বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠান আয়োজন করে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লক’। রাজধানীর বাংলামোটরে, ১৩ জুন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠান আয়োজন করে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লক’। রাজধানীর বাংলামোটরে, ১৩ জুন

শোষণমুক্ত গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লকে’র আত্মপ্রকাশ

ধনিক শ্রেণির বদলে সাধারণ মানুষ ও আদিবাসীদের অধিকারভিত্তিক এক নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লক’।

সংগঠনটি তাদের রূপরেখায় পাহাড় ও সমতলের স্বায়ত্তশাসন, সবার জন্য সমান শ্রম ও সম্পত্তির অধিকার এবং বিনা মূল্যে শিক্ষা-চিকিৎসার কথা বলেছে। একই সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, বিয়ের নামে আইনি জটিলতা এবং নারীর ওপর সব ধরনের সামাজিক ও যৌন নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠান আয়োজন করে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। সংগঠনটি তাদের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের শিরোনাম দিয়েছে, ‘কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩০ বছর স্মরণ এবং রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের আত্মপ্রকাশ’।

অনুষ্ঠানের শুরুতে রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের সদস্যরা ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ গান পরিবেশন করেন। কল্পনা চাকমার ডায়েরি থেকে কিছু অংশ পাঠ করেন ফারহানা বহ্নি। কবিতা আবৃত্তি করেন রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের সদস্য মারজিয়া প্রভা।

অনুষ্ঠানে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনটির সংগঠক রুপসী চাকমা। তিনি ২৮ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৪ সালে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা খারিজের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।

রুপসী চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অপহরণের ৩০ বছর পরও মূল অভিযুক্ত স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পাহাড়ের নেতৃত্ব দমন করতে এই অপহরণ করা হয়েছে দাবি করে অবিলম্বে কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের জোর দাবি জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের স্বায়ত্তশাসন ও নারী অধিকার আন্দোলনের সাহসী নেত্রী ছিলেন কল্পনা চাকমা। এমনটি উল্লেখ করেন ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লকে’র সদস্য তানিয়া মাহমুদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সামরিকায়ন ও পিতৃতান্ত্রিক সহিংসতায় নারীর শরীরকে দমনের রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি নানামুখী লড়াই গড়ে তুলেছিলেন। এ কারণে তাঁকে অপহরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিখ্যাত গণসংগীত ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’ পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী ওয়ারদা আশরাফ। এ সময় তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমাদের সব অপরাধের বিচার চেয়ে যেতেই হবে। এটি আমাদের সর্বকালের যুদ্ধ, আমরণ যুদ্ধ। যেই যুদ্ধে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।’

সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি গঠন করেনি ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লক’। তবে বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষক রয়েছেন।

সদস্যরা হলে নিশাত তাসফিয়া, ফারহানা বহ্নি, মারজিয়া প্রভা, তানিয়াহ মাহমুদা, স্কাইয়া, নওশিন ফ্লোরা, সুরাইয়া ইয়াসমিন, সাদিয়া তটিনী ও তমাশ্রী দাস।

অনুষ্ঠানে রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের সদস্যরা সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি ইশতেহার ঘোষণা করেন। তাঁরা বলেন, নারীর সমান অধিকার অর্জন লৈঙ্গিক মুক্তির একমাত্র শর্ত নয়। যদিও অর্জিত প্রতিটি অধিকার নারীকে পূর্ণ মুক্তির নির্দিষ্ট লক্ষ্যের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। কিন্তু যতক্ষণ এই পুঁজিবাদী কাঠামো না ভাঙা হচ্ছে, উৎপাদন সম্পর্কগুলো পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে, ততক্ষণ লৈঙ্গিক মুক্তি যেমন সম্ভব নয়, তেমনিভাবে অর্জিত অধিকারও টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

সংগঠনটি বলছ, লৈঙ্গিক বৈষম্য মুক্তির প্রশ্নে গণতন্ত্রকামী, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকবাদী নারীবাদীরা ‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লক’ নামে নতুন এক প্ল্যাটফর্মে সম্মিলিত হয়েছে। রেড ফেমিনিস্ট ব্লক নারীবাদীদের একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত হবে।

সংগঠনের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে তাঁরা বলেন, রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের লড়াই একই সঙ্গে লিঙ্গীয় নিপীড়ন, শ্রেণি নিপীড়ন, জাতিগত নিপীড়ন, ধর্মীয় বৈষম্য এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে। এই লড়াই পিতৃতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়, রেড ফেমিনিস্ট ব্লক এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, যেখান জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ধনিক শ্রেণির গণতন্ত্র নয়।

গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় নারী, কুইয়্যার, শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসীর প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে।

গৃহশ্রমকে সামাজিক শ্রমে রূপান্তরিত করা আবশ্যক উল্লেখ করে সংগঠনটি জানায়, আমরা গৃহশ্রমের মজুরি চাই না, আমরা চাই সামাজিক মালিকানা ভিত্তিতে গৃহশ্রম পরিচালিত হবে। লিঙ্গনির্বিশেষে সব মানুষের সম্পত্তিতে সমান উত্তরাধিকারের দাবি তাঁদের একটি অন্তর্বর্তী চাওয়া।

প্রতিটি মানুষের জন্য কার্যকর শিক্ষা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা বিনা মূল্যে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলা হয়, একমুখী ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার প্রচলন এবং শিক্ষার পাঠ্যক্রমে পিতৃতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এ ছাড়া জীবনের মান অনুযায়ী জাতীয় নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ, কৃষিজমির মালিকানা কৃষকের হাতে দেওয়া, ঋণনির্ভরতা কমানো, বার্ধক্য ভাতা নিশ্চিত করা এবং পাহাড় ও সমতলে সব জাতির স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয় ইশতেহারে।