পটুয়াখালী ৩ আসনের গলাচিপা উপজেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বিভিন্ন দলের ব্যানার। আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে হাসান মামুন একজন। রোববার বেলা একটা, গলাচিপা নদীর ধারে
পটুয়াখালী ৩ আসনের গলাচিপা উপজেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বিভিন্ন দলের ব্যানার। আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে হাসান মামুন একজন।   রোববার বেলা একটা, গলাচিপা নদীর ধারে

পটুয়াখালী–৩ আসন

ধানের শীষ-নৌকা নেই, তবু হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

কুয়াকাটা পেছনে ফেলে উত্তর-পূর্ব দিকে এগোতেই রাজনীতির দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে। সমুদ্রের নোনা হাওয়া কমে আসে। দেখা যায় নদীর পার ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদ, বাজার, খাল আর শস্যখেত।

বরগুনার আমতলির শাখারিয়ায় গাড়ি থেকে নেমে আমখোলা বাজার হয়ে নদীর পাশ ধরে সুহরী বাজার পেরিয়ে ট্রলারে নদী পার হয়ে পৌঁছলাম গলাচিপায়। ঢুকতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এখানকার নির্বাচনী চিত্র অন্য রকম।

গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী ৩ মূলত আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আসন হিসেবেই পরিচিত। ১৯৯৬ সালের জুনের জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবারই এখানে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা জয় পেয়েছে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। এ কারণে পুরোপুরি পাল্টে গেছে আসনটির ভোটের দৃশ্যপট।

হরিদেবপুর থেকে গলাচিপা নদী পার হয়ে ওপারে যেতে চোখে পড়ল চার মার্কার চার প্রার্থীর ব্যানার। এখানে বিএনপির সমঝোতার প্রার্থী গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুন ঘোড়া প্রতীকে, জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মু. শাহ আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মুফতি আবু বকর সিদ্দীক হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে আছেন। হাসান মামুন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সমঝোতার প্রার্থী নুরুল হকের বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এই আসনে এবার যেমন নৌকা প্রতীকে প্রার্থী নেই, আবার বিএনপির ধানের শীষও নেই ব্যালটে। এই শূন্যতাই গলাচিপা-দশমিনার ভোটের মাঠে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে। বিএনপির সমর্থকেরাও এখানে দ্বিধাবিভক্ত।

এরপরেও আওয়ামী লীগবিহীন ভোটের মাঠে এই আসনটি উত্তপ্ত হয়ে আছে নুরুল হক ও মামুন এবং তাঁদের সমর্থকদের নানা বক্তৃতা ও কর্মকাণ্ডের কারণে। সর্বশেষ গত শনিবার রাত ১১টার দিকে গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর চত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নুরুল হক নুর ও হাসান মামুনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন।

অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে পটুয়াখালী-৩ আসনে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে নুরুল হক নুর ও হাসান মামুনের একাধিক নির্বাচনী কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে প্রশাসন। শনিবার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হয়। একই দিনে একই স্থানে দুই প্রার্থীর ঘোষিত বেশ কয়েকটি কর্মসূচি স্থগিতও করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রভাব থাকা এলাকাটিতে এই প্রার্থীরা ভোটের হিসাব কীভাবে মেলাচ্ছেন, তা বুঝতে আসনটির বিভিন্ন গ্রামে, মহল্লায় এবং প্রত্যন্ত এলাকার অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা হয়। তাঁদের কেউ বলেছেন, ট্রাক ও ঘোড়া প্রতীকের দুই প্রার্থীই ঝামেলা করছে আর অন্তরালে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। কেউ আবার বললেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যারা কাজ করেছে তাদের ভোট দেবেন না। দুই প্রার্থীর এমন অবস্থানের কারণে জামায়াতের প্রার্থী ভালো ফলাফল করতে পারে এমন বক্তব্যও দিয়েছে কেউ কেউ। তবে কোন মার্কায় ভোট দেবেন—বলতে চাইলেন না বেশির ভাগ মানুষ।

