চট্টগ্রাম–১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গণসংযোগ। গতকাল দক্ষিণ পতেঙ্গার নাজিরপাড়ায়
চট্টগ্রাম–১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গণসংযোগ। গতকাল দক্ষিণ পতেঙ্গার নাজিরপাড়ায়

১৬ আসন

চট্টগ্রামে ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লার লড়াই, তবে উত্তাপ কম

দিনভর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টায় পটিয়ার ভেল্লাপাড়ায় কথা হচ্ছিল স্থানীয় বাসিন্দা শওকত হোসেনের সঙ্গে। ভোটের পরিস্থিতি কী জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘একটু ঠান্ডা ঠান্ডা’। শীতের ঠান্ডা? শওকত হেসে বললেন, ‘মনে হচ্ছে তফাতটা বেশি, সে জন্য।’

এর প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে শিকলবাহার চৌমুহনীতে কথা হয় মো. ইসমাঈলের সঙ্গে, যিনি মোমবাতি তৈরির কারখানার শ্রমিক। ইসমাঈল বললেন, ‘অন্যবারের তুন এডে মিছিল-মিটিং খম। যেডে যেডে বিএনপি-জামায়াত শক্ত, এডে এডে জইম্মে।’ (অন্যবারের চেয়ে সেখানে এবার মিছিল-মিটিং কম। যেসব আসনে বিএনপি-জামায়াত শক্ত অবস্থানে, সেখানে ভোট জমেছে।)

গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই দিন চট্টগ্রাম নগর ও নগরের বাইরের মোট আটটি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে, লোকজনের সঙ্গে কথা বলে শওকত হোসেন ও ইসমাঈলের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়।

এর আগে কক্সবাজার ঘুরে সেখানকার চারটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার ১৬টি আসনের মধ্য আটটি আসন ঘুরে সেই আভাস পাওয়া যায়নি। প্রার্থীর ব্যানার আছে, প্রচার আছে, ভোটের আলোচনাও আছে—সে তুলনায় ভোটের উত্তেজনা নেই।

শেষ সময়ে ভোটের হাওয়া বুঝতে চট্টগ্রাম নগরের চারটি, উত্তরের সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারী আর দক্ষিণের আনোয়ারা ও পটিয়া—এই আট আসনের ২২টি জায়গায় মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেল বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বেশির ভাগ আসনে ভোটের ব্যবধানটা বেশি হবে; এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। যার কারণে ওই সব আসনে ভোটের উত্তাপ কম।

ভোটের পরিস্থিতি কী জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘একটু ঠান্ডা ঠান্ডা’। শীতের ঠান্ডা? শওকত হেসে বললেন, ‘মনে হচ্ছে তফাতটা বেশি, সে জন্য।’

চলতি পথে ভোটারের কথা

হালিশহরের গরিবের নেওয়াজ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। এলাকার একটি রেস্তোরাঁর মালিক রফিক বলেন, ‘বিএনপি, আওয়ামী লীগকে তো দেখেছি। এবার জামায়াতকে ভোট দিব।’

তবে হালিশহরের এইচ ব্লকের বাসিন্দা আনোয়ারুল হক মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার গেলে দেশ আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়বে।

শেষ সময়ে ভোটের হাওয়া বুঝতে চট্টগ্রাম নগরের চারটি, উত্তরের সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারী আর দক্ষিণের আনোয়ারা ও পটিয়া—এই আট আসনের ২২টি জায়গায় মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেল বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বেশির ভাগ আসনে ভোটের ব্যবধানটা বেশি হবে; এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। যার কারণে ওই সব আসনে ভোটের উত্তাপ কম।

হালিশহর এলাকাটি চট্টগ্রাম-১০ আসনের। খুলশী, হালিশহর ও পাহাড়তলী নিয়ে গঠিত এই আসনে নয়জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এখানে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের অক্সফোর্ড পড়ুয়া ছেলে সাঈদ আল নোমান। আর জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী, তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন।

গণসংযোগে চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান। গতকাল নগরের সবুজবাগ এলাকায়

নিউমুরিং মিরাপাড়া

হালিশহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে নিউমুরিং মিরাপাড়ায় নেমে কথা হয় সেলুনমালিক তিলক দাস, দেলোয়ার হোসেন, স্থানীয় দোকানদার মো. শরীফ ও মো. জাহাঙ্গীরের সঙ্গে।

