
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে অংশীজনদের মতামত নেবে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। সবার মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চায় তারা। জুলাই সনদ সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনের পথে এগিয়ে যাবে বিশেষ কমিটি। এ ক্ষেত্রে তারা বিদ্যমান সংবিধান পুরোটাই পর্যালোচনা করবে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে কমিটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের এ কথা জানানো হয়। ১২ সদস্যদের এই কমিটির প্রথম বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন না। কমিটির অন্য সদস্যরা সবাই বিএনপি ও তাদের মিত্র দলের সংসদ সদস্য। গঠনের সময় বিরোধী দল এই কমিটিতে কারও নাম দেয়নি। তারা কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছিল।
বৈঠকের মাঝপথে বের হয়ে যাওয়ার সময় কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেহেতু আমরা উদার এবং ওপেন, আমরা সবার কথা শুনব। সর্বত্র যা যা সংশোধনের প্রয়োজন, সে সংশোধনীগুলো আমরা ধারণ করে সেভাবে রিপোর্ট প্রণয়ন করব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি। কমিটির সভাপতি জানান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেবে কমিটি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাদের মতামত নেওয়া হবে।
কমিটি কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে, সেটা এখন বলা যাবে না বলে উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি নাম দেওয়ার কথা ছিল, একপর্যায়ে হয়তো তারা নাম দেবে। সেটা হলে তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। বিরোধী দল নাম না দিলেও তাদের সংসদ সদস্যদের পরামর্শ থাকলে সেগুলো গ্রহণ করবে বিশেষ কমিটি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এইভাবে আমরা একটা গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই এবং জনপ্রত্যাশা সবকিছু আমরা ধারণ করতে চাই। সবার সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করে আমরা সেই রিপোর্টটা প্রণয়ন করতে চাই।’
জুলাই সনদে থাকা সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৪৮টার মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা এগ্রিড হয়েছি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে। সেগুলো তো আমরা নেবই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি, সেগুলো নোট অব ডিসেন্ট আকারে নেব।’
বিশেষ কমিটির সভাপতি আরও বলেন, ‘এর বাইরেও আমাদের অনেক বক্তব্য আছে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আছে। সেগুলো আমরা ধারণ করব। যেগুলো জুলাই জাতীয় সনদে প্রতিফলিত হয়নি, আলোচিত হয়েছিল, হয়তো প্রতিফলিত হয়নি; সেগুলো আমরা আলোচনা করেই নেব।’
জুলাই সনদ সামনে রেখেই কাজ করা হবে
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে আলোচনা হয়েছিল, সেই আলোচনাকে ধারণ করেই জুলাই সনদ দেওয়া হয়েছে। সেটা সামনে রেখেই তাঁরা কাজ করবেন। এই দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য তিনি দেখেন না। তিনি জানান, পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ, একটার সঙ্গে আরেকটার গাঁথুনি রাখতে হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ইমোশন দিয়ে, জুলাই সনদকে বাইপাস করে আমি আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অন্য কিছু চাপিয়ে দেব, সেটা আমরা করব না, করতে পারি না।’ তিনি আরও বলেন, তাদের চাওয়া জুলাই সনদকে সামনে রেখে জুলাইয়ের চেতনাকে বাস্তবায়ন করা।
জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই সনদেই ওটার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কোনো জায়গায় যদি বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনী ইশতেহার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেইটা প্রিভেইল করবে। সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।’
বিরোধী দল কমিটিতে নাম না দিলে সংশোধন কতটুকু বাস্তবসম্মত হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলকে অবশ্যই সুপারিশ নেওয়ার জন্য যা যা করণীয়, সব করা হবে। বিরোধী দলের সুপারিশ জুলাই সনদের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত আছে। কারণ, জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে ৩৩টি রাজনৈতিক দল, তার মধ্যে বিরোধী দলের সব সুপারিশ আছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে গঠন করা বিশেষ কমিটিতেও বিরোধী দল ছিল না। তার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে কী পরিস্থিতি হয়েছিল তা সবাই দেখেছে, এবারও সে রকম হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদে অঙ্গীকারনামা আছে। সেখানে সব দল সই করেছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিরোধী দল এ রকম কোনো অঙ্গীকারনামায় সই করেনি।
জুলাই সনদ ‘কমপ্লিট কোড অব পলিটিক্যাল গাইডলাইন’ আখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমরা ওই আলোকে যাচ্ছি কি না, তারা (বিরোধী দল) বাইরে থেকে এটাকে পর্যবেক্ষণ করবে। তাঁরা যদি মনে করেন যে আমরা জুলাই সনদের ব্যত্যয় ঘটিয়েছি, অবশ্যই তাঁরা সেটার সমালোচনা করার অধিকার রাখেন এবং যৌক্তিক যেকোনো সমালোচনায় আমরা একমোডেট করার চেষ্টা করব।’
প্রথম বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, কীভাবে সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাবে, সেটার নির্দেশনা ঠিক করা হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো কমিটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কমিটি আলোচনা করবে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ তৈরিতে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের সঙ্গেও কমিটি আলোচনা করবে।
এক প্রশ্নের জবাবে কমিটির সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন আমরা আগামী এক বা দুই বছরের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য করতে চাই, তারা যেন এর সুফল ভোগ করে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল আসবে, এটা আমি আশা করি।’
চিফ হুইপ বলেন, ‘ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানও বহুবার সংশোধন হয়েছে, সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা হয়—এটাই নিয়ম। আর সংশোধন ও সংস্কার দুটোর মাঝে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। আমরা যা–ই পরিবর্তন করি, সেটাই সংস্কার।’
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন; কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি; কমিটির সদস্য ও আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আন্দালিভ রহমান; কমিটির সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক; কমিটির সদস্য ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন; কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন; কমিটির সদস্য সাকিলা ফারজানা ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল।