিষয়ে কোনো চিঠি-চালাচালি হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনাও হয়নি
মীর শাহে আলম, প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়

ইসি প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে ১৭ জানুয়ারি এবং পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে আগামী বছরের ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোট করার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিন ভোটের সম্ভাব্য তারিখ রাখায় বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিকভাবে ইসির কাছে আপত্তি জানিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া ১৩ ডিসেম্বর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার গণিত বিষয়ে পরীক্ষা রয়েছে। পরীক্ষার সময় পরিবর্তন না করলে এদিন ভোট করা সম্ভব হবে না। কারণ, পরীক্ষার দিন ভোট হওয়ার নজির নেই।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দাবি ইসি আলোচনা করেনি

গতকাল সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের এ বিষয়ে কোনো চিঠি-চালাচালি হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনাও হয়নি।

নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, তাদের নির্বাচন করার সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর তারিখ ঘোষণা করে। প্রস্তুতি সভা বা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা করা হয়। এতে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় থাকে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংবিধানে জাতীয় ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ইসি স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন ও সরকার সমন্বয় করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শিরোধার্য বললেন ইসি সচিব

গতকাল সকালে নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে দুই দিন ধরে প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার একটি সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘উনি (প্রতিমন্ত্রী) যেটা বলেছেন, সেটা শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’

সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আলোচনা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন, কীভাবে আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে এ মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি নন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে দুই দিন ধরে প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার একটি সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি
আখতার আহমেদ, জ্যেষ্ঠ সচিব, ইসি

এনসিপির ক্ষোভ

সরকারের প্রতি ইসির ‘অনুগত আচরণ এবং কমিশনের ওপর সরকারের অন্যায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে’ ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এনসিপি। গতকাল এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও অবস্থান থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ মেনে ইসি সচিবের চুপসে যাওয়া প্রমাণ করে, কমিশন স্বাধীন ভূমিকা প্রয়োগ করতে পারছে না। এটি পুরোপুরি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সরকারের প্রভাবে ও চাপে পড়ে নির্বাচন কমিশন একেক সময় একেক রকম কথা বলে খামখেয়ালিপনা প্রদর্শন করছে, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম গ্যারান্টিও ধ্বংস করে দিচ্ছে। দলটি ইসিসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের ‘অবৈধ প্রভাব বিস্তার ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ’ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।

এখতিয়ার ইসির

সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে ইসি। এ ছাড়া সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো দায়িত্ব কমিশন পালন করবে।

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইনে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসিকে। যেমন ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত বিধি অনুসারে ইসি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচনের আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পাদন করবে। কোন কোন বিষয়ে ইসি বিধান করতে পারবে, সেটাও এই ধারায় বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের তারিখ, সময়, স্থান ও নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে বিধান করতে পারবে ইসি। উপজেলা পরিষদ আইনেও একই কথা বলা আছে।