পটুয়াখালীর অন্য তিনটি আসনের চিত্রও কমবেশি একই। স্থানীয়রা জানান, এই আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটই জয়-পরাজয়ের সমীকরণ তৈরি করবে। এ কারণে এই এলাকাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যাও বেশি। পুলিশর সদর দপ্তরে তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় মোট ৫১৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৫৩টি ঝুঁকিপূর্ণ।

আওয়ামী লীগের প্রভাব থাকা এলাকাটিতে এই প্রার্থীরা ভোটের হিসাব কীভাবে মেলাচ্ছেন, তা বুঝতে আসনটির বিভিন্ন গ্রামে, মহল্লায় এবং প্রত্যন্ত এলাকার অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা হয়।

ভোটের সমীকরণ জটিল

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের নির্বাচনের চেনা সমীকরণ বদলে গেছে এবার। এর আগেও একটি জাতীয় নির্বাচনের আগে গলাচিপায় এসেছিলাম। তখন আওয়ামী লীগ এবং এর বিদ্রোহী ও মনোনয়ন না পাওয়া প্রার্থীদের হিসাব অনুযায়ী ভোটের সমীকরণ মেলানো হতো। তবে কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই চেনা সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে। নৌকা নির্বাচনে না থাকায় এখন অনেকে দোদুল্যমান। কে এই ভোট টানতে পারবেন, সেই হিসাবেই সাজানো হচ্ছে পুরো নির্বাচন।

এই আসনটির রাজনীতি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে খেয়াল রাখেন স্থানীয় এমন একজন জানালেন, নুর ও মামুনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যার বিরোধ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা এবং ভোট টানার কৌশল হিসেবে তাঁকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। যেমন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী দুটি নাম সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুহাম্মদ শাহীন শাহ এবং ওয়ানা মার্জিয়া নিতু। এর মধ্যে নিতুর বাবা ছিলেন গলাচিপা পৌরসভার মেয়র। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এই দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। জয়ী হয়েছিলেন নিতু। এর আগের বার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন শাহীন শাহ। শাহীনের অনুসারীরা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে একবার উপজেলার উলানীয়া বন্দরে নুরের ওপর হামলা করেছিল।

এর আগেও একটি জাতীয় নির্বাচনের আগে গলাচিপায় এসেছিলাম। তখন আওয়ামী লীগ এবং এর বিদ্রোহী ও মনোনয়ন না পাওয়া প্রার্থীদের হিসাব অনুযায়ী ভোটের সমীকরণ মেলানো হতো। তবে কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই চেনা সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে। নৌকা নির্বাচনে না থাকায় এখন অনেকে দোদুল্যমান। কে এই ভোট টানতে পারবেন, সেই হিসাবেই সাজানো হচ্ছে পুরো নির্বাচন।

এলাকায় আলোচনা রয়েছে, আওয়ামী লীগের এই দুটি পক্ষ সরাসরি নির্বাচনে কারও পক্ষে প্রচারে না নামলেও অন্তরালে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় সাঁরির নেতাদের কাজে লাগানো হচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগের ভোট টানতে কে কতটা আওয়ামী লীগ বিরোধী অবস্থানে ছিল—এলাকায় সেগুলোও প্রচার করা হচ্ছে। এবার আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বড় নেতাদের কার সমর্থন কার পক্ষে যাচ্ছে, সেই আলোচনা এখন আসনটির সর্বত্র।

নুরুল হক নুরের ব্যানার। আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে তিনি একজন। রোববার বেলা একটা, গলাচিপা নদীর ধারে

পটুয়াখালী ৩ আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১২৪টি। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৪ জন এবং নারী ১ লাখ ৮৬ হাজার ২২৬ জন।

মাঠে ঘুরে স্পষ্ট বোঝা যায়, আসনটির এলাকায় এলাকায় আলোচনা এখন ট্রাক ও ঘোড়া প্রতীকের। উপজেলার দক্ষিণ কাইলকাপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে কথা হয় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি দীর্ঘদিন নৌকায় ভোট দিয়ে এসেছেন। এবার কাকে দেবেন—প্রশ্নে একটু থামলেন। তারপর বললেন, ‘এখন ভোটের অবস্থা জগাখিচুড়ি। বুঝা যায় না কই দিমু।’