মো. জাহাঙ্গীর বলেন, তাঁর পরিবারে ১২টি ভোট। সবগুলোই ধানের শীষে যাবে। অন্যরা কাকে ভোট দেবেন সরাসরি না বললেও, ধানের শীষের পাল্লা ভারী এমন আভাস দিলেন।

এই এলাকাটা চট্টগ্রাম-১১ আসনের মধ্য পড়েছে। বন্দর ও পতেঙ্গা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিভিন্ন দলের ১১ জন প্রার্থী থাকলেও আমীর খসরুর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হচ্ছে জামায়াতের মো. শফিউল আলমকে। তিনিও সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর।

নিউমুরিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পতেঙ্গা বিজয়নগরে কথা হয় গৃহবধূ নুর নাহার বেগম, রত্না বেগমসহ সাত ব্যক্তির সঙ্গে। তাঁদের একজন পতেঙ্গার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক ইমতিয়াজ হোসেন। তাঁর মতে, এই এলাকায় ধানের শীষের ভোট বেশি। তবে তরুণদের মধ্যে দাঁড়িপাল্লার সমর্থন বেশি।

বিজয়নগর থেকে পশ্চিমে চট্টগ্রাম-১১ আসনের শেষ সীমানা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত হয়ে পৌঁছাই ডেইল পাড়ায়। সেখানকার দোকানি মো. হারুন বললেন, ভোটের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো। তিনি ভোট দিতে যাবেন। তাঁর দোকানের ক্রেতাদের কথাবার্তায় বোঝেন, ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা—দুই প্রতীকেরই লোকজন মাঠে আছে। তবে ধানের শীষের পাল্লাটা ভারী।

গণসংযোগে চট্টগ্রাম–১১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী শফিউল আলম। গতকাল নগরের রশিদ বিল্ডিং এলাকায়

লালখান বাজার

পতেঙ্গা সৈকতের মুখ থেকে ১৬ কিলোমিটারের শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে আমরা আবার আসি চট্টগ্রাম-১০ আসনের লালখান বাজারে। এখানে আলোচিত প্রার্থী বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের বিপরীতে মাঠে আছেন জামায়াতের শামসুজ্জামান।

নগরের প্রসিদ্ধ স্থান বাটালি হিলের টাংকির পাহাড়ে কথা হয় শাহীনুর বেগম, জিনাত আরা, নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের সঙ্গে। নারীরা বলেছেন, তাঁরা শান্তি চান, মাদকমুক্ত এলাকা চান। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, ৫ আগস্টের (২০২৪) পর তাঁর এলাকায় চাঁদাবাজি করেছেন একটি দলের কর্মীরা।

ডেবারপাড়

হাটহাজারী ও বায়েজিদ থানার একাংশ নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৫ আসন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। মোট ছয়জন প্রার্থী থাকলেও মীর হেলালের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নাছির উদ্দিন মুনিরকে। রিকশা প্রতীকের নাছির জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী।

বায়েজিদের শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা ডেবারপাড়ে গিয়ে দেখা গেল ধানের শীষের কর্মীরা ‘ভোটার তথ্যকেন্দ্র’ ব্যানার টাঙিয়ে ভোটার স্লিপ নিয়ে বসেছেন। পাশের এক চা–দোকানি বললেন, এখানে ধানের শীষের অবস্থা ভালো।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিনের ছেলে মীর হেলালের প্রতিদ্বন্দ্বী মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির একসময় হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। কওমি মাদ্রাসার আলেম মুনির প্রথমে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে প্রার্থী হন। এ দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট করায় মুনির বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে প্রার্থী হন। এখানে ইসলামী আন্দোলনের মতি উল্লাহ নূরী ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন নাছিরউদ্দিনের ভোট কওমি ও সুন্নি ঘরানায় ভাগাভাগি হবে। যার কারণে মীর হেলাল কিছুটা নির্ভার আছেন।

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর

পাহাড়ের মাঝখানের এই সড়ক ধরে ঢুকতে হয় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে। সম্প্রতি তোলা

ডেবারপাড় থেকে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক ধরে পৌঁছাই বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সীতাকুণ্ড উপজেলা, সলিমপুর ও পাশের জঙ্গল সলিমপুরে। এটি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন। এখানে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী আর জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক।

এখানে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব থাকে। কারণ, এখানকার জমির মূল মালিক সরকার। তাঁর মতে, এখানে বিএনপির সমর্থন বেশি, তবে দাঁড়িপাল্লাও আছে।
মোজাফফর মিয়া, স্থানীয় বাসিন্দা

কথা হচ্ছিল ফৌজদারহাট বাংলাবাজারের বাসিন্দা সৌদিপ্রবাসী মো. শাহেদের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয়দের বেশির ভাগ ধানের শীষের পক্ষে। আর বাইরের জেলার যাঁরা এখানকার বাসিন্দা, তাঁদের ঝোঁক দাঁড়িপাল্লার দিকে।

অপরাধীদের অভয়ারণ্য বলে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর। এখানে কয়েক লাখ মানুষ বাস করলেও বেশির ভাগই এখানকার ভোটার নন। সেখানকার বাসিন্দা মোজাফফর মিয়া বলেন, এখানে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব থাকে। কারণ, এখানকার জমির মূল মালিক সরকার। তাঁর মতে, এখানে বিএনপির সমর্থন বেশি, তবে দাঁড়িপাল্লাও আছে।

হামজারবাগ, মোহাম্মদপুর

জঙ্গল সলিমপুর থেকে বায়েজিদ বোস্তামীর শেরশাহ এলাকা, রুবি গেইট হয়ে হামজারবাগ। এটি চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ এবং জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু নাছের। বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী সৈয়দ হাসান আজহারীরও (মোমবাতি) একটা অবস্থান আছে।

তবে এই আসন নির্বাচনী সমঝোতায় এনসিপির প্রার্থী (শাপলা কলি) মো. জোবাইরুল হাসান আরিফকে ছেড়ে দিয়েছিল জামায়াত। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী রয়ে গেছেন। এ নিয়ে দুই মিত্র দলের স্থানীয় নেতা–কর্মীদের মধ্যে মন–কষাকষি আছে।

হামজারবাগের রেলগেট-সংলগ্ন এলাকার মুদিদোকানদার মো. ফরিদ মনে করেন, হামজারবাগে বিএনপির সমর্থন বেশি।

তবে একই এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নুর নাহার বেগম জানালেন, তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেখেছেন। এবার বিকল্প হিসেবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেবেন। সেটা কে বা কোন দলের, উল্লেখ করেননি নুর নাহার।

রেলগেট এলাকা থেকে কিছুটা সামনে এগোলে মোহাম্মদপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আফজাল মসজিদ। সেখানে কথা হয় পাঁচজনের সঙ্গে। বিএনপি ভালো করবে, এমন ভাষ্য যাঁদের, তাঁরা রাখডাক না করেই সেটা বলেছেন। তবে ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল বলেন, এখানকার জামায়াতের সমর্থকেরা চুপচাপ আছেন।

বাকলিয়া, হাটখোলা, বাস্তুহারা

মোহাম্মদপুর থেকে উড়ালসড়ক হয়ে এবার বাকলিয়ায়। এটি চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসন। সেখানে ১০ জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আবু সুফিয়ান ও জামায়াতের এ কে এম ফজলুল হক।

বাকলিয়া কালামিয়া বাজার থেকে আধা কিলোমিটার ভেতরে আবদুল লতিফ হাটে (হাটখোলা) কথা হয় এক কলেজশিক্ষকের সঙ্গে। তাঁর মতে, এখানে ৫০টি ভোট পড়লে ৪০টি পাবে ধানের শীষ।

চট্টগ্রাম শহরের শেষ সীমানা শাহ আমানত ব্রিজ-সংলগ্ন নোমান কলেজের বাস্তুহারা বাকলিয়া। এ পর্যন্ত ঘুরে আসা এলাকাগুলোতে প্রার্থীদের অসংখ্য নির্বাচনী কার্যালয় দেখা যায়। কিন্তু কোথাও কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি সেভাবে দেখা যায়নি।

কালা মিয়া বাজারে দাঁড়িপাল্লার প্রতীকের অস্থায়ী কার্যালয়ে বসে থাকা জাকির হোসেন বলেন, আগে ভোটের যে আমেজ ছিল, এখন সেটি নেই। শুধু চা খাওয়ার জন্য আড্ডা দেওয়ার সময় এখন মানুষের নেই।

ভেল্লাপাড়া, চরলক্ষ্যা

শাহ আমানত সেতু পার হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে আমরা পৌঁছাই মইজ্জারটেক। সেখান থেকে তিন কিলোমিটার পর ভেল্লাপাড়া ব্রিজ। এটা চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে পড়েছে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এনামুল হক আর জামায়াতের প্রার্থী ফরিদুল আলম। সুন্নি জোটের প্রার্থী আছেন এয়ার মোহাম্মদ (মোমবাতি)। সব প্রার্থীর ব্যানার, ফেস্টুন আছে; তবে গ্রামবাংলার পরিচিত ভোটের যে উত্তেজনা, সেটা কম।