ওই ব্যক্তি জানান, এলাকায় নুরের ভোট ভালো আছে বলে আলোচনা চলছে। তবে একটি বড় অংশ এখনো দ্বিধায়। শেখ হাসিনারে নুর ধাওয়াইছে—এইটা অনেকে ভালোভাবে নেয় নাই।

এই বক্তব্যে ধরা পড়ে বর্তমান বাস্তবতা। নুর যেমন এক শ্রেণির ভোট টানতে পারছেন, তেমনি অতীত রাজনীতির স্মৃতিও তাঁকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে অন্য অংশের ভোটারের কাছে।

পাশে থাকা স্থানীয় এক বাসিন্দা সংক্ষেপে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, ‘এই এলাকায় আওয়ামী লীগের ভোটই আসল। এখন সেই ভোট যে দিকে যাবে, ফলও সেদিকেই যাবে।’

নীরব প্রচার

পটুয়াখালী ৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের বিষয়টি এবার আলাদা করে আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনের শুরুতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে আসন সমঝোতার আলাপ চলছিল। এই আসনটি ছিল চরমোনাইয়ের পছন্দের তালিকায়। সে সময় জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক শাহ আলম প্রচার অনেকটাই সীমিত করে দিয়েছিলেন। পরে সমঝোতা না হওয়ায় এখন আবার প্রচার জোরদার করেছেন তিনি। তবে মাঠে এখনো তাদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

দাঁড়িপাল্লা এবং হাতপাখার প্রচার চলছে অনেকটা নীরবে। নুর আর মামুন সাব—দুজন যেভাবে ঠেলাঠেলি করতেছে—এই ফাঁকে অন্যরাও বের হয়ে যেতে পারে। মানুষ যে কী করে বলা যায় না।
ফজলু ফকির

কাইলকাপুরের একটি দোকানে যখন এ নিয়ে কথা হচ্ছিল তখন দু-তিনজন বললেন, জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন এক থাকলে ভালো করতো। সেখানে সত্তোরর্ধ ফজলু ফকির নামের এক ব্যক্তি বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লা এবং হাতপাখার প্রচার চলছে অনেকটা নীরবে। নুর আর মামুন সাব—দুজন যেভাবে ঠেলাঠেলি করতেছে—এই ফাঁকে অন্যরাও বের হয়ে যেতে পারে। মানুষ যে কী করে বলা যায় না।’

বিএনপির ভেতরেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব

গলাচিপা উপজেলা শ্রমিক দলের সদস্য শামীম দফাদার মোটরসাইকেল চালান জীবিকার তাগিদে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাসান মামুনের সঙ্গে যুক্ত। গলাচিপা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের একটি চায়ের দোকানে বসে শামীম বলছিলেন,‘ তারেক রহমান যারে দিছে, তাকেই ভোট দিমু। আমরা সিদ্ধান্তের বাইরে যাই না।’ তবে একই সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের এলাকা। এইবার ভোটের হিসাব কঠিন।’

গলাচিপা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি খাস জমির পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন কয়েকজন বাসিন্দা। এখানে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া ২৩০টি পরিবার থাকে বলে জানান স্থানীয়রা। এলাকাটিতে নুরের ভোটার বেশি। তবে সেখানে উপস্থিত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমারে হুমকি দিছে—ট্রাকে ভোট দিতে। না দিলে কেন্দ্রে যাইতে দেবে না।’

তারেক রহমান যারে দিছে, তাকেই ভোট দিমু। আমরা সিদ্ধান্তের বাইরে যাই না।
শ্রমিক দলের সদস্য শামীম দফাদার

দুই প্রার্থীর এমন হুমকি-পাল্টা হুমকির কারণে কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার কথাও ভাবছেন বলে জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে এসব ঘটনা ভোটের মাঠে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নানা দলের ব্যানার। রোববার বেলা একটা, গলাচিপা নদীর ধারে

গণভোটের অভিনব প্রচারণা

এরই মাঝে গলাচিপায় দেখা গেল একেবারে ভিন্ন একটি চিত্র। কয়েকজন তরুণ নিজেদের উদ্যোগে গণভোট বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁদের সংগঠনের নাম ‘ঐক্যবদ্ধ তারুণ্য (গলাচিপা)’। তাঁরা বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করেন। পাশাপাশি সন্ধ্যায় বিভিন্ন বাজারে তথ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে গণভোট বিষয়ে আলোচনা চালান।

এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. শাহেদ হোসেন জানান, তাঁরা লক্ষ্য করেছেন—প্রান্তিক মানুষের বড় অংশই গণভোট সম্পর্কে কম জানে। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে—হ্যাঁ ভোট দিলে সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ উঠে যাবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে যাবে। আমরা এগুলো পরিষ্কার করে বোঝালে মানুষ বলছে, তারা সংস্কারের পক্ষেই থাকবে।

শাহেদ হোসেন আরও জানান, প্রচারের সময় উপজেলার আদানি বাজারের এক সাবেক ইউপি সদস্য তাঁদের বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে ভালো হবে—এটি তারা বুঝলেও দলীয় নেতাদের নির্দেশনার কারণে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন না।

মূলত, পটুয়াখালীর চারটি আসনের নির্বাচনী মাঠে এখন সবচেয়ে বড় হিসাব আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট। দলটির সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের খোঁজে চারটি আসনের চর আর নদীপারের গ্রামগুলোতে মানুষ এখন হিসাব কষছে—ভোটের, রাজনীতির আর ভবিষ্যতের।

চারটি আসনেই নৌকার ভোটে চোখ

পটুয়াখালী ৩ আসনের মতো একই চিত্র দেখা গেছে, অন্য তিনটিতেও। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতীতে দেখা গেছে পটুয়াখালী ১ (মির্জাগঞ্জ, দুমকি ও পটুয়াখালী সদর) আসনেও বেশির ভাগ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার জোট জয় পেয়েছে। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেবল একবার ২০০১ সালে বিএনপি থেকে আলতাফ হোসেন চৌধুরী জয় পেয়েছেন।

এবারের নির্বাচনেও আলতাফ হোসেন চৌধুরী বিএনপির প্রার্থী। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. আবদুল ওহাবের ঈগল এবং ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার প্রার্থী মো. ফিরোজ আলমের।

পটুয়াখালী সদরের ভোটার মোটরসাইকেল চালক মো. আশরাফ বলছিলেন, এই আসনে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অবস্থা ভালো। আবদুল ওহাব সবচেয়ে ভালো মানুষ। তবে এলাকায় কম এসেছেন।

তবে পটুয়াখালীর চারটি আসনের মধ্যে কিছুটা ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে পটুয়াখালী ২ (বাউফল) আসনে। অন্য আসনে জামায়াত বা ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীর চেয়ে এই আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রচার বেশি। যদিও এই আসনেও ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত কেবল ২০০১ ছাড়া প্রতিটি ভোটেই নৌকা জয়ী হয়েছে। এই আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী মো. সহিদুল আলম তালুকদার ও জামায়াতের প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদের।

পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে বিএনপির প্রার্থী এ বি এম মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ও কলাপাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ডা. জহির উদ্দিন আহম্মেদ রাঙ্গাবালী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। এই আসনটিও ১৯৯৬ সালের জুনের সংসদ নির্বাচন থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত টানা আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। ফলে এখানেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

মূলত, পটুয়াখালীর চারটি আসনের নির্বাচনী মাঠে এখন সবচেয়ে বড় হিসাব আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট। দলটির সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের খোঁজে চারটি আসনের চর আর নদীপারের গ্রামগুলোতে মানুষ এখন হিসাব কষছে—ভোটের, রাজনীতির আর ভবিষ্যতের।