সেখান থেকে রাতে সাড়ে নয়টায় আমরা যাই চট্টগ্রাম-১৩ (কর্ণফুলী-আনোয়ারা) আসনের চরলক্ষ্যায়। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য। ভোটে শক্ত প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নবীন প্রার্থী মাহমুদুল হাসান।

চরলক্ষ্যার বাসিন্দা মুদিদোকানি আবু তাহের এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বৈদ্যুতিক পণ্যের ব্যবসায়ী জিয়াউদ্দিন বাবলুর মতে, এই এলাকায় বিএনপির ভোট বেশি।

১৬ আসনের হিসাব-নিকাশ

চট্টগ্রাম-১৫ আসনের জামায়াতের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর গণসংযোগ। গতকাল সাতকানিয়ায়

চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা ও ৩৪টি থানা এলাকা নিয়ে ১৬টি আসন। এসব আসনে ২৫টি দলের ১১৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে জামায়াত তিনটি আসন দুই মিত্র দলকে ছেড়ে দিয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগড়া) আসনের প্রার্থী, সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। এর বাইরে নগরের দুটি আসনে (চট্টগ্রাম-১০ ও চট্টগ্রাম-১১) জামায়াতের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন ও জামায়াতের সাইফুর রহমান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) বিএনপির সরোয়ার আলমগীর ও জামায়াতের নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির হুমাম কাদের চৌধুরীর সঙ্গে জামায়াতের এ টি এম রেজাউল করিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি একটি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল। আমরা আমাদের কর্মসূচির কথা বলছি। অন্যদিকে একটি গুপ্ত দল আমাদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। যারা আইডি কার্ড, বিকাশ নম্বর, বেহেশতের টিকিট নিয়ে নেমেছে।’

অপর দিকে চট্টগ্রাম নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম-১০ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা (বিএনপি) ৫০ জন ঋণখেলাপিকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমাদের কোনো প্রার্থীর এ ধরনের কেলেঙ্কারি নেই। উপায় না পেয়ে তারা জান্নাতের টিকিট বিক্রির মতো কথা ছড়াচ্ছে।’

স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের দুটিতে বিএনপির তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের কারণে প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীরা সুবিধা পেতে পারেন। এর একটি চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী), আরেকটি চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ)। চন্দনাইশে বিএনপির জসিমউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) চেয়াম্যান অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক (ছাতা প্রতীক) ভালো অবস্থানে আছেন। তাঁকে জামায়াত সমর্থন দিয়েছে। সেখানে সুন্নি জোটের প্রার্থী সোলেমান ফারুকীও আলোচনায় রয়েছেন।

আর চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী, জামায়াতের মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী লিয়াকত আলীর (ফুটবল) মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে।

এর বাইরে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৪ আসনে (সীতাকুণ্ড) আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) এনামুল হক ও চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে সরওয়ার জামাল নিজাম শক্ত অবস্থানে আছেন বলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও বিএনপি থাকায় লোকজনের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। চট্টগ্রাম আগে থেকে বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা, এখানে দলটির পাল্লা ভারী মনে হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত হলেও বিভিন্ন কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরোপুরিভাবে প্রভাব রাখতে পারছে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. বখতেয়ার উদ্দীন

চট্টগ্রামের ১৪টিতে প্রার্থী দিয়েছে বৃহত্তর সুন্নি জোট। পুরো চট্টগ্রামে কওমি ধারা এবং সুন্নিপন্থীদের এলাকাভিত্তিক প্রভাব আছে। তারা জামায়াতকে পছন্দ করে না। তাদের সংখ্যা অনেক বেশি না হলেও, এই ভোটগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে পাশের জেলা কক্সবাজারে নির্বাচনের যে উত্তাপ দেখা গেছে, চট্টগ্রামের অর্ধেকের মতো আসনে সেই উত্তাপ নেই। স্থানীয় লোকজনের মতে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই না থাকলে বেশি উত্তাপ ছড়ায় না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. বখতেয়ার উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও বিএনপি থাকায় লোকজনের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। চট্টগ্রাম আগে থেকে বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা, এখানে দলটির পাল্লা ভারী মনে হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত হলেও বিভিন্ন কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরোপুরিভাবে প্রভাব রাখতে পারছে